বিবাহবিচ্ছেদের পর একজন নারীর সামনে নতুন কিছু আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়—দেনমোহর কীভাবে পাবেন, ভরণপোষণের অধিকার কতটুকু, সন্তান থাকলে তার খরচ কে বহন করবেন, সন্তানের হেফাজত কীভাবে নির্ধারিত হবে, আর তালাকের প্রক্রিয়াটি আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না।
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক বিষয়ে বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ ও সন্তানের হেফাজত—এসব বিষয়ে একাধিক আইন প্রযোজ্য। পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের বিষয় রয়েছে।
তাই তালাকের পর প্রথম কাজ হলো—আবেগের পাশাপাশি নিজের আইনি অধিকারগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোঃ এমদাদুল হক মিলন তালাকের পর স্ত্রীর অধিকার নিয়ে তাঁর ২৬ জানুয়ারি ২০২৬-এর ভিডিও আলোচনায় দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ, সন্তানের ভরণপোষণ এবং স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর আলোচনায় বিশেষভাবে বলা হয়েছে—তালাক হয়ে গেলেই স্বামীর সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তিনি বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ, সন্তানের খোরপোষ এবং স্ত্রীর ব্যক্তিগত মালামাল ফেরত দেওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে স্বামী তালাক দিতে চাইলে শুধু মুখে তালাক উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারা অনুযায়ী, তালাক উচ্চারণের পর যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং তার একটি কপি স্ত্রীকে দিতে হবে। নোটিশ চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছানোর পর ৯০ দিন না গেলে তালাক কার্যকর হয় না, যদি এর মধ্যে তা প্রত্যাহার না করা হয়। ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যানকে পুনর্মিলনের উদ্দেশ্যে Arbitration Council গঠন করার বিধানও রয়েছে। স্ত্রী গর্ভবতী হলে ৯০ দিন বা গর্ভাবস্থার শেষ—যেটি পরে হবে—তার আগে তালাক কার্যকর হয় না। অর্থাৎ শুধু ‘তালাক হয়ে গেছে’ শুনেই নিজের অধিকার বা আইনি অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
১. বাকি দেনমোহর পাওয়ার অধিকার
তালাকের পর নারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অধিকারগুলোর একটি হলো বকেয়া দেনমোহর। কাবিননামায় নির্ধারিত দেনমোহরের কোনো অংশ পরিশোধ করা না হয়ে থাকলে, সেটি আদায়ের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারায় বলা হয়েছে, নিকাহনামায় দেনমোহর কীভাবে বা কখন পরিশোধ করা হবে তা নির্দিষ্ট না থাকলে পুরো দেনমোহর চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলেও দেনমোহরের অধিকার নষ্ট হয় না। Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939-এর ৫ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিবাহবিচ্ছেদের কারণে স্ত্রীর দেনমোহরের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে না।
কী করবেন?
কাবিননামার মূল কপি বা সত্যায়িত কপি সংরক্ষণ করুন। দেনমোহরের কত টাকা পরিশোধ হয়েছে এবং কত টাকা বাকি—তার প্রমাণ থাকলে সেটিও রাখুন। বকেয়া দেনমোহর আদায়ে পারিবারিক আদালতে মামলা করা যায়। ২০২৩ সালের Family Courts Act অনুযায়ী পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে দেনমোহর রয়েছে।
২. তালাকের পর ভরণপোষণ—বিষয়টি বুঝে নিতে হবে
তালাকের পর ভরণপোষণের বিষয়টি অনেক সময় সরলভাবে বলা হয়—‘স্বামীকে আজীবন খোরপোষ দিতে হবে’ অথবা ‘তালাকের পর স্ত্রীর কোনো ভরণপোষণ নেই’। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার এবং তালাকের পরের আর্থিক অধিকার আলাদা করে বিবেচনা করতে হয়। Muslim Family Laws Ordinance-এর ৯ ধারায় স্ত্রীকে যথাযথ ভরণপোষণ না দিলে Arbitration Council-এর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তালাকের পর ভরণপোষণ নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে তালাকের ধরন, কার্যকর হওয়ার সময়, ইদ্দতকাল, পক্ষগুলোর পরিস্থিতি এবং মামলার প্রকৃতির ওপর। তাই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।জাতিসংঘের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত একটি আইনি মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মুসলিম নারীদের তালাক-পরবর্তী ভরণপোষণ নিয়ে আইনি কাঠামোয় আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট post-divorce maintenance ব্যবস্থা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থাৎ তালাকের পর নিজের ভরণপোষণের দাবি আছে কি না, কতদিনের জন্য এবং কোন আইনি ভিত্তিতে—তা ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী যাচাই করা উচিত।
৩. সন্তানের ভরণপোষণ আলাদা অধিকার
তালাক হয়ে গেলেও সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও তার খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের বিষয়ে বাবার দায়িত্বের প্রশ্ন থাকে। পারিবারিক আদালত সন্তানের ভরণপোষণ এবং সন্তানের হেফাজত/অভিভাবকত্বের বিষয় বিবেচনা করতে পারে। তাই ‘তালাক হয়ে গেছে, এখন সন্তানের সব দায়িত্ব মায়ের’—এমন ধারণা সঠিক নয়। সন্তানের স্কুলের খরচ, চিকিৎসার বিল, ওষুধ, দৈনন্দিন ব্যয়—যতটা সম্ভব নথি ও রসিদসহ সংরক্ষণ করুন। ভবিষ্যতে সন্তানের ভরণপোষণ নিয়ে বিরোধ হলে এসব নথি কাজে আসতে পারে।
