কেনা দামের সঙ্গে কিছু টাকা যোগ করলেই পণ্যের সঠিক দাম ঠিক হয় না। প্রকৃত খরচ, বাজারদর, প্রতিযোগিতা এবং ক্রেতার কাছে পণ্যের মূল্য—সবকিছু বিবেচনা করেই নির্ধারণ করতে হয় বিক্রয়মূল্য।
ব্যবসায় পণ্য বিক্রি হচ্ছে, ক্রেতাও আছে। কিন্তু মাস শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে যদি দেখেন প্রত্যাশিত লাভ নেই, তাহলে প্রথমেই যে বিষয়টি যাচাই করা দরকার তা হলো—আপনি কি সঠিক দামে পণ্য বিক্রি করছেন?
অনেক উদ্যোক্তা খুব সহজ একটি হিসাব করেন—৫০০ টাকায় পণ্য কিনে ১০০ টাকা লাভ রেখে ৬০০ টাকায় বিক্রি করেন।
কিন্তু এই হিসাব কি সত্যিই ঠিক?
পণ্যটি কিনে দোকান বা গুদামে আনা, প্যাকেজিং, প্রচার, বিক্রয়কর্মীর কমিশন, অনলাইন লেনদেন কিংবা ব্যবসা পরিচালনার অন্যান্য খরচও তো আছে। এগুলো বাদ দিলে ১০০ টাকা লাভ হয়তো আর থাকছে না।
৫০০ টাকার পণ্যের প্রকৃত খরচ কত?
ধরা যাক, একটি পণ্যের ক্রয়মূল্য ৫০০ টাকা।
এর সঙ্গে পরিবহন খরচ ২০ টাকা, প্যাকেজিং ১০ টাকা, প্রচারের খরচ ১৫ টাকা এবং বিক্রয়-সংক্রান্ত অন্যান্য খরচ ১০ টাকা। ব্যবসা পরিচালনার কিছু খরচ পণ্যের ওপর ভাগ করে ধরলে আরও ২০ টাকা।
তাহলে মোট খরচ দাঁড়ায়—
৫০০ + ২০ + ১০ + ১৫ + ১০ + ২০ = ৫৭৫ টাকা।
আপনি যদি পণ্যটি ৬০০ টাকায় বিক্রি করেন, তাহলে এই হিসাব অনুযায়ী অবশিষ্ট থাকে মাত্র ২৫ টাকা।
অর্থাৎ আপনি যে ১০০ টাকা লাভ ভাবছিলেন, প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে না।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—পণ্যের ক্রয়মূল্য আর পণ্যের প্রকৃত খরচ এক নয়।
কোন খরচগুলো হিসাব করবেন?
ব্যবসার ধরন অনুযায়ী খরচ আলাদা হতে পারে। তবে সাধারণভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণের সময় কয়েকটি খরচ বিবেচনায় রাখা দরকার। পণ্য কেনা বা উৎপাদনের খরচ, কাঁচামাল, সরাসরি শ্রম, পরিবহন, প্যাকেজিং, বিক্রয় কমিশন ও লেনদেনের খরচ সরাসরি খরচের মধ্যে পড়ে।
এর পাশাপাশি আছে দোকান বা অফিসের ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, হিসাবরক্ষণ ও প্রচারের মতো ব্যবসা পরিচালনার খরচ। সব খরচ কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলেও ব্যবসার লাভ-লোকসানের হিসাবের অংশ। তাই মাসে মোট কত খরচ হচ্ছে, সেটিও উদ্যোক্তার জানা দরকার।
তাহলে পণ্যের দাম কত রাখবেন?
শুধু নিজের খরচের ওপর ভিত্তি করে দাম ঠিক করলেই হবে না। বাজারকেও দেখতে হবে। ধরা যাক, আপনার একটি পণ্যের প্রকৃত খরচ ৫৭৫ টাকা। আপনি ১০০ টাকা লাভ করতে চান। তাহলে ৬৭৫ টাকা দাম রাখতে পারেন।
কিন্তু একই ধরনের পণ্য যদি বাজারে ৬২০ টাকায় পাওয়া যায়, তাহলে ক্রেতা আপনার পণ্য ৬৭৫ টাকায় কেন কিনবে—এই প্রশ্নের উত্তরও আপনাকে দিতে হবে। আপনার পণ্যের মান কি ভালো? সেবা কি উন্নত? প্যাকেজিং কি আলাদা? পণ্যটির বিশেষ কোনো সুবিধা আছে? আপনার ব্র্যান্ডের প্রতি ক্রেতার আস্থা আছে?
অর্থাৎ দাম নির্ধারণ শুধু খরচের হিসাব নয়; বাজার ও ক্রেতার দৃষ্টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
‘২০ শতাংশ লাভ’ বললে কী বোঝায়?
