বয়স বাড়ে,বদলায় ভালবাসার ভাষা, থাকে শুধু নীরবতা

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬

বয়স বাড়ে,বদলায় ভালবাসার ভাষা, থাকে শুধু নীরবতা

ছোটবেলায় ভালোবাসা ছিল সহজ,একটা হাসি, একটু সময়,আর পাশে থাকার নিশ্চয়তা।বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই সহজ অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে জটিল হয়ে যায়। আবেগ আর আগের মতো হুটহাট প্রকাশ পায় না,বরং ভেতরে জমে থাকে নীরবতার মতো।কখনো দায়িত্বের চাপে,কখনো অভিজ্ঞতার শিক্ষা থেকে মানুষ শিখে যায় অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখতে।


তবুও বদলায় শুধু প্রকাশের ধরন,ভালোবাসা কমে না,শুধু রূপ বদলায়। একসময় যে আবেগ ছিল শব্দে ভরা,বয়সের সাথে তা হয়ে যায় নীরব যত্নে,দূর থেকে খোঁজ নেওয়ায়,আর না বলা কিছু অনুভূতিতে।


অনিমা আর জয়ের ভালবাসার গল্প:

অনিমা আর জয় ২৫ বছর বয়সে যখন তাদের গল্পটা এগোতে শুরু করল,তখন ভালোবাসাটা ছিল খুব তাজা,খুব আবেগে ভরা।


২৫–এ তারা ছিল প্রেমে

অনিমা তখন চাকরির প্রস্তুতিতে,জয় ক্যারিয়ার গড়ার লড়াইয়ে।তবুও রাতে লম্বা মেসেজ,ছোট ছোট অভিমান,আর দেখা করার অজুহাত।সব মিলিয়ে ভালোবাসাটা ছিল সিনেমার মতো।তখন মনে হতো,ভালোবাসা থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।


২৭–এ তারা বিয়ে করল

পরিবারের সম্মতিতে নয়, অনেকটা লড়াই করেই। শুরু হলো নতুন জীবন। প্রথম দিকে সংসার ছিল রঙিন।একসাথে রান্না, বাজার করা,ছোট ছোট ভুলে হাসাহাসি।কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবতা ঢুকতে শুরু করল।


৩০–এ সন্তান এলো

জীবন আর শুধু তারা দুজন এ থাকল না।অনিমা ব্যস্ত হয়ে গেল সন্তান,ঘর আর দায়িত্বে।জয় চাপ নিল চাকরি আর ভবিষ্যতের চিন্তায়।কথা বলার সময় কমে গেল,কিন্তু দায়িত্ব বাড়ল।ভালোবাসা তখন আর শব্দে ছিল না।ছিল ক্লান্ত চোখের যত্নে,রাত জাগায়,আর নীরব সহযোগিতায়।


৩৫–এ এসে দূরত্বটা চোখে পড়তে শুরু করল

তারা একসাথে ছিল,কিন্তু অনেক সময় মনে হতো আলাদা দুইটা জীবন চলছে।অনিমা চাইত একটু সময়,একটু কথা।জয় ভাবত সব তো করছি,এর চেয়ে বেশি আর কী?

ভুল বোঝাবুঝি জমতে লাগল।


৪০–এ এসে উপলব্ধি

একদিন হঠাৎ শান্ত একটা সন্ধ্যায় অনিমা বুঝল,জয় তাকে এখনো ভালোবাসে, কিন্তু আগের মতো প্রকাশ করতে জানে না।আর জয় বুঝল অনিমার চাওয়া ছিল খুব বেশি কিছু না,শুধু একটু অনুভব করা যে সে এখনো গুরুত্বপূর্ণ।


তারা বুঝল, ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায়নি,শুধু চাপা পড়ে গিয়েছিল দায়িত্ব আর নীরবতার নিচে।



