সফল নারীকে আমরা কতটা সহজে গ্রহণ করতে পারি?

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬

সাবিনা ইয়াসমীনের কলাম
সাবিনা ইয়াসমীনের কলাম

একজন নারী যখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান, আমরা তাকে উৎসাহ দিই। তিনি যখন ছোট একটি ব্যবসা শুরু করেন, বলি—“খুব ভালো করছেন।” যখন তিনি প্রথম আয় করেন, তার পরিবার আনন্দিত হয়। যখন তিনি কোনো পুরস্কার পান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি দিয়ে অভিনন্দন জানাই।


কিন্তু সেই নারী যখন সত্যিই সফল হয়ে ওঠেন?


যখন তার নিজের অর্থ আছে, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে, নিজের পরিচয় আছে, নিজের সময়ের ওপর অধিকার আছে—তখন কী আমাদের আচরণ একই থাকে? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।


কারণ নারীর সাফল্য নিয়ে আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত দ্বৈততা আছে। আমরা নারীকে সফল দেখতে চাই, কিন্তু সেই সাফল্য যেন আমাদের পরিচিত সামাজিক সীমারেখা অতিক্রম না করে—এমন একটি অদৃশ্য প্রত্যাশাও অনেক সময় কাজ করে।


একজন নারী যদি সফল হন, তাকে প্রায়ই বলা হয়—তিনি “সংসার সামলে” সফল হয়েছেন। কথাটি শুনতে প্রশংসার মতো। কিন্তু এর মধ্যে একটি প্রশ্নও লুকিয়ে থাকে—তার সাফল্যের মূল্যায়ন কি শুধু তিনি সংসারটিও ঠিকঠাক সামলাতে পেরেছেন কি না, তার ওপর নির্ভর করবে?


একজন সফল পুরুষকে আমরা জিজ্ঞেস করি, তিনি কীভাবে ব্যবসা বড় করলেন, কীভাবে নেতৃত্বে এলেন, কীভাবে সম্পদ তৈরি করলেন, কীভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন। একজন সফল নারীকে অনেক সময় জিজ্ঞেস করি—“সংসারটা কে সামলায়?”, “সন্তানদের সময় দিতে পারেন?”, “স্বামী কি সহযোগিতা করেন?”, “এত ব্যস্ত থাকেন কীভাবে?”, “এত কিছু করার দরকার কী?”


প্রশ্নগুলো নিজের মধ্যে অন্যায় নয়। কিন্তু যখন একজন পুরুষের সাফল্যকে তার সক্ষমতার ফল হিসেবে দেখা হয়, আর একজন নারীর সাফল্যকে বারবার তার পারিবারিক দায়িত্বের সঙ্গে মেপে দেখা হয়, তখন সেখানে একটি বৈষম্য তৈরি হয়। আমাদের ভাবতে হবে—একজন নারী কি শুধু একজন মা, স্ত্রী, কন্যা কিংবা বোন? নাকি তিনি একই সঙ্গে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার নিজের স্বপ্ন, মেধা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পছন্দ, অপছন্দ এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে?


সফল নারীকে নিয়ে আমাদের অস্বস্তি কোথায়?


সমস্যাটা সবসময় সরাসরি বিরোধিতায় দেখা যায় না। কখনো সেটা আসে একটি মন্তব্যে।


“ও তো অনেক ভাগ্যবান, স্বামী খুব ভালো।”


“বাবার টাকা ছিল বলেই পেরেছে।”


“ওর তো অনেক পরিচিতি আছে।”


“নারী হয়ে এত বড় ব্যবসা করছে—নিশ্চয়ই পেছনে কেউ আছে।”


কখনো আসে সন্দেহে। কখনো ঈর্ষায়। কখনো আবার করুণার মোড়কে।


একজন পুরুষ যখন কঠোর পরিশ্রম করে বড় হন, আমরা তার পরিশ্রমের গল্প শুনি। একজন নারী একইভাবে বড় হলে তার সাফল্যের পেছনে কার প্রভাব, কার সহযোগিতা, কার অর্থ, কার পরিচয়—সেটা খুঁজতে শুরু করি।


অবশ্যই একজন মানুষের সাফল্যের পেছনে পরিবার, সহকর্মী, সহযোগী বা সুযোগের ভূমিকা থাকতে পারে। পুরুষের ক্ষেত্রেও থাকে, নারীর ক্ষেত্রেও থাকে।


কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন নারীর সাফল্যকে এত সহজে তার নিজের সক্ষমতা হিসেবে গ্রহণ করতে আমাদের দ্বিধা হয়? এখানেই আমাদের সামাজিক মানসিকতার একটি গভীর জায়গা রয়েছে। নারী সফল হলে পরিবারের ধারণাটাও বদলাতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে পরিবারে নারীর ভূমিকা নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধারণায় অভ্যস্ত। নারী সংসার দেখবেন। পুরুষ উপার্জন করবেন। নারী সন্তান বড় করবেন। পুরুষ বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে লড়বেন। সমাজ বদলেছে। অর্থনীতি বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। কর্মক্ষেত্র বদলেছে। নারীর শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন সেই গতিতে হয়নি।


