মুচমুচে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন উইংস কিংবা যেকোন ভাজাভুজি-বিকেলের নাস্তায় হোক কিংবা অবসর সময়ে নেয়া স্ন্যাকস; এসবের নাম শুনলে জিভে জল চলে আসে। কিন্তু সঙ্গে আসে এক চিরচেনা ভয় এতো তেল কি শরীরের জন্য ভালো? আর এই অপরাধবোধের মাঝে দূত হয়ে এসেছে এয়ার ফ্রায়ার। মূলমন্ত্র একটাই- কম তেলে মুচমুচে খাবারের স্বাদ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা কি সত্যিই রান্নাঘরের নায়ক নাকি শুধুই মার্কেটিং ম্যাজিক?
বাঙ্গালি বরাবরই ভোজনরসিক। খাবারের বেলায় ষোলকলা পূর্ণ না হলে যেন হয়ই না। তবে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠেছে অনেকেই। এতে লাইফ স্টাইল পরিবর্তনের সাথে সাথে খাবার- দাবারের মধ্যে এসেছেও অনেক পরিবর্তন। আর এরই ধারাবাহিকতায় এয়ার ফ্রায়ার রান্নাঘরের একটি জনপ্রিয় সংযোজন হিসেবে বিগত বছর ধরে বাজারে প্রচলিত হয়ে আসছে। এয়ার ফ্রায়ার হলো তেল ছাড়াই ভাজাভাজি করা যায় এমন একটি যন্ত্র। এটি আমাদেরকে এমন ক্রিসপি খাবার তৈরি করতে দেয় যেগুলোর স্বাদ ডিপ ফ্রাই সংস্করণের মতোই, তবে অবশ্যই অতিরিক্ত তেল ছাড়াই। এটি মূলত একটি ডিপ ফ্রায়ার এবং একটি কনভেকশন ওভেনের হাইব্রিড প্রজাতির। এতে একটি ফ্রাই বাস্কেট থাকে যেখানে খাবার রাখা হয় এবং তা গরম তেলে রাখার পরিবর্তে, পরিচলন তাপ দ্বারা চারপাশে উচ্চ গতিতে গরম বাতাস সঞ্চালিত হয়ে রান্না হয়। এর জন্য নূন্যতম তেল লাগেনা কিন্তু চিকেন এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী ভাজা খাবারের মতো একই কুড়কুড়ে টেক্সচার সরবরাহ করে। এখন কথা হচ্ছে এটা কতটা স্বাস্থ্যকর? বা এর হেলথ বেনেফিট কি? আসুন আমরা দেখে নিই-
তেলের উপস্থিতি কম
এর এক নম্বর এবং উল্লেখযোগ্য সুবিধাই হলো এটা ডিপ ফ্রাই বা শ্যালো ফ্রাইংয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম তেল ব্যবহার করে। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে এয়ার ফ্রায়ারে রান্না করা চর্বির শোষণের মাত্রা যথেষ্ট কম ছিলো। উপরন্তু, বেশিরভাগ ডিপ ফ্রাই রেসিপিগুলোতে প্রায় ৭৫০ মিলি তেলের প্রয়োজন হয়, যেখানে এয়ার ফ্রাইয়ে ভাজা খাবারের জন্য সাধারণত ১৫ মিলি প্রয়োজন হয়।
ওজন ব্যবস্থাপনা সাহায্য করতে পারে
ডিপ ফ্রাই খাবারে চর্বি এবং ক্যালোরি উভয়ই বেশি থাকে, যা ওজন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য অসুস্থতায় অবদান রাখে। যেহেতু এয়ার ফ্রায়ারগুলো সামান্য বা বিনা তেল ব্যবহার করে, তাই এগুলো ক্যালোরি গ্রহণের পরিমান ৮০% পর্যন্ত কমাতে পারে; যা এটিকে অনেক স্বাস্থ্যকর বিকল্প করে তোলে।
অ্যাক্রিলামাইডের মাত্রা কম থাকে
