যে পুরুষ একজন নারীকে নিরাপদ অনুভব করাতে পারে, সেই সত্যিকারের শক্তিশালী

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬

যে পুরুষ একজন নারীকে নিরাপদ অনুভব করাতে পারে, সেই সত্যিকারের শক্তিশালী

একটি সমাজ কতটা সভ্য, মানবিক ও উন্নত—তা বোঝা যায় সেই সমাজ নারীদের কতটা সম্মান দেয়, কতটা নিরাপত্তা দেয় এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে দেয়, তার ওপর। কিন্তু এই পরিবর্তন কেবল নারীর একার লড়াইয়ে সম্ভব নয়। একজন পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের সমাজে বহু বছর ধরে নারীর প্রতি একটি ভুল ধারণা তৈরি করা হয়েছে—নারীকে “রক্ষা” করতে হবে, “নিয়ন্ত্রণ” করতে হবে কিংবা তার জীবনের সিদ্ধান্ত অন্য কেউ ঠিক করে দেবে। অথচ একজন নারী কোনো করুণা নয়, কোনো দয়া নয়—তিনি একজন পূর্ণ মানুষ। তারও স্বপ্ন আছে, মতামত আছে, ক্লান্তি আছে, ভেঙে পড়া আছে, আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও আছে।

এখানেই একজন পুরুষের প্রকৃত ভূমিকা শুরু হয়।

একজন বাবা যখন তার মেয়েকে বলেন—“তুমিও পারবে”, তখন একটি আত্মবিশ্বাসী নারী তৈরি হয়। একজন ভাই যখন বোনের স্বাধীনতাকে সন্দেহ নয়, সম্মানের চোখে দেখে, তখন একটি পরিবার বদলাতে শুরু করে। একজন স্বামী যখন স্ত্রীর স্বপ্নকে নিজের অহংকারের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে না করে পাশে দাঁড়ান, তখন সম্পর্ক সুন্দর হয়। আর একজন সহকর্মী পুরুষ যখন নারীর কাজকে শুধুমাত্র “নারী” পরিচয়ে নয়, দক্ষতা দিয়ে মূল্যায়ন করেন—তখন কর্মক্ষেত্র মর্যাদাপূর্ণ হয়ে ওঠে। নারীর উন্নয়ন মানে শুধু তাকে চাকরি করতে দেওয়া নয়। নারীর উন্নয়ন মানে—তার কথা মন দিয়ে শোনা। তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা। তার “না” শব্দটিকে বোঝা। তার অনুভূতিকে ছোট না করা।

অনেক নারী প্রতিদিন এমন কিছু নীরব যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যান, যার খবর কেউ জানে না। সংসারের দায়িত্ব, সম্পর্কের চাপ, অবমূল্যায়ন, মানসিক ক্লান্তি, অসম্মান—সবকিছুর মাঝেও তারা হাসেন, কাজ করেন, পরিবার সামলান। কিন্তু খুব কম মানুষই তাদের অনুভূতির খবর নেয়।

একজন সচেতন পুরুষ এই জায়গাটিতেই আলাদা হয়ে ওঠেন।

কারণ একজন ভালো পুরুষ শুধু সংসারের দায়িত্ব নেন না; তিনি একজন নারীর মানসিক নিরাপত্তার জায়গাও তৈরি করেন। তিনি এমন একজন মানুষ হন, যার পাশে একজন নারী নিজেকে ছোট, ভীত বা অসম্মানিত মনে করেন না।

আজকের পৃথিবীতে নারীরা এগোচ্ছে—শিক্ষায়, নেতৃত্বে, ব্যবসায়, প্রযুক্তিতে, সৃজনশীলতায়। কিন্তু এই পথ এখনো পুরোপুরি সহজ নয়। পথে আছে সামাজিক বিচার, কটূক্তি, অনিরাপত্তা এবং অদৃশ্য অনেক বাধা। তাই পুরুষদের দায়িত্ব শুধু “সমর্থন” দেওয়া নয়, বরং একটি সম্মানজনক পরিবেশ তৈরি করা।

আমাদের আরও বেশি এমন পুরুষ দরকার—

যারা নারীর সাফল্যে ভয় পাবে না,

নারীর স্বাধীনতায় অস্বস্তি বোধ করবে না,

নারীর কণ্ঠকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে না।

কারণ একজন নারী যখন মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারেন, তখন শুধু একজন মানুষ নয়—একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং পুরো সমাজ উপকৃত হয়।

সব পুরুষ নারীর প্রতিপক্ষ নন। এই সমাজেই অসংখ্য পুরুষ আছেন, যারা প্রতিদিন নীরবে নারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, সাহস দিচ্ছেন, সম্মান দিচ্ছেন। সেই গল্পগুলোও বলা প্রয়োজন। কারণ পরিবর্তন কখনো একা আসে না; এটি আসে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা ও মানবিকতার মাধ্যমে।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন নারীকে নিজের স্বপ্নের জন্য অপরাধবোধে ভুগতে হবে না। নিজের মত প্রকাশ করতে ভয় পেতে হবে না। নিজের মর্যাদা প্রমাণ করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তে হবে না। আর সেই সমাজ গঠনে পুরুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সত্যিকারের শক্তিশালী পুরুষ তিনি নন, যিনি কাউকে নিয়ন্ত্রণ করেন। বরং তিনি, যিনি একজন নারীকে সম্মান করেন, নিরাপদ অনুভব করান এবং তার পাশে সমানভাবে হাঁটতে জানেন।

নারীর মর্যাদা কোনো “নারী বিষয়” নয়।

এটি একটি মানবিক দায়িত্ব।

একটি সভ্য সমাজের পরিচয়।

sidebar ad