ডায়াবেটিক ফুট: অবহেলা করে অঙ্গহানির ঝুঁকিতে পড়ছেন না তাে?

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬

ডায়াবেটিক ফুট। ছবি: সংগৃহীত
ডায়াবেটিক ফুট। ছবি: সংগৃহীত

সকালে ঘুম থেকে উঠে পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন আংগুলের পাশে ছোট্ট একটি কাটা দাগ। ব্যথা নেই, তাই খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না। কয়েকদিন পর দেখা গেল ক্ষতটি শুকানোর বদলে আরও বড় হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটে। একটি ছোট ক্ষত, সামান্য ফোসকা কিংবা পায়ের আংগুলে একটু অসাড়তা-অনেকের কাছেই ব্যাপারগুলো তেমন গুরুতর মনে হয়না। কিন্তু একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য পায়ের এই ছোট্ট সমস্যাই কখনো কখনো অনেক বড় জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সমস্যাকেই বলা হয় ডায়াবেটিক ফুট। সময়মতো এর যত্ন না নিলে সংক্রমণ, ক্ষত এমনকি অঙ্গহানির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। 


আজকাল ডায়াবেটিস রোগ এতোটাই কমন যা কোন বয়সের দোহাই মানে না। বিশ্বজড়ে প্রায় ৮৩০ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বিগত দশকগুলোতে এর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি এমন এক রোগ যেখানে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা খুব বেশি থাকে। আমাদের নিত্যদিনের খাওয়া খাবার থেকে এই গ্লুকোজ আসে যা, শরীরের কোষের শক্তির জন্য প্রয়োজন। ইনসুলিন নামক হরমোন কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ করতে সাহায্য করে। টাইপ ১ ডায়াবেটিসের সাথে, শরীর ইনসুলিন তৈরি করেনা। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সাথে শরীর ভালোভাবে ইনসুলিন তৈরি বা ব্যবহার করেনা। পর্যাপ্ত ইনসুলিন ছাড়া, গ্লুকোজ স্বাভাবিকের মতো দ্রুত কোষে প্রবেশ করতে পারেনা। আর এতে রক্তে গ্লুকোজ তৈরি হয় এবং উচ্চ রক্তে শর্করার মাত্রা সৃষ্টি করে। 


এখন প্রশ্ন হলো, ডায়াবেটিসে কিভাবে পায়ের সমস্যা করে? দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস থাকার দরুণ রক্তে শর্করার উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পায়ের স্নায়ু এবং রক্তনালীগুলোর ক্ষতি করে। স্নায়ুর ক্ষতি যাকে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি বলে। এতে পায়ের অসাড়তা, ঝনঝন, ব্যথা বা অনুভূতি হ্রাস করে দিতে পারে। আর এই অনুভূতির হ্রাসের ফলে পায়ে কখনো কাটা, ফোস্কা বা ক্ষত হলেও তা বোঝাই যাবেনা। ফলশ্রুতিতে ক্ষত সংক্রমিত হতে পারে। একটি সংক্রমণ এবং দূর্বল রক্ত প্রবাহ, যা গ্যাংগ্রিন হওয়ার কারণ হতে পারে। এই গ্যাংগ্রিন বা আলসার যদি চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো না হয়, তাহলে তার তখন একটাই সমাধান; অঙ্গচ্ছেদ। পৃথিবীতে যতো রোগীর পা কাটা লাগে তার মধ্যে ৮৪% হল ডায়াবেটিক পা। 


কাদের ঝুঁকি বেশি?


বয়স ৪০ এর বেশি যাদের, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা যারা এটি নিয়ন্ত্রণে সচেতন নন, উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ কোলেস্টেরল আছে যাদের, করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা স্ট্রোকের ইতিহাস আছে যাদের। ডায়াবেটিক ফুটের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনেক রোগী সমস্যা গুরুতর হওয়ার আগ পর্যন্ত বিষয়টি বুঝতে পারেন না। নিয়মিত পা পরীক্ষা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।  


যে লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না


ডায়াবেটিসে পায়ের ত্বক, স্নায়ু বা রক্ত সঞ্চালন সংক্রান্ত যেকোন সমস্যা থেকে সংক্রমণ বা অন্য কোন জটিলতা সৃষ্টির ঝুঁকি বেড়ে যায়। জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এমন কিছু লক্ষণ হলো-