আজ একজন নারী একই সঙ্গে উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, মা, স্ত্রী এবং পরিবারের আর্থিক অবদানকারী হতে পারেন। কিন্তু তার দায়িত্বের তালিকা অনেক সময় কমে না। বরং বাড়ে। তিনি অফিস থেকে ফিরে সন্তানকে পড়াবেন। ব্যবসার হিসাব শেষ করে পরিবারের খাবারের চিন্তা করবেন। গুরুত্বপূর্ণ সভার মাঝেও হয়তো সন্তানের স্কুলের ফোন ধরবেন। নিজের কাজের পাশাপাশি পরিবারের অসুস্থ সদস্যের দায়িত্ব নেবেন।


অথচ পুরুষের ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতিকে আমরা অনেক সময় বলি—“তিনি খুব ব্যস্ত।” নারীর ক্ষেত্রে বলি—“সবকিছু কীভাবে সামলান?” এই পার্থক্যটিই বদলানো দরকার। পরিবার কোনো নারীর একার দায়িত্ব নয়। সংসার একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান। সন্তানও যৌথ দায়িত্ব। পরিবারের প্রবীণ সদস্যের যত্নও যৌথ দায়িত্ব।  নারী বাইরে কাজ করছেন বলে তিনি সংসারের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন না। বরং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার সময় এসেছে।


নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? নারীর আয়কে শুধু পরিবারের অতিরিক্ত আয় হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।


একজন নারীর নিজের আয় মানে শুধু তার হাতে কিছু টাকা থাকা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। নিজের প্রয়োজনের জন্য কারও কাছে হাত পাততে না হওয়া। নিজের সন্তানকে নিজের সিদ্ধান্তে কিছু দিতে পারা। প্রয়োজনে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারা। অসুস্থতা, বিপদ বা অনিশ্চয়তার সময়ে নিজের একটি নিরাপত্তা তৈরি করা।


এমনকি নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিজের মতামতের মূল্য বাড়ানো। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাই শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এটি আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ক্ষমতায়নের সঙ্গেও যুক্ত। তবে এখানেও একটি ভুল ধারণা আছে। নারী উপার্জন শুরু করলেই তার ক্ষমতায়ন সম্পূর্ণ হয়ে যায় না।


যদি তিনি নিজের উপার্জনের ওপর সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, যদি তার ব্যবসার সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নেয়, যদি তার সম্পদ ব্যবহারের স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে শুধু আয় করাই যথেষ্ট নয়।


নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অর্থ হলো—আয়, সম্পদ, সিদ্ধান্ত এবং সুযোগের ওপর তার অর্থবহ নিয়ন্ত্রণ থাকা।


একজন নারী আরেকজন নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী নন


নারীর অগ্রগতির আরেকটি বড় বাধা কখনো কখনো আসে নারীদের মধ্য থেকেই।


আমরা হয়তো নিজের অজান্তেই অন্য নারীর সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করি।


কে বেশি সুন্দর? কে বেশি সফল? কার সন্তান ভালো করছে? কার ব্যবসা বড়? কার পোশাক ভালো? কার জীবন বেশি সুখের? এই তুলনা আমাদের কাউকেই এগিয়ে নেয় না। বরং একজন নারী অন্য একজন নারীর জন্য যে সুযোগ তৈরি করতে পারেন, সেটিই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


একজন অভিজ্ঞ নারী একজন নতুন উদ্যোক্তাকে একজন সঠিক মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। একজন সফল ব্যবসায়ী আরেকজন নারীকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে পারেন। একজন প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী একজন তরুণীকে পরামর্শ দিতে পারেন।


একজন নারী যদি নিজের অভিজ্ঞতা অন্য একজনের সঙ্গে ভাগ করেন, তাহলে হয়তো সেই দ্বিতীয় নারীকে একই ভুল করতে হবে না। একজনের সাফল্য তখন শুধু একজনের থাকে না। তা হয়ে যায় আরও অনেক নারীর সম্ভাবনার দরজা।


আমাদের ব্যবসায়ী সমাজেরও দায়িত্ব আছে


নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা বললে শুধু পরিবার বা ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা করলে হবে না। ব্যবসার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।


নারী উদ্যোক্তা ঋণ পেতে পারছেন কি না, বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন কি না, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে জায়গা পাচ্ছেন কি না, বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।


অনেক নারী ছোট ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু একটি পর্যায়ের পর ব্যবসা আর বড় করতে পারেন না।


কারণ শুধু টাকা নয়—তাদের দরকার বাজার, যোগাযোগ, পরামর্শ, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক।


এখানে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।


একজন বড় ব্যবসায়ী যদি একজন নতুন নারী উদ্যোক্তাকে একজন ক্রেতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, সেটিও সহযোগিতা। কেউ যদি তার অভিজ্ঞতা ভাগ করে দেন, সেটিও সহযোগিতা। কেউ যদি একটি সুযোগের খবর দেন, সেটিও সহযোগিতা।


আমাদের ব্যবসায়ী সমাজ যদি প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন দরজা খুলবে।


মেয়েদের আমরা কী শেখাচ্ছি?


শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি পরিবারেই ফিরে আসে।


আমরা আমাদের মেয়েদের কী শেখাচ্ছি?


শুধু ভালো মেয়ে হতে? শুধু ভালো স্ত্রী হতে? শুধু ভালো মা হতে? নাকি একজন ভালো মানুষ হতে?


আমাদের মেয়েদের রান্না শেখানো দরকার। ঘর সামলানো শেখানো দরকার। পরিবারকে ভালোবাসতে শেখানো দরকার।


কিন্তু এর পাশাপাশি তাদের অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখাতে হবে। নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে। প্রযুক্তি জানতে হবে। কথা বলতে শিখতে হবে। না বলতে শিখতে হবে। ব্যর্থ হতে শিখতে হবে। আবার উঠে দাঁড়াতে শিখতে হবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিজের স্বপ্নকে অপরাধ মনে না করতে শেখাতে হবে।


একজন মেয়ে যদি ব্যবসা করতে চায়, তাকে শুধু বলতে হবে না—“সংসার সামলাতে পারবে তো?”


বরং বলতে হবে— “তোমার পরিকল্পনাটা কী? আমরা কীভাবে তোমাকে সহযোগিতা করতে পারি?”


সফল নারীকে স্বাভাবিক করে তুলতে হবে


আমরা নারী দিবসে নারীর সাফল্য উদ্‌যাপন করি। পুরস্কার দিই। ফুল দিই। ছবি তুলি। অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দিই।


কিন্তু আসল পরিবর্তন হবে তখন, যখন একজন সফল নারীকে দেখে আমাদের আর অবাক হতে হবে না।


যখন একজন নারী বড় ব্যবসার মালিক হলে আমরা তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগে প্রশ্ন করব না।


যখন একজন নারী নেতৃত্বে এলে তার যোগ্যতা নিয়ে অকারণ সন্দেহ করব না।


যখন একজন নারী বেশি আয় করলে তার স্বামীকে নিয়ে কৌতুক করব না।


যখন একজন নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিলে তাকে “অতিরিক্ত স্বাধীন” বলে চিহ্নিত করব না।


যখন একজন নারী ব্যর্থ হলে বলব না—“দেখেছ, মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা হয় না।”


বরং বলব— ব্যর্থতা ব্যবসার অংশ। আবার শুরু করুন।


আমাদের সমাজে নারীকে সফল হতে উৎসাহ দেওয়া যথেষ্ট নয়। নারীর সাফল্যকে স্বাভাবিক করে তুলতে হবে।


কারণ একজন নারী যখন নিজের পায়ে দাঁড়ান, তখন শুধু তার জীবন বদলায় না। তার সন্তান একটি নতুন উদাহরণ দেখে। তার পরিবার একটি নতুন সম্ভাবনা দেখে। তার আশপাশের আরও কয়েকজন নারী সাহস পান।


আর একজন নারী যখন অন্য নারীর হাত ধরে সামনে নিয়ে আসেন, তখন পরিবর্তন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।


তাই আজ আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা দরকার—


আমরা কি সত্যিই সফল নারী চাই, নাকি শুধু এমন নারী চাই, যে সফল হলেও আমাদের পুরোনো প্রত্যাশাগুলোর সীমারেখার ভেতরেই থাকবে?


যদি আমরা সত্যিই পরিবর্তন চাই, তাহলে উত্তরটি স্পষ্ট হতে হবে।


একজন নারী সফল হলে তাকে বিচার নয়, স্বীকৃতি দিতে হবে।


তার পথ নিয়ে সন্দেহ নয়, তার অভিজ্ঞতা জানতে হবে।


তার সাফল্যকে ব্যতিক্রম নয়, স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখতে হবে।


কারণ যে সমাজ নারীর সাফল্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখে, সেই সমাজ শুধু নারীকেই এগিয়ে নেয় না—নিজেকেও এগিয়ে নেয়।


রোদসী মনে করে, নারীর ক্ষমতায়ন শুরু হয় তখনই, যখন একজন নারীকে তার সম্ভাবনা প্রমাণ করার আগে মানুষ হিসেবে তার সক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয়।


ঢাকা/আরএস

sidebar ad