৪. সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব এক বিষয় নয়
সন্তান কার কাছে থাকবে এবং সন্তানের আইনগত অভিভাবকত্ব—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়। পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে guardianship and custody of children রয়েছে। তাই তালাকের সময় শুধু ‘সন্তান আমার কাছে থাকবে’—এই মৌখিক সমঝোতার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনে আইনজীবীর মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা উচিত।
৫. নিজের সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র
বিবাহের কারণে স্ত্রীর নিজের সম্পত্তির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বামীর কাছে চলে যায় না।
তালাকের পর নিজের—
স্বর্ণালংকার;
ব্যক্তিগত জিনিস;
নিজের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব;
নিজের উপার্জন;
নিজের নামে থাকা সম্পত্তি;
গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র
নিরাপদে রাখুন।
সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ হলে দলিল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদ, ক্রয়সংক্রান্ত কাগজ ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. তালাকের কাগজপত্র সংগ্রহ করুন
তালাকের পর শুধু মৌখিকভাবে ‘তালাক হয়েছে’—এমন অবস্থায় থাকা ঝুঁকিপূর্ণ।
সংরক্ষণ করুন—
তালাকের নোটিশের কপি
চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো নোটিশের প্রমাণ
কাবিননামা
তালাক নিবন্ধনের কাগজপত্র
পারিবারিক আদালতের কোনো আদেশ বা ডিক্রি
দেনমোহর পরিশোধের প্রমাণ
সন্তানের জন্মনিবন্ধন
সন্তানের খরচের কাগজপত্র
প্রয়োজনে এসব নথির স্ক্যান কপি আলাদা নিরাপদ জায়গায় রাখুন।
৭. স্ত্রী নিজে তালাকের উদ্যোগ নিলে?
বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিবাহবিচ্ছেদের উদ্যোগ নিতে পারেন। যদি কাবিননামায় স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন, স্ত্রী সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন; মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৮ ধারায় এ ক্ষেত্রে ৭ ধারার প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939-এর ২ ধারায় নির্দিষ্ট কিছু কারণে একজন মুসলিম নারী আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি চাইতে পারেন। এর মধ্যে স্বামীর দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, দুই বছর ভরণপোষণ না দেওয়া, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে একাধিক বিয়ে, বৈবাহিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা এবং নিষ্ঠুর আচরণের মতো কারণ রয়েছে।
তাই স্ত্রী তালাক চান মানেই তাকে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে—এমন নয়। কাবিননামায় কী আছে এবং বিবাহবিচ্ছেদের কারণ কী, তার ওপর আইনি পথ নির্ভর করতে পারে।
৮. পারিবারিক আদালতে কোথায় যাবেন?
দেনমোহর, ভরণপোষণ, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা সন্তানের হেফাজতের বিষয়ে পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্ত্রী যেখানে সাধারণত বসবাস করেন, সেই এলাকার পারিবারিক আদালতেও বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলা করার এখতিয়ার থাকতে পারে। অর্থাৎ আইনি ব্যবস্থা নিতে সবসময় সাবেক স্বামীর এলাকার আদালতেই যেতে হবে—এমন নয়।
তালাকের পর নারীর করণীয়: ছোট্ট চেকলিস্ট
তালাকের পর আবেগের পাশাপাশি কয়েকটি বাস্তব কাজ দ্রুত করা ভালো—
১. কাবিননামা সংগ্রহ করুন।
২. বকেয়া দেনমোহরের হিসাব করুন।
৩. তালাকের নোটিশ ও নিবন্ধনের কাগজ সংগ্রহ করুন।
৪. ইদ্দতকালীন ও অন্যান্য প্রাপ্য ভরণপোষণের বিষয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
৫. সন্তান থাকলে তার ভরণপোষণ ও হেফাজতের বিষয় লিখিতভাবে নির্ধারণের চেষ্টা করুন।
৬. নিজের ব্যাংক হিসাব ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির কাগজপত্র নিরাপদে রাখুন।
৭. স্বর্ণালংকার ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের তালিকা তৈরি করুন।
৮. গুরুত্বপূর্ণ নথির ডিজিটাল কপি রাখুন।
৯. কোনো কাগজ না বুঝে স্বাক্ষর করবেন না।
১০. বিরোধ থাকলে পারিবারিক আইনজীবী বা আইনগত সহায়তা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
বিবাহবিচ্ছেদ জীবনের একটি কঠিন পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু সম্পর্ক শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন নারীর আইনগত অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
দেনমোহর, সন্তানের ভরণপোষণ, সন্তানের হেফাজত, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং তালাকের বৈধ প্রক্রিয়া—প্রতিটি বিষয়ে নিজের অবস্থান জানা জরুরি।
তথ্যসূত্র: এমডিদুলাল ল ফার্ম