বাংলাদেশে মানুষের অভাব নেই। শহরে, গ্রামে, হাটে, মাঠে, রাস্তায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মস্থলে—যেদিকে তাকাই, শুধু মানুষ আর মানুষ। আমাদের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটিরও বেশি। সংখ্যার হিসেবে এটি এক বিশাল শক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কতজন প্রকৃত অর্থে ‘তৈরি হওয়া মানুষ’?
কথাটি শুনতে কিছুটা কঠোর মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষ জন্ম নেয়, মানুষ হয়ে ওঠে না। মানুষ হয়ে উঠতে হয়। আর সেই হয়ে ওঠার পথ তৈরি হয় শিক্ষা, মূল্যবোধ, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, সততা এবং দেশপ্রেমের সমন্বয়ে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন উন্নয়নের পরিসংখ্যান আমাদের আশাবাদী করে। পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল চলছে, অর্থনীতির আকার বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের এই দৃশ্যমান চিত্রের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—আমরা কি সমানভাবে মানুষ গড়তে পেরেছি?
একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার ভবন নয়, তার মানুষ। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদও নয়; তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সৎ, দক্ষ, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক।
আজ আমরা শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়াতে পেরেছি, কিন্তু সবসময় শিক্ষার আলোকে চরিত্রের আলোয় রূপান্তর করতে পারিনি। অনেকেই ডিগ্রি অর্জন করছেন, কিন্তু মূল্যবোধ অর্জন করছেন না। আমরা পেশাজীবী তৈরি করছি, কিন্তু সবসময় মানবিক মানুষ তৈরি করতে পারছি না। আমরা কর্মী তৈরি করছি, কিন্তু নেতৃত্ব তৈরি করতে পারছি না।
একজন চিকিৎসক যদি মানবিক না হন, একজন শিক্ষক যদি আদর্শ না হন, একজন ব্যবসায়ী যদি সৎ না হন, একজন রাজনীতিক যদি জনকল্যাণে নিবেদিত না হন, তাহলে তাদের জ্ঞান ও ক্ষমতা সমাজকে কত দূর এগিয়ে নিতে পারবে?
মানুষ তৈরির কাজ শুরু হয় পরিবার থেকে। শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। মা-বাবার আচরণ, কথাবার্তা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ—সবকিছুই শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলে। একটি শিশু বই পড়ে যতটা শেখে, তার চেয়েও বেশি শেখে দেখে। তাই সন্তানদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার দামি খেলনা নয়, একটি সুন্দর চরিত্রের উদাহরণ।
এরপর আসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের গুণাবলি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থী যদি জীবনের অর্থ না শেখে, দায়িত্ব না শেখে, দেশকে ভালোবাসতে না শেখে, তাহলে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান তাকে পূর্ণ মানুষ করে তুলতে পারে না।
আজকের পৃথিবী দক্ষতার পৃথিবী। কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে নৈতিকতা না থাকলে সেই দক্ষতা সমাজের জন্য বিপজ্জনকও হতে পারে। তাই আমাদের প্রয়োজন দক্ষ এবং সৎ মানুষের সমন্বয়। এমন মানুষ, যারা শুধু নিজের উন্নতি নয়, সমাজের উন্নতিকেও নিজের দায়িত্ব মনে করবে।
আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে—আমরা সফল হতে চাই, কিন্তু সবসময় শ্রেষ্ঠ মানুষ হতে চাই না। অথচ সফলতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আস্থা অর্জন করা। অর্থ দিয়ে প্রভাব তৈরি করা যায়, কিন্তু সম্মান অর্জন করা যায় কেবল চরিত্র দিয়ে।
আজ দেশের নানা খাতে আমরা দক্ষ জনশক্তির ঘাটতির কথা বলি। কিন্তু আরও বড় ঘাটতি হলো দায়িত্বশীল মানুষের ঘাটতি। আমরা এমন মানুষ চাই, যারা কাজকে দায়িত্ব মনে করবে; যারা রাষ্ট্রের সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে করবে; যারা দুর্নীতিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেবে না; যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহসী হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তার তরুণ প্রজন্ম। লাখ লাখ তরুণ-তরুণী আজ স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু তাদের হাতে শুধু ডিগ্রি তুলে দিলেই হবে না; তুলে দিতে হবে মূল্যবোধ, নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং মানবিকতার শিক্ষা। কারণ আগামী দিনের বিশ্বে শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, সমস্যা সমাধানকারী মানুষ প্রয়োজন হবে।
মানুষ তৈরির ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সমাজ যা দেখে, যা পড়ে, যা শুনে—ধীরে ধীরে তা-ই তার চিন্তাজগতকে প্রভাবিত করে। তাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়; মানুষের চিন্তাকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করাও।
আমরা যদি সত্যিই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ চাই, তাহলে আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় ‘মানুষ তৈরি’কে প্রথম সারিতে রাখতে হবে। কারণ সৎ মানুষ তৈরি হলে সৎ প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। সৎ প্রতিষ্ঠান তৈরি হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আর সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে উন্নয়ন হবে টেকসই।
একটি দেশকে বদলে দিতে হাজারো প্রকল্পের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন কিছু আদর্শ মানুষ। ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীর বড় বড় পরিবর্তনের পেছনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নয়, বরং কিছু আলোকিত মানুষের অবদানই সবচেয়ে বেশি ছিল।
আজ আমাদের চারপাশে ভালো মানুষের প্রয়োজন। এমন মানুষ, যাদের কাছে দায়িত্ব একটি অঙ্গীকার, সততা একটি শক্তি এবং দেশপ্রেম একটি বিশ্বাস। কারণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেবল ইট-পাথরের উন্নয়নে নয়, মানুষের উন্নয়নে গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশে মানুষের সংখ্যা অনেক। কিন্তু আমাদের এখন প্রয়োজন মানুষ তৈরির আন্দোলন। এমন একটি আন্দোলন, যেখানে পরিবার, শিক্ষা, সমাজ, রাষ্ট্র এবং গণমাধ্যম সবাই একসঙ্গে কাজ করবে।
যেদিন আমরা প্রকৃত মানুষ তৈরিতে সফল হব, সেদিন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আর কেবল একটি স্বপ্ন থাকবে না; সেটি হবে আমাদের বাস্তবতা। কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনসংখ্যা নয়—তার মানুষ।
সাবিনা ইয়াসমীন
সম্পাদক রোদসী