একই দাদু-নানুর উঠোনে ছুটে বেড়ানো, ঈদের নতুন জামা দেখানো, পূজার ছুটিতে একসঙ্গে গল্প আর দুষ্টুমি—কাজিন মানেই রক্তের সম্পর্কে বাঁধা এক অনন্য বন্ধুত্ব।
একসময় ছিল, পকেটে টাকা না থাকলেও আনন্দের কোনো অভাব ছিল না। বাড়ির পাশের গাছ থেকে কাঁচা তেঁতুল পেড়ে লবণ-মরিচ মাখিয়ে সবাই মিলে খাওয়া, কে বেশি টক সহ্য করতে পারে সেই প্রতিযোগিতা, আর তারপর একসঙ্গে হেসে গড়িয়ে পড়া!
পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন জামা পরে মেলা ঘোরা, নাগরদোলায় চড়া, হাতে রঙিন বাঁশি আর কাগজের ঘুড়ি। ঈদ এলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ছুটে বেড়ানো, সালামি গোনা, একসঙ্গে ছবি তোলা আর রান্নাঘর থেকে চুরি করে সেমাই খেতে গিয়ে নানুর কাছে ধরা পড়া। এসব স্মৃতিই যেন আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সময় বদলেছে। আজ সবাই ব্যস্ত। কেউ পড়াশোনায়, কেউ চাকরিতে, কেউ সংসারে, কেউবা দেশের বাইরে। সেই দুষ্টুমি নেই, বিকেলভর খেলাধুলা নেই, তেঁতুল ভাগাভাগি করে খাওয়ার সেই ছোট্ট আনন্দও যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।
তবু যখন পুরোনো ছবিগুলো দেখি কিংবা হঠাৎ কোনো কাজিনের ফোন আসে, মনে হয়, সময় হয়তো অনেক কিছু বদলে দিয়েছে; কিন্তু শৈশবের সেই বন্ধন এখনো ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।
সেই অমূল্য সম্পর্ককে সম্মান জানাতেই প্রতি বছর পালিত হয় ন্যাশনাল কাজিন ডে। প্রতি বছর ২৪ জুলাই বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, ন্যাশনাল কাজিন ডে পালিত হয়। যদিও এটি সরকারি ছুটির দিন নয়, তবু পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধন উদ্যাপনের একটি জনপ্রিয় উপলক্ষ হিসেবে দিনটি পরিচিত।
এই দিনের সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাতা বা শুরুর ইতিহাস জানা যায়নি। বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এটি যুক্তরাষ্ট্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আজও দিনটির উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা চললেও এর মূল উদ্দেশ্য একটাই—কাজিনদের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা।
কেন এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকের কাছেই কাজিন শুধু আত্মীয় নন, বরং শৈশবের প্রথম বন্ধু।
পারিবারিক স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে সাহায্য করেন।
একসঙ্গে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা জীবনের মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকে।
সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হতে পারেন।
পরিবারে প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ ও আন্তরিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষ দিনটি নানা উপায়ে উদ্যাপন করে। যেমন—
কাজিনদের সঙ্গে পারিবারিক পুনর্মিলনী বা ছোট আড্ডার আয়োজন।
পুরোনো ছবি ও স্মৃতি ভাগাভাগি করা।
দূরে থাকলে ফোন বা ভিডিও কলে কথা বলা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করে #NationalCousinsDay বা বাংলা হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা।
একসঙ্গে কোথাও খেতে যাওয়া বা ছোট ভ্রমণে বের হওয়া।
আমাদের সংস্কৃতিতে কাজিনদের গুরুত্ব
ঈদে গ্রামের বাড়ি বা নানাবাড়িতে সবাই মিলে আনন্দ করা, বিয়ের অনুষ্ঠান, গায়ে হলুদ কিংবা পারিবারিক উৎসবে কাজিনদের ব্যস্ততা সবচেয়ে বেশি। দুর্গাপূজা, পয়লা বৈশাখ কিংবা অন্যান্য উৎসবে কাজিনদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর আলাদা আনন্দ রয়েছে।
গরমের ছুটিতে নানাবাড়ি বা দাদাবাড়িতে একসঙ্গে খেলাধুলা, দাদুর চিবানো পানের ছাতু কাড়াকাড়ি করে খাওয়া, গল্প আর দুষ্টুমির স্মৃতি—এসবই আজও অনেকের শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিময় অধ্যায়।
বাংলাদেশের যৌথ পরিবার ও আত্মীয়কেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে কাজিনরা অনেক সময় ভাইবোনের মতোই ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তাই আমাদের সমাজে এই সম্পর্কের আবেগ ও গুরুত্ব অন্য অনেক দেশের তুলনায় আরও গভীর।
ছোট্ট একটি বার্তা
জীবনের ব্যস্ততায় হয়তো অনেক কাজিনের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেছে। ন্যাশনাল কাজিন ডে হতে পারে সেই সম্পর্কগুলোকে আবার নতুন করে উষ্ণ করে তোলার উপলক্ষ। একটি ফোনকল, একটি বার্তা কিংবা একটি পুরোনো ছবি—এগুলোই ফিরিয়ে আনতে পারে বহু দিনের হাসি আর অমূল্য স্মৃতি।
*ইশরাত জাহান ইনা