অ্যাক্রিলামাইড একটি পরিচিত কার্সিনোজেন যা স্টার্চি খাবার, যেমন আলুর মত, উচ্চ তাপমাত্রায় (২৪৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপর) রান্না করা হলে তৈরি হয়। গবেষণার মাধ্যমে কিছু প্রমান পাওয়া গেছে যে, একটি এয়ার ফ্রায়ার ব্যবহার করলে এই অ্যাক্রিলামাইড যৌগ ৯০% পর্যন্ত কমে যায়। এই ক্ষেত্রে, স্তর কমানো সর্বদা একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প।
পুষ্টি সংরক্ষণ করতে পারে
যেহেতু এটি পরিচলন তাপ থেকে কাজ করে, তাই এটি রান্না বা গরম করার সময় প্রায়ই হারিয়ে যাওয়া কিছু পুষ্টি উপাদান সংরক্ষণ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন সি এবং সেই সাথে পলিফেনল নামক অসংখ্য প্রতিরক্ষামূলক উদ্ভিদ যৌগ, যা আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার জন্য উপকারী।
নিরাপদ নিশ্চয়তা প্রদান
নরমাল ভাজাভাজির সাথে বড় গভীর প্যান এবং উচ্চ তাপমাত্রা তেল গরম করা জড়িত। এটি রান্নাঘরে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে কারণ গরম তেল ছড়িয়ে পড়তে পারে বা আগুন ধরতে পারে। এয়ার ফ্রায়ার্স নির্দেশাবলী অনুযায়ী ব্যবহার করা হলে, একই নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করেনা।
এয়ার ফ্রায়ার কি সবার জন্য নিরাপদ?
সামগ্রিকভাবে, এটি ডিপ ফ্রাইয়ের একটি ভালো বিকল্প বলা চলে। তবে এয়ার ফ্রায়ারের রান্না করা খাবারকে এখনও ভাজা খাবার হিসেবে শ্রেনীবদ্ধ করা হয়। আমরা সবাই জানি ভাজা খাবার ওজন বৃদ্ধি, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং কিছু ক্যান্সারের জন্য দায়ী।
এয়ার ফ্রায়ারে সার্ডিনের মতো চর্বিজাতীয় মাছ রান্না করলে স্বাস্থ্যকর চর্বি উপাদান কমে যায় এবং কিছুটা বেড়ে যায় কোলেস্টেরল অক্সিডেশন পণ্য,যা নেতিবাচকভাবে কোলেস্টেরল মাত্রা প্রভাবিত করতে পারে।
এছাড়াও, আপনি যদি প্যাকেটজাত ফ্রোজেন খাবার যেমন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, নাগেটস বা প্রসেসড ফুড এয়ার ফ্রায়ারে ভাজেন, তবে তেল কম লাগলেও তার ভেতর থাকা সোডিয়াম ও প্রিজারভেটিভ কিন্তু কমছেনা। অর্থাৎ অস্বাস্থ্যকর খাবার এয়ার ফ্রায়ারে দিলেই তা পুষ্টিকর হয়ে যাবেনা। তাই কম তেল মানেই যত খুশি খাওয়া যাবে- এমন ভাবার সুযোগ নেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো, এয়ার ফ্রায়ারে রান্নার সময় কিছু খাবারে উচ্চ তাপে বিশেষ ধরনের যৌগ তৈরি হতে পারে, যা অতিরিক্ত গ্রহণ স্বাস্থ্যকর নয়। তাই সঠিক তাপমাত্রা ও রান্নার সময় জানা জরুরী।
তাহলে এয়ার ফ্রায়ার কি আসলেই স্বাস্থ্যকর? তা নির্ভর করছে এটি কত ঘন ঘন ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এতে কি রান্না করা হচ্ছে তার উপর। এর জন্য সবচেয়ে ভালো হয় একে প্রতিদিনের পরিবর্তে মাঝে মাঝে রান্নার পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করলে। এটি সুস্থ ডায়েটের একটি অংশ মাত্র, পুরো ডায়েট নয়।
লেখাঃশায়লা জাহান