- পায়ে ঝিনঝিন বা অবশ অনুভূতি

- পায়ের ত্বক শুষ্ক হয়ে ফেটে যাওয়া

- কাটা, ফোসকা বা ঘা তৈরি হওয়া

- ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া

- ছত্রাকজনিত সংক্রমণ যেমন, অ্যাথলেটস ফুট এবং পায়ের নখের ছত্রাক সংক্রমণ 

- নখ ভেতরে ঢুকে যাওয়া 

- পা লাল হয়ে যাওয়া বা ফুলে যাওয়া

- পুঁজ বা দূর্গন্ধ হওয়া

- পায়ের কোন অংশ কালচে হয়ে যাওয়া 


প্রতিকারের উপায়


ডায়াবেটিস থাকলে এবং এ থেকে পা রক্ষা করার সর্বোত্তম উপায় হল প্রতিদিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। এটি স্নায়ু এবং রক্তনালীর ক্ষতিকে আরও খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। পরবর্তী ধাপ হলো পায়ের ত্বককে সুস্থ রাখা। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত-


প্রতিদিন পা চেক করা


জুতার ঘর্ষণের দ্বারা সৃষ্ট হতে পারে এমন আঁচিল বা দাগ সহ যে কোন ধরনের কাটা, লালভাব এবং যেকোন ধরনের পরিবর্তন খেয়াল রাখতে হবে। শুধুমাত্র পায়ের উপরিভাগ নয় পায়ের নিচের অংশগুলোও ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। 


প্রতিদিন পা ধৌত করা


কিছুটা উষ্ণ পানি এবং সাবান দিয়ে পা পরিষ্কার করতে হবে। তবে আগে পা ভিজিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই, এতে ত্বককে আরও শুষ্ক করে দিতে পারে। পা ধুয়ে শুকানোর পরে আঙ্গুলের মধ্যে ট্যালকম পাউডার বা কর্নস্টার্চ ব্যবহার করা যেতে পারে। এরা আর্দ্রতা শোষণ করতে পারে। আর যদি লোশন ব্যবহার করতে হয় তবে তা পায়ের আংগুলের মধ্যে লাগানো যাবেনা। 


ক্লিপার দিয়ে নখ কাটা


ক্লিপার বা নেইলকাটার দিয়ে পায়ের নখ কাটতে হবে। অনেক সময় পায়ের নখ পুরু হয়ে যায় বা ত্বকে বাঁকা হয়ে বসে যায় এবং তা যদি নিজে নিজে কাটতে সমস্যা হয় তবে এক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হলে ভালো হবে। 



উপযুক্ত জুতা পরিধান করা


হাঁটার সময় সবসময় পা রক্ষা করার জন্য উপযুক্ত জুতা এবং মোজা বা চপ্পল ব্যবহার করতে হবে। বাইরে এবং ঘরের ভেতরেও জুতা পরে থাকতে হবে। তবে জুতাটি হতে হবে মসৃণ এবং তা যেন ভালোভাবে পায়ের সাথে ফিট হয়। 


তাপ এবং ঠান্ডা থেকে রক্ষা


উন্মুক্ত ত্বকে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো এবং কখনো সমুদ্রের ধারে কাছে গেলে খালি পায়ে হাঁটা যাবেনা। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় হিটার বা ফায়ারপ্লেসে পা গরম করার পরিবর্তে মোজা পরা উত্তম। 


পায়ে রক্ত প্রবাহ ঠিক থাকা


হাঁটু মুড়ে না বসাই উত্তম। বসতে হলে পা উপরে রাখতে হবে। অধিকক্ষন বসে থাকতে হলে পায়ের আঙুলগুলো নাড়াতে হবে। টাইট মোজা পরা যাবেনা। সক্রিয় থাকুন, তবে এমন সব কার্যকলাপ বেছে নিন যা পায়ের উপর খুব বেশি চাপ ফেলে না। যেমন, হাঁটা বা সাঁতার কাটা। 


হেলথ কেয়ার ভিজিট করা


মাঝে মাঝে পা চেক আপের জন্য বিশেষজ্ঞের কাছে ঘুরে আসা ভালো। পায়ে কোন ঘা হলে ঘরোয়া পদ্মতিতে বা কেমিক্যাল ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।  


মনে রাখতে হবে যে, ব্লাড সুগার যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং প্রতিদিন পায়ের যত্ন নেওয়া যায় তাই হবে ডায়াবেটিক পায়ের গুরুতর সমস্যা প্রতিরোধ করার সেরা পদক্ষেপ। 


এসএন

sidebar ad