এই জায়গায় অনেক ব্যবসায়ী ভুল করেন।
ধরা যাক, একটি পণ্যের খরচ ৫০০ টাকা।
খরচের ওপর ২০ শতাংশ যোগ করলে দাম হবে—
৫০০ + ১০০ = ৬০০ টাকা।
এটি হলো ২০ শতাংশ মার্কআপ।
কিন্তু আপনি যদি চান, বিক্রয়মূল্যের ২০ শতাংশ আপনার লাভ হবে, তাহলে হিসাব হবে—
৫০০ ÷ ০.৮ = ৬২৫ টাকা।
কারণ ৬২৫ টাকার ২০ শতাংশ হলো ১২৫ টাকা।
অর্থাৎ ৬০০ টাকা বিক্রয়মূল্যে লাভ ১০০ টাকা হলেও ৬২৫ টাকা বিক্রয়মূল্যে লাভ ১২৫ টাকা।
মার্কআপ হিসাব করা হয় খরচের ভিত্তিতে, আর লাভের মার্জিন হিসাব করা হয় বিক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে। ব্যবসার দাম নির্ধারণে এই পার্থক্য জানা গুরুত্বপূর্ণ।
বেশি বিক্রি মানেই বেশি লাভ নয়
একজন ব্যবসায়ী ১ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করে সব খরচ বাদ দিয়ে ৫ হাজার টাকা পেলেন।
আরেকজন ৮০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে পেলেন ১২ হাজার টাকা।
প্রথমজনের বিক্রি বেশি, কিন্তু দ্বিতীয়জনের লাভ বেশি।
তাই ব্যবসার সাফল্য শুধু বিক্রির পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। জানতে হবে—বিক্রি থেকে সব খরচ বাদ দেওয়ার পর কত টাকা থাকছে।
ছাড় দেওয়ার আগেও হিসাব করুন
ধরা যাক, একটি পণ্যের দাম ১,০০০ টাকা। ২০ শতাংশ ছাড় দিলে ক্রেতা দেবেন ৮০০ টাকা।
আপনার প্রকৃত খরচ যদি ৭৫০ টাকা হয়, তাহলে ছাড়ের পর আপনার হাতে থাকবে মাত্র ৫০ টাকা।
তাই “২০ শতাংশ ছাড়” দেওয়ার আগে দেখতে হবে, ছাড়ের পরও ব্যবসায় পর্যাপ্ত লাভ থাকছে কি না।
মাসে কত বিক্রি করলে খরচ উঠে আসবে?
এবার আসি ব্রেক-ইভেনের কথায়।
ধরা যাক, আপনার ব্যবসার মাসিক স্থায়ী খরচ ১ লাখ টাকা। একটি পণ্য ১,০০০ টাকায় বিক্রি করেন এবং প্রতি পণ্যে পরিবর্তনশীল খরচ ৬০০ টাকা।
প্রতি পণ্য বিক্রি থেকে স্থায়ী খরচ মেটানোর জন্য অবদান থাকছে—
১,০০০ – ৬০০ = ৪০০ টাকা।
তাহলে ১ লাখ টাকা স্থায়ী খরচ তুলতে প্রয়োজন—
১,০০,০০০ ÷ ৪০০ = ২৫০টি পণ্য।
অর্থাৎ এই উদাহরণে মাসে ২৫০টি পণ্য বিক্রি হলে ব্যবসা ব্রেক-ইভেন পর্যায়ে পৌঁছাবে—অর্থাৎ হিসাবের আওতাভুক্ত খরচ উঠে আসবে। এরপরের বিক্রয় থেকে লাভ তৈরি হতে পারে।
এই হিসাবটি একজন উদ্যোক্তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়—
“আমাকে মাসে অন্তত কতটা বিক্রি করতে হবে?”
নিজের ব্যবসায় হিসাবটি করে দেখুন
আপনার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া একটি পণ্য বেছে নিন।
ক্রয় বা উৎপাদন খরচ: __ টাকা
পরিবহন: __ টাকা
প্যাকেজিং: __ টাকা
বিক্রয় ও প্রচার: __ টাকা
কমিশন/লেনদেন খরচ: __ টাকা
অন্যান্য সরাসরি খরচ: __ টাকা
মোট পরিবর্তনশীল খরচ: __ টাকা
বিক্রয়মূল্য: __ টাকা
বিক্রয়মূল্য – পরিবর্তনশীল খরচ = প্রতি পণ্যে অবদান
এরপর মাসিক স্থায়ী খরচকে প্রতি পণ্যে অবদান দিয়ে ভাগ করলে বোঝা যাবে, মাসে কতটি পণ্য বিক্রি করলে আপনার ব্যবসা ব্রেক-ইভেন পর্যায়ে পৌঁছাবে।
এই হিসাব করার পর হয়তো দেখা যাবে, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পণ্যটিই সবচেয়ে বেশি লাভ দিচ্ছে না। আবার কোনো কম বিক্রি হওয়া পণ্য তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক হতে পারে।
ব্যবসার খরচ, বাজারদর ও ক্রেতার চাহিদা বদলালে পণ্যের দামও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ আজ যে দামে লাভ হচ্ছে, ছয় মাস পর একই দামে সেই লাভ নাও থাকতে পারে।
ভালো বিক্রি ব্যবসাকে এগিয়ে নেয়, কিন্তু সঠিক দাম ব্যবসাকে টেকসই করে।
বাণিজ্য জানালা | পর্ব ৩
বাকিতে বিক্রি: ক্রেতা বাড়ছে, কিন্তু ব্যবসার টাকা আটকে যাচ্ছে কেন?