ব্যবসায় বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু টাকা থাকছে না কেন?

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬

ব্যবসায় বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু টাকা থাকছে না কেন?

ব্যবসায় বিক্রি হচ্ছে, হিসাবের খাতায় লাভও দেখা যাচ্ছে। তবু মাসের শেষে হাতে টাকা নেই। কর্মীদের বেতন, দোকানভাড়া কিংবা সরবরাহকারীর বিল দিতে গিয়ে উদ্যোক্তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এটি অনেক ব্যবসার পরিচিত সমস্যা। কারণ বিক্রি হওয়া, লাভ হওয়া এবং হাতে নগদ টাকা থাকা—তিনটি এক বিষয় নয়।


ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তাই শুধু কত টাকা বিক্রি হলো তা জানলেই হবে না। জানতে হবে—কখন টাকা আসছে, কখন টাকা বের হচ্ছে এবং মাঝখানে কত টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।


বিক্রি আছে, টাকা নেই—কেন?


ধরা যাক, একটি পোশাকের ব্যবসা এক মাসে ১০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করল। শুনতে বেশ ভালো।


কিন্তু এর মধ্যে ৬ লাখ টাকার পণ্য বাকিতে বিক্রি হয়েছে। ক্রেতারা সেই টাকা দেবে দুই মাস পরে।


অর্থাৎ, ১০ লাখ টাকার বিক্রি হলেও এখন হাতে এসেছে ৪ লাখ টাকা।


এর মধ্যেই নতুন পণ্য কিনতে হবে, কর্মীদের বেতন দিতে হবে, দোকানভাড়া ও পরিবহন খরচ দিতে হবে। ফলে ব্যবসাটি লাভজনক হলেও সাময়িক নগদ সংকটে পড়তে পারে।


এখানেই আসে নগদ প্রবাহের হিসাব।


নগদ প্রবাহ আসলে কী?


সহজভাবে বললে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসায় কত টাকা ঢুকছে এবং কত টাকা বের হচ্ছে, তার হিসাবই নগদ প্রবাহ।


টাকা আসতে পারে—


* পণ্য বা সেবা বিক্রি থেকে


* পুরোনো পাওনা আদায় থেকে


* মালিকের বিনিয়োগ থেকে


* ঋণ বা অন্য অর্থায়ন থেকে


আবার টাকা বের হয়—


* পণ্য বা কাঁচামাল কেনায়


* কর্মীদের বেতন দিতে


* ভাড়া, বিদ্যুৎ ও পরিবহনে


* কর ও অন্যান্য ব্যবসায়িক খরচে


* ঋণের কিস্তি পরিশোধে


ব্যবসায় সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন টাকা বের হওয়ার সময়টি টাকা আসার সময়ের আগে চলে আসে।


লাভ আর নগদ টাকা এক নয়


একটি ব্যবসা কাগজে লাভ করতে পারে, কিন্তু হাতে নগদ নাও থাকতে পারে।


আবার ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ পাওয়া গেলে ব্যাংক হিসাবে টাকা বাড়বে, কিন্তু সেটি ব্যবসার আয় বা লাভ নয়। কারণ সেই অর্থ ভবিষ্যতে ফেরত দিতে হবে।


এই পার্থক্যটি না বুঝলে উদ্যোক্তা মনে করতে পারেন, ব্যবসা ভালো চলছে। পরে হঠাৎ কিস্তি, বেতন বা সরবরাহকারীর বিল দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন।


তাই ব্যবসার হিসাবের অন্তত তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার:


বিক্রি কত?


লাভ কত?


হাতে নগদ কত?


নিজের ব্যবসার নগদ প্রবাহ বুঝবেন কীভাবে?


