এক তরফা ভালোবাসা হলো এমন এক অনুভূতি, যেখানে একজন মানুষ গভীরভাবে ভালোবাসে, যত্ন নেয়,অপেক্ষা করে কিন্তু অন্যজন সেই একই অনুভূতি ফিরিয়ে দেয় না, বা সমানভাবে অনুভব করে না।এখানে সম্পর্ক থাকতে পারে,আবার নাও থাকতে পারে।কখনও কথা হয়, যোগাযোগ থাকে,কিন্তু ভালোবাসার ভারটা একাই বহন করতে হয় একজনকে।
এক তরফা ভালোবাসার কিছু লক্ষণ:
*সবসময় আপনিই আগে খোঁজ নেন।
*অপেক্ষা আর চেষ্টা শুধু আপনার দিক থেকেই হয়
আপনার অনুভূতির গুরুত্ব কমে যায়।
*সম্পর্কটা টিকে থাকে অভ্যাসে,ভালোবাসায় নয়।
*আপনি কষ্ট পেলেও অন্যজন ততটা অনুভব করে না।
*এক তরফা ভালোবাসা খুব গভীর হতে পারে,কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে এটা মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দেয়।
কারণ,
ভালোবাসা সুন্দর তখনই, যখন সেখানে দুজনের সম্মান আর চেষ্টার ভারসাম্য থাকে।
এক তরফা ভালোবাসার লক্ষণগুলো অনেক সময় ধীরে ধীরে বোঝা যায়। শুরুতে মনে হতে পারে সব ঠিক আছে,কিন্তু সময়ের সাথে কিছু বিষয় বারবার চোখে পড়ে,আপনি সবসময় আগে যোগাযোগ করেন,খোঁজ নেন।
সে আপনার জন্য সময় বের করতে চায় না,কিন্তু আপনি অপেক্ষা করেন
আপনার কষ্ট,অভিমান বা অনুভূতির গুরুত্ব কম পায়
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা শুধু আপনার দিক থেকেই হয়।সে প্রয়োজন হলে আসে,প্রয়োজন শেষ হলে দূরে সরে যায়।আপনি না লিখলে বা খোঁজ না নিলে অনেকদিন যোগাযোগই হয় না।তার কথায়,আচরণে বা সিদ্ধান্তে আপনাকে অগ্রাধিকার মনে হয় না
আপনি বারবার নিজেকে প্রমাণ করতে চান,তবুও আশ্বাস পান না।সম্পর্কের মাঝে থেকেও নিজেকে একা লাগে।ভালোবাসার চেয়ে অনিশ্চয়তা আর মানসিক ক্লান্তি বেশি অনুভব হয়।সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো,আপনি সম্পর্কের ভেতরে থেকেও বারবার ভাবতে থাকেন,
“সে কি সত্যিই আমাকে চায়, নাকি আমি শুধু ধরে আছি?”
দেবদাস-এর গল্প মনে আছে তো?পুরোপুরি এক তরফা ভালোবাসা ছিল না। দেবদাস আর পার্বতী দুজনেই একে অপরকে ভালোবাসত।কিন্তু তাদের ভালোবাসায় ছিল দ্বিধা, অহংকার,সামাজিক বাধা আর সময়মতো সাহস করে পাশে দাঁড়াতে না পারা।
দেবদাস ভালোবাসত,কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পেত। পরিবার,সমাজ আর নিজের দুর্বলতার কাছে সে বারবার হার মেনেছে। অন্যদিকে পার্বতী ভালোবাসলেও বারবার অসম্মানিত বা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে চায়নি।এক অর্থে,পার্বতীই ছেড়ে আসার সাহস দেখিয়েছিল।সে বুঝেছিল,শুধু ভালোবাসলেই হয় না,সেই ভালোবাসার দায়িত্ব নেওয়ার সাহসও দরকার। দেবদাস যখন দৃঢ়ভাবে তাকে নিজের জীবনে জায়গা দিতে পারল না, তখন পার্বতী নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল।তবে সে ভালোবাসা ভুলে যায়নি, শুধু নিজেকে ভেঙে যেতে দেয়নি।
একটা গল্প বলি,
জাহিদ আর চাঁদনীর সম্পর্কটা বাইরে থেকে ঠিকই ছিল,কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেক আগেই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।
চাঁদনী প্রতিদিন একটু আশ্বাস খুঁজত,একটু পাশে থাকা,একটু গুরুত্ব।কিন্তু জাহিদ যেন সবসময় দূরেই থেকেছে।প্রয়োজন ছাড়া খোঁজ নেয়া হয়নি,সম্পর্ক নিয়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্তও নেয়নি কখনও। ভালোবাসা ছিল হয়তো, কিন্তু সেই ভালোবাসার পাশে সাহস ছিল না।
অহংকার,সামাজিক বাধা আর"সময় হলে সব ঠিক হবে"এই ভরসাতেই জাহিদ দিন পার করেছে।আর চাঁদনী ধীরে ধীরে বুঝে গেছে,যে সম্পর্কে বারবার নিজেকেই ছোট হতে হয়, সেখানে ভালোবাসা থাকলেও শান্তি থাকে না।
একদিন চাঁদনী আর অপেক্ষা করেনি।কোনো অভিযোগ নয়,কোনো নাটক নয়,শুধু নীরবে সরে গিয়েছিল।কারণ সে বুঝেছিল,অনিশ্চয়তা আর অসম্মানের ভেতরে থেকে কাউকে ভালোবাসা মানে নিজেকেই হারিয়ে ফেলা।
জাহিদ তখনও চুপ ছিল।
আর সেই চুপ থাকাটাই শেষ পর্যন্ত তাদের গল্পের সমাপ্তি লিখে দিল।
চাঁদনী চলে যাওয়ার পর জাহিদ বুঝেছিল,
ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়,সময়মতো পাশে দাঁড়ানোর সাহসও।
শেষ কথা (উপদেশমূলক):
একতরফা ভালোবাসা যত গভীরই হোক,সেটা যদি শুধু কষ্ট,অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তা দেয়,তাহলে সেখান থেকে সরে আসাই সবচেয়ে বড় সাহস।কারণ ভালোবাসা তখনই সুন্দর, যখন দুজনেই দায়িত্ব নেয়, সম্মান দেয় আর পাশে থাকে।যে সম্পর্ক তোমাকে বারবার ছোট করে, অবহেলা শেখায়,আর নিজের মূল্য ভুলিয়ে দেয়,সেটা ধরে রাখা ভালোবাসা নয়,সেটা নিজের ক্ষতি।কখনও কখনও ছেড়ে আসা মানে হারানো না,বরং নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়া।
লেখাঃ ইশরাত জাহান ইনা