প্রয়াত মার্কিন ব্যবসায় উদ্যোক্তা ও যৌন সম্পর্কিত অপরাধে অভিযুক্ত জেফরি এপস্টেইনের সাথে সম্পর্কিত লাখ লাখ নথির মধ্যে একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এপস্টেইনের এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন।
এএফপির প্রতিবেদন মতে, নিউইয়র্ক সিটিতে এপস্টেইনের নিজ বাড়িতে প্রায় দুই ঘণ্টার সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিল। তবে কবে ও কখন সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয় তা জানা যায়নি। এক নাবালিকা মেয়েকে ধর্ষণ ও নিগ্রহের অভিযোগে ২০০৮ সালে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়।
এসব অভিযোগে ২০১৯ সালের আগস্টে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর মাস খানেকের মাথায় জেলের ভেতর মারা যান। তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। যদিও এ নিয়ে অনেকেই সন্দেহ ও সংশয় প্রকাশ করেন।
এপস্টেইনের শিশু পাচার ও যৌন শোষণের মতো কুকর্ম সম্পর্কিত বহু নথি মার্কিন সরকারের কাছে ছিল। ভুক্তভোগীরা বহুদিন ধরে মার্কিন সরকারের কাছে এই নথিগুলো প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় ‘এপস্টেইন ফাইলস’ নামে পরিচিত এসব নথি প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিলেও দায়িত্ব নেয়ার পর এ ব্যাপারে গড়িমসি শুরু করেন ট্রাম্প।
তবে এক পর্যায়ে ঘরে-বাইরে তীব্র চাপের মুখে পড়ে গত নভেম্বরে এপস্টেইন সংক্রান্ত ফাইল প্রকাশ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এরপর গত কয়েক মাসে দফায় দফায় এসব নথি প্রকাশ করা হয়েছে।
সবশেষ গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) ৩০ লাখেরও বেশি নথি প্রকাশ করা হয়। বিশ্বের বহু দেশের শীর্ষ নেতা, রাজপরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে বিনোদন জগতের মহাতারকাসহ অনেকের নাম উঠে এসেছে এসব নথিতে।
এসব নথির মধ্যে এপস্টেইনের সাক্ষাৎকারটিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট ও ইউরোপের প্রথম সারির বেশিরভাগ গণমাধ্যমই এটি প্রকাশ করেছে। সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, স্টিভ ব্যানন এপস্টেইনকে প্রশ্ন করছেন, ‘আপনি কি নিজেকে শয়তান মনে করেন?’
প্রশ্নের জবাবে কালো শার্ট ও চশমা পরা এপস্টেইন মৃদু হেসে বলছেন, ‘না, আমি শয়তান নই। আমার ঘরে একটি খুব ভালো মানের আয়না আছে। সেখানে প্রায়ই আমি নিজেকে দেখি।’ এরপর আবারও তাকে একই প্রশ্ন করেন ব্যানন। তখন এপস্টেইন বলেন, ‘আমি জানি না; আপনি এমন কথা কেন বলছেন?’
সাক্ষাৎকারে ব্যানন এপস্টেইনকে ‘তৃতীয় শ্রেণির যৌন শিকারি’ বলে অভিহিত করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ‘তৃতীয় শ্রেণির যৌন শিকারি/অপরাধী’ বলতে সেই সব যৌন অপরাধীদের বোঝানো হয়, যারা সামাজিক কিংবা জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।
জবাবে এপস্টেইন বলেন, ‘না, আমি তৃতীয় শ্রেণির যৌন অপরাধী নই। আমি যৌন শিকারি এটা সত্য, কিন্তু তা একেবারেই স্বল্পতম মাত্রার।’ ব্যানন তখন জিজ্ঞাসা করেন, ‘তাহলে আপনি স্বীকার করছেন যে, আপনি একজন ক্রিমিনাল তথা অপরাধী।’ জবাবে এপস্টেইন বলেন, ‘হ্যাঁ।’
ব্যানন এরপর জিজ্ঞাসা করেন, এপস্টেইন তার অর্জিত অর্থ-সম্পদকে ‘নোংরা’ মনে করেন কিনা। কারণ তিনি অর্থের বিনিময়ে বিশ্বের অনেক জঘন্য মানুষের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। উত্তরে এপস্টেইন বলেন, ‘না, আমি তা মনে করি না। আমি যে অর্থ উপার্জন করেছি, বৈধভাবেই করেছি। তবে ন্যায়-নীতির ব্যাপারটি খুবই জটিল। এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে অনেকের দ্বিমত থাকতেই পারে।’
এপস্টেইন দাবি করেন, তিনি পাকিস্তান ও ভারতে পোলিও নির্মূল কর্মসূচিতে নগদ অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন। নথি অনুযায়ী, এপস্টেইনের সঙ্গে ব্যাননের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ইমেইল ও চিঠিপত্রে দেখা যায়, ইউরোপে ব্যাননের রক্ষণশীল রাজনৈতিক মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এপস্টেইন।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এপস্টেইন নিজেকে ব্যাননের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য সহযোগী হিসেবে তুলে ধরেন এবং ইউরোপীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই তথ্য প্রকাশের পর ব্যাননের ভূমিকা ও এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাননের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো মন্তব্য আসেনি।
নিউইয়র্কের একটি ইহুদি পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জেফরি এপস্টেইনের। গত শতকের ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি নিউইয়র্কের ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
শিক্ষক থাকাকালেই ডাল্টন স্কুলের এক শিক্ষার্থীর বাবার সঙ্গে ভালো সম্পর্কের সুবাদে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ ব্যাংক বিয়ার স্টিয়ার্নসের এক জ্যেষ্ঠ অংশীদারের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। সেই পরিচয়ের চার বছরের মাথায় বিয়ার স্টিয়ার্নসের অংশীদার বনে যান এপস্টেইন।
১৯৮২ সাল নাগাদ এপস্টেইন তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এই কোম্পানিটি এমন সব গ্রাহকের সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করত, যার মূল্য ১০০ কোটি ডলারের (৮০ কোটি পাউন্ড) বেশি। কোম্পানিটি দ্রুতই সাফল্য পায়। এপস্টেইনও তখন তাঁর ভাগ্য গড়তে শুরু করেন।
বিনিয়োগ ব্যবসায় দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সুবাদে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অর্থের মালিক বনে যান এপস্টেইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ড, পাম বিচে নিজের ‘সাম্রাজ্য’ গড়ে তোলেন। দেশ-বিদেশের প্রভাবশালী সব রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা আমোদ-ফূর্তির জন্য এপস্টেইনের ‘সাম্রাজ্যে’ যেতেন।