বড় কোনো হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা দিয়েই শুরু করতে হবে এমন নয়। একটি খাতায় বা সাধারণ হিসাবের পাতায় আগামী তিন মাসের সম্ভাব্য আয় ও ব্যয় লিখে শুরু করা যায়।


ধরা যাক—


আগামী মাসে আসবে: ৫ লাখ টাকা


আগামী মাসে খরচ হবে: ৪ লাখ টাকা


মাসের শুরুতে হাতে আছে: ১ লাখ টাকা


তাহলে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক।


কিন্তু যদি একই মাসে ৭ লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা থাকে, তাহলে ১ লাখ টাকা হাতে থাকলেও আরও ১ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হবে। এই হিসাব আগেই জানা গেলে উদ্যোক্তা সময় থাকতে ব্যবস্থা নিতে পারেন—পাওনা দ্রুত আদায় করা, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, সরবরাহকারীর সঙ্গে পরিশোধের সময় নিয়ে আলোচনা করা কিংবা প্রয়োজন হলে স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন বিবেচনা করা। সমস্যা তৈরি হওয়ার পর টাকা খোঁজার চেয়ে সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই ঘাটতি জানা অনেক নিরাপদ।


তিনটি অভ্যাস ব্যবসাকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করতে পারে


১. পাওনা টাকার হিসাব রাখুন


কার কাছে কত টাকা পাওনা, কবে পাওয়ার কথা—এটি লিখে রাখুন। শুধু মোট পাওনা জানলেই হবে না; কোন টাকা কখন আসার কথা সেটিও জানতে হবে।


২. আগামী মাসের খরচ আগে দেখুন


মাস শেষ হওয়ার পর হিসাব করার বদলে আগেই দেখুন—পরের মাসে বেতন, ভাড়া, পণ্য কেনা ও অন্যান্য খরচের জন্য কত টাকা লাগবে।


৩. ব্যবসার টাকা আলাদা রাখুন


ব্যবসার টাকা দিয়ে ব্যক্তিগত খরচ করা এবং ব্যক্তিগত টাকা দিয়ে নিয়মিত ব্যবসার ঘাটতি পূরণ করা হলে ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা বোঝা কঠিন হয়ে যায়।


সবচেয়ে বড় ভুল: শুধু বিক্রির দিকে তাকানো


বিক্রি বাড়ছে—এটি অবশ্যই ভালো খবর। কিন্তু বিক্রির সঙ্গে যদি পাওনা টাকাও দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে ব্যবসার নগদ সংকট তৈরি হতে পারে।


একইভাবে বেশি পণ্য মজুত থাকলেও ব্যবসার বড় অংশের টাকা পণ্যের মধ্যে আটকে যেতে পারে।


তাই উদ্যোক্তার প্রতিমাসে অন্তত একবার দেখা উচিত—


কত বিক্রি করেছি?


কত টাকা পেয়েছি?


কত টাকা পাওনা?


কত টাকা পণ্যে আটকে আছে?


আগামী মাসে কত টাকা দিতে হবে?


এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর ব্যবসার আর্থিক অবস্থার একটি পরিষ্কার ছবি দিতে পারে।


আজ থেকেই একটি ছোট কাজ করুন


আজ আপনার ব্যবসার জন্য একটি কাগজ নিন। সেখানে শুধু দুইটি কলাম করুন—


আগামী ৩০ দিনে কত টাকা আসবে


আগামী ৩০ দিনে কত টাকা দিতে হবে


এরপর পাওনা, বিক্রির সম্ভাব্য টাকা, বেতন, ভাড়া, পণ্য কেনা, ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য খরচ লিখুন।


হিসাব শেষে যদি দেখেন টাকা আসার আগেই বেশি টাকা দিতে হবে, তাহলে সমস্যাটি এখনো বড় হয়নি—কারণ আপনি সেটি আগেই দেখতে পেয়েছেন।


আগামী পর্ব: ব্যবসায় টাকা আসছে। কিন্তু আপনার পণ্যের দাম কী ঠিক আছে?


অনেক উদ্যোক্তা বিক্রি বাড়ালেও কাঙ্ক্ষিত লাভ করতে পারেন না। কারণ পণ্যের দাম নির্ধারণের সময় সব খরচ হিসাবের মধ্যে থাকে না।


আগামী পর্বে: “ব্যবসার পণ্যের দাম কীভাবে ঠিক করবেন? লাভ হচ্ছে কি না বুঝবেন যেভাবে।”


লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক

রোদসী

sidebar ad