আয় আছে, তবু স্বাধীন নন? বাংলাদেশের নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার অদৃশ্য বাধাগুলো

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬

সাবিনা ইয়াসমীনের কলাম
সাবিনা ইয়াসমীনের কলাম

স্বাধীনতা কী শুধু উপার্জনের নাম?  ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন নারী মাসে ৬০ হাজার টাকা বেতন পান। কিন্তু পরিবারের বড় কোনো কেনাকাটা, সন্তানকে কোথায় পড়ানো হবে, কিংবা নিজের বাবা-মায়ের চিকিৎসায় কত টাকা খরচ করবেন—এসব সিদ্ধান্ত তিনি একা নিতে পারেন না। আবার গ্রামের একজন নারী সারা দিন কৃষিকাজে স্বামীকে সহায়তা করেন। তিনি পরিবারের আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, কিন্তু সেই আয় তার নামে নয়। জমির মালিকানা নেই, ব্যাংক হিসাব নেই, আর নিজের শ্রমেরও আলাদা মূল্য নেই।


দুই নারীর জীবন আলাদা, কিন্তু প্রশ্নটি একই—অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া কি শুধু আয় করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?  উত্তর হলো, না।


অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা মানে শুধু টাকা উপার্জন নয়; বরং সেই আয়ের ওপর নিজের অধিকার, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা।


বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি: অর্জনও আছে, অসম্পূর্ণতাও


গত দুই দশকে বাংলাদেশে নারীর শিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে। পোশাকশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান।


তবুও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এখনও পুরুষের তুলনায় অনেক কম। অনেক নারী উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন না। আবার যারা কাজ করেন, তাদের অনেকেই অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে আয় অনিয়মিত, সামাজিক সুরক্ষা সীমিত এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।


এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংখ্যা বাড়লেই সমতা আসে না।



পাঁচটি অদৃশ্য বাধা


১. সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা


একজন নারী আয় করলেও সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, কোথায় বিনিয়োগ হবে বা কীভাবে সঞ্চয় হবে—এসব বিষয়ে তার মতামত সব সময় সমান গুরুত্ব পায় না। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মূল শর্তই হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।



২. সম্পদের মালিকানায় বৈষম্য


জমি, বাড়ি, ব্যবসা বা অন্যান্য সম্পদের মালিকানায় নারীর অংশ এখনও সীমিত। যার নামে সম্পদ নেই, তার আর্থিক নিরাপত্তাও তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে। সংকটের সময় এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।



৩. অবৈতনিক শ্রমের অদৃশ্য মূল্য


রান্না, সন্তান লালন-পালন, পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের যত্ন—এসব কাজ অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় না। ফলে বহু নারী সারাদিন কাজ করেও “অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়” হিসেবে বিবেচিত হন।



৪. আর্থিক জ্ঞানের ঘাটতি


সঞ্চয়, বিনিয়োগ, বীমা, কর, ঋণ ব্যবস্থাপনা বা ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহার—এসব বিষয়ে অনেক নারী পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা সুযোগ পান না। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি অর্থ ব্যবস্থাপনার জ্ঞানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।



৫. সামাজিক প্রত্যাশা


অনেক পরিবারে এখনও ধারণা রয়েছে যে নারীর উপার্জন অতিরিক্ত সুবিধা, কিন্তু পরিবারের প্রধান অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত পুরুষই নেবেন। এই মানসিকতা বদল না হলে প্রকৃত সমতা অর্জন কঠিন।



অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কোনো ব্যক্তিগত বিলাসিতা নয়; এটি একটি পরিবারকে শক্তিশালী করে, একটি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলে। রোদসীর বিশ্বাস, নারীর ক্ষমতায়ন শুরু হয় তার কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া থেকে, আর পূর্ণতা পায় যখন সেই কণ্ঠ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তেও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।


সাবিনা ইয়াসমীন

সম্পাদক ও প্রকাশক

রোদসী


sidebar ad