৪০ বছরে এসে তাদের উপলব্ধি হলো,

ভালোবাসা কমে না,কিন্তু যত্ন না নিলে সেটা নীরব অভ্যাসে বদলে যায়।

আর সম্পর্ক টিকে থাকে বড় বড় কথায় নয়,ছোট ছোট আমি আছি বলার মাধ্যমে। 



অনিমা এখন ৪০, জয় ৪৩।

বাইরের দিক থেকে দেখলে তাদের জীবনটা একদম স্বাভাবিক।একই ছাদের নিচে থাকা,সন্তান নিয়ে ব্যস্ততা,সংসারের নিয়ম,সব ঠিকঠাকই চলছে।কিন্তু ভেতরের গল্পটা অনেক আগেই বদলে গেছে।


একসময় যে সম্পর্কটা ছিল হাসি-অভিযোগে ভরা, এখন সেখানে কথা কমে গেছে।দরকার ছাড়া কেউ আর কাউকে ডাকে না। সকালের চা টেবিলে বসেও দুজনের মাঝে থাকে একটা অদৃশ্য দূরত্ব।যেটা চোখে দেখা যায় না,কিন্তু অনুভব করা যায় খুব স্পষ্টভাবে।

অনিমার মনে অনেক কথা জমে আছে,অভিমান,না বলা কষ্ট আর একটা চাওয়া… 

"একটু বুঝে নেওয়া হোক তাকে।"


জয়ের মনেও ভালোবাসা আছে,কিন্তু সেটা এখন প্রকাশ পায় দায়িত্বের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া ক্লান্ত এক মানুষ হিসেবে। 

সে ভাবে সব তো ঠিকই চলছে,তাহলে সমস্যা কোথায়?

সমস্যা ছিল ঠিক চলা-র ভেতরেই।


সময় তাদের দুজনকে একসাথে রেখেছে,কিন্তু মনকে আলাদা করে দিয়েছে অনেক আগেই। এখন আর ঝগড়া নেই, তীব্র রাগও নেই,শুধু নীরব অভ্যস্ততা।একজন আরেকজনকে হারানোর ভয়ও নেই,কারণ তারা ধরে নিয়েছে,সে তো আছেই।


একদিন সন্ধ্যায় অনিমা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বুঝতে পারে—

ভালোবাসা ছিল… কিন্তু আমরা তাকে যত্ন করতে ভুলে গেছি।

অযত্নে অবহেলায় ভালবাসায় মরিচা ধরে গিয়েছে। 


জয় সেই রাতে একটু চুপ করে থেকে শুধু বলে,

আমরাই তো বদলে গেছি… 

ভালোবাসা না।


কিন্তু সত্যিটা ছিল মাঝখানে,ভালোবাসা হয়তো কমেনি,শুধু অবহেলায় ধুলো জমেছে তার ওপর।


৪০-এর এই বয়সে এসে তারা বুঝেছে—

ভালোবাসা একবার তৈরি হলেই টিকে যায় না,তাকে প্রতিদিন একটু করে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।না হলে সবচেয়ে আপন সম্পর্কও একদিন একসাথে থাকা অভ্যাস-এ পরিণত হয়… ভালোবাসায় নয়।


এই গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো,ভালোবাসা একবার হয়ে গেলেই তা টিকে থাকে না,তাকে প্রতিদিন যত্ন দিতে হয়। শুরুতে যে সম্পর্ক আবেগে ভরা থাকে,সময়ের সাথে সেটাই যদি অবহেলা, ব্যস্ততা আর না বলা কষ্টে ভরে যায়,তাহলে ভালোবাসা ধীরে ধীরে অভ্যাস-এ পরিণত হয়।

অনিমা আর জয়ের গল্প আমাদের শেখায়,শুধু একসাথে থাকা মানেই সম্পর্ক বাঁচা না।সম্পর্ক বাঁচে তখনই,যখন মানুষ দুজন একে অপরকে অনুভব করে,শোনে,আর ছোট ছোট মুহূর্তেও গুরুত্ব দেয়।

নীরবতা যদি দীর্ঘ হয়, তাহলে দূরত্ব তৈরি হয়। ভালোবাসা থাকলেও।

তাই শিক্ষা একটাই।

ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু বড় বড় প্রতিশ্রুতি নয়,দরকার প্রতিদিনের একটু সময়, একটু কথা,আর 

তুমি কেমন আছো?

এই ছোট্ট যত্নে ভরা বাক্যে।


লেখাঃ ইশরাত জাহান ইনা 

sidebar ad