প্রথম পিরিয়ডের আগে যেসব প্রস্তুতি জরুরি

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

কৈশোরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের শরীরে নানা পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রথম পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে প্রথম পিরিয়ড শুরু হয়, যদিও কারও ক্ষেত্রে এর আগে বা পরেও হতে পারে। এটি বয়ঃসন্ধির একটি স্বাভাবিক অংশ। তবে আগে থেকে ধারণা না থাকলে প্রথম পিরিয়ডের সময় অনেক কিশোরী ভয় পেতে পারে, বিব্রত হতে পারে কিংবা বুঝতে পারে না কী করতে হবে।


তাই প্রথম পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগেই মেয়েদের শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে মায়ের, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।



১. পিরিয়ড সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা দিন: প্রথম পিরিয়ডের আগে মেয়েকে বুঝিয়ে বলুন, কেন ঋতুস্রাব হয় এবং এটি শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন। জরায়ুর ভেতরের আস্তরণের একটি অংশ রক্তের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াই হলো পিরিয়ড। এটি কোনো রোগ নয়, লজ্জার বিষয়ও নয়। পিরিয়ড শুরু হলে অন্তর্বাসে রক্তের দাগ দেখা যেতে পারে। কখনো হালকা পেটব্যথা, কোমরে অস্বস্তি কিংবা মেজাজের পরিবর্তনও হতে পারে। আগে থেকে এসব জানা থাকলে প্রথম পিরিয়ডের সময় আতঙ্ক কমবে।



২. স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের নিয়ম শেখান: প্রথম পিরিয়ডের জন্য একটি ছোট স্বাস্থ্যসুরক্ষা কিট তৈরি করে দিতে পারেন। এতে রাখুন স্যানিটারি প্যাড, অতিরিক্ত অন্তর্বাস, ব্যবহৃত প্যাড রাখার উপযোগী ব্যাগ এবং টিস্যু বা পরিষ্কারের প্রয়োজনীয় উপকরণ। কীভাবে প্যাড অন্তর্বাসে লাগাতে হয়, কতক্ষণ পর পরিবর্তন করতে হয় এবং ব্যবহৃত প্যাড কীভাবে কাগজে মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলতে হয়, তা বুঝিয়ে দিন। সাধারণত প্যাড ভিজে গেলে বা প্রায় ৪–৬ ঘণ্টা পর পরিবর্তন করা ভালো; রক্তপাত বেশি হলে আরও আগেই বদলাতে হবে। ব্যবহৃত প্যাড কখনো টয়লেটে ফেলা উচিত নয়।



৩. শরীরের পরিবর্তনগুলো চিনতে শেখান: প্রথম পিরিয়ডের কয়েক মাস বা বছর আগে স্তনের বিকাশ, বগল ও যৌনাঙ্গে লোম গজানো এবং উচ্চতা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনো অন্তর্বাসে সাদা বা স্বচ্ছ স্রাবও দেখা যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। এসব পরিবর্তন সম্পর্কে আগে থেকে জানালে কিশোরীরা নিজের শরীর নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করবে না। তবে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, চুলকানি বা ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।



৪. পরিচ্ছন্নতার নিয়ম শেখান: পিরিয়ডের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্যাড পরিবর্তনের আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করান। প্রতিদিন পরিষ্কার পানি দিয়ে যৌনাঙ্গের বাইরের অংশ ধুয়ে শুকনো অন্তর্বাস পরতে বলুন। যোনিপথের ভেতরে সাবান, সুগন্ধি বা বিশেষ পরিষ্কারক ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। পিরিয়ডের সময় গোসল করা যায়, স্বাভাবিক খাবার খাওয়া যায় এবং শরীর ভালো থাকলে স্কুলে যাওয়া ও খেলাধুলাও করা যায়। এ সময় অযথা বিধিনিষেধ আরোপ না করে স্বাভাবিক জীবনযাপনে উৎসাহিত করুন।



৫. স্কুলে বা বাইরে থাকলে কী করবে, তা জানান: প্রথম পিরিয়ড বাড়িতে, স্কুলে কিংবা বাইরে যেকোনো জায়গায় শুরু হতে পারে। তাই ব্যাগে একটি প্যাড ও অতিরিক্ত অন্তর্বাস রাখার অভ্যাস করানো ভালো। স্কুলে পিরিয়ড শুরু হলে কীভাবে শিক্ষিকা, স্কুলের স্বাস্থ্যকর্মী বা বিশ্বস্ত কোনো বড় মানুষের সাহায্য চাইতে হবে, সেটিও বুঝিয়ে দিন। পোশাকে রক্তের দাগ লেগে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ জায়গায় গিয়ে প্যাড পরিবর্তন করতে এবং প্রয়োজন হলে সাহায্য চাইতে বলুন।



৬. ভয় ও লজ্জা দূর করতে পাশে থাকুন: প্রথম পিরিয়ড শুধু শারীরিক নয়, মানসিক পরিবর্তনেরও সময়। মেয়েকে বোঝান, প্রত্যেকের শরীর আলাদা এবং সবার পিরিয়ড একই বয়সে শুরু হয় না। পিরিয়ড নিয়ে প্রশ্ন করলে বকাঝকা বা লজ্জা না দিয়ে সহজ ভাষায় উত্তর দিন। এটিও মনে রাখা জরুরি, পিরিয়ড শুরু হওয়া মানেই একটি মেয়ে মানসিকভাবে বড় হয়ে গেছে—এমন নয়। তার বয়স অনুযায়ী যত্ন, সুরক্ষা ও মানসিক সমর্থন প্রয়োজন।


কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?



- ১৫ বছর বয়সেও পিরিয়ড শুরু না হলে।


- ১৩ বছর বয়সেও স্তনের বিকাশের মতো বয়ঃসন্ধির লক্ষণ না দেখা গেলে।


- পিরিয়ডের ব্যথা এত বেশি হলে যে স্কুলে যাওয়া বা দৈনন্দিন কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।


- রক্তপাত অত্যধিক হলে, মাথা ঘুরলে বা দুর্বলতা দেখা দিলে।



প্রথম পিরিয়ডের প্রস্তুতি মানে শুধু প্যাড ব্যবহারের নিয়ম শেখানো নয়; বরং মেয়েকে নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন, আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভীক করে তোলা। পরিবারে পিরিয়ড নিয়ে খোলামেলা আলোচনা থাকলে কিশোরীরা এই স্বাভাবিক পরিবর্তনকে ভয় নয়, বরং স্বাভাবিক জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শিখবে।

sidebar ad