হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ওমানের সঙ্গে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে ইরান। তবে শুধু তেহরান-মাসকাটের চুক্তি হলেই গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ খুলে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে ইরান। প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণসহ আরও কয়েকটি শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে তেহরান।
শনিবার (৮ আগস্ট) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি
রুট নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘খুব কাছাকাছি’ পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি
আরও কিছু শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে
ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলকদর আরও
কয়েকটি শর্তের কথা জানিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের
হুমকি বন্ধ করা, ইরান ও লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করা, ইরানের ওপর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং
ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা।
এর আগে শুক্রবার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে
শিগগিরই একটি সমঝোতা হতে পারে। ওই সমঝোতা হলে প্রণালিটি দিয়ে স্বাভাবিক তেল পরিবহন
পুনরায় চালু হওয়ার পথ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছিল।
তবে ইরানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে,
শুধু
ইরান-ওমানের সমঝোতা দিয়ে হরমুজ প্রণালি খুলবে না। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি
গার্ড কর্পসও জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ইরানের
শর্ত মেনে নিলেই প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। বাহিনীটির মুখপাত্র হোসেইন
মোহেব্বি বলেন, প্রণালি খোলার
বিষয়টি ইরান-ওমান আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
এদিকে ওমান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। দেশটির
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রণালি দিয়ে
জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে
আলোচনার অগ্রগতি যাতে কোনো কর্মকাণ্ডের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছে মাসকাট।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি জানান,
হরমুজ
প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের আগের ব্যবস্থা তেহরানের কাছে আর গ্রহণযোগ্য নয়। স্থায়ী
নতুন রুটের কারিগরি ও আইনি বিষয় চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ওমানের সঙ্গে একটি
অস্থায়ী রুট নিয়েও আলোচনা চলছে।
এদিকে শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল
কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে কেউ
আহত হয়নি। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে একটি জাহাজে
আগুন ধরে গেলেও পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ
প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। চলমান সংঘাতের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল
ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং বিভিন্ন দেশে
মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বর্তমান অবরোধ শুরুর পর মানবিক সহায়তা নিয়ে ৩০টির বেশি
জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ৫৩টি জাহাজকে
ফিরিয়ে দেওয়া, দুটি জাহাজ অচল
করে দেওয়া এবং আরও দুটি জাহাজে তল্লাশি চালানোর কথা জানিয়েছে তারা।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, দেশটির জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি রয়েছে এবং যুদ্ধের
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছে। তিনি
আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের
কর্মকাণ্ডের কারণে ইরানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা
কাছাকাছি বলে ইঙ্গিত দিয়ে আসছে। তবে তেহরান একাধিকবার আলোচনার খবর অস্বীকার করেছে।
সর্বশেষ ইরান-ওমান আলোচনা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতায় রূপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।