ইশরাত জাহান ইনা
তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না বলে যে মানুষটার হাত একসময় চেপে ধরে ছিলেন, স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি ছোট্ট ঘর বাঁধার, সেই মানুষটা পাশের বালিশে ঘুমিয়ে ও কেন যোজন যোজন দূরের মনে হয়?
একি ছাদের নিচে থেকে, একি টেবিলে খেয়ে পাশাপাশি কাছাকাছি তবুও কথা গুলি কোথাও যেন হারিয়ে গেছে। এটা ভাঙন নয়। বরং ধীরে ধীরে তৈরী হওয়া একটা অদৃশ্য দেয়াল, যার নাম "দূরত্ব"।
আজকাল কার প্রযুক্তি নির্ভর ব্যস্ত চাপে ভরা জীবনে দাম্পত্য আর দায়িত্ব পালন কিছুতেই যেন সরলতা বলতে কিছু নেই। ভালবাসা আর দায়িত্ব থাকলেও কানেকশনটা হারিয়ে যাচ্ছে।
আসুন দেখি কেন এই দূরত্ব? কি বা কারণ আর কিভাবে এই দেয়াল ভেঙ্গে বাস্তব কৌশলে নতুন করে ভালবাসার ইমারত তৈরি করা যায়।
ব্যস্ত জীবনে দাম্পত্যে সময় দেয়ার বাস্তব কৌশল-
আজকের দিনে পৃথিবীর সাথে আমরাও দৌড়াচ্ছি ক্যারিয়ার, ফিনানশিয়ালি সেটাপ,সোস্যাল পজিশন এই সবকিছুর পিছনে। সাফল্য এলেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সম্পর্কের।
"আমার সময় নাই" এটাই যেন প্রতিটি সম্পর্কের একটা কমন ডায়লগ। আসল সত্যটা হল সময় পাওয়া ঠিকই যায় না কিন্তু সময় তৈরি করতে হবে।
একটা দাম্পত্য টিকিয়ে রাখা বড় ইনভেস্ট করার মত কিছু নয়।পজিটিভ মেন্টালিটি আর ছোট ছোট কিছু অভ্যাস ব্যাস যথেষ্ট।
*সারাদিন কাজ শেষে ঘরে ফিরে মোবাইল টিপতে না বসে তাকে একটু খানি সময় দিন।
সারাদিন কি করেছ এটা না বলে জিগ্যেস করুন "আজ দিনটা কেমন ছিল"?
একটা প্রশ্ন যেন সারাদিনের ক্লান্তির পর কিছুটা স্বস্তি। অথচ বাস্তবে কি হয় উল্টো তুমি সারাদিন কি কর?
এই একটা নেগেটিভ বাক্য নিজেদের মধ্যে সেই অদৃশ্য দেয়ালের ভিত তৈরি করা শুরু করে।
*সারাদিন এর কাজ গুছিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট প্রতিদিন রুটিন করে রাখুন এই সময় টা শুধু দুজনের। কোন সোস্যাল মিডিয়া নেই,ফোন নেই,ডিভাইস নেই শুধু কথা বলুন,দুজনের প্রথম জীবন গল্প বলুন তার কাছ থেকে ও শুনুন।
*সপ্তাহে একটি দিন দুজন কোথাও গিয়ে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করুন,কিছু না হলে বাসায় দুজন এক সাথে দুই কাপ চা বানিয়ে খান।এগুলো সম্পর্ক টা কে গাছে পানি দিয়ে জীবন্ত রাখার মত কাজ করে।
মানে রাখবেন, সম্পর্ক যত্ন আর সময় চায়।ভালবাসা যদি মাটি হয় সময় হল পানি আর সম্পর্ক হল যত্নে গড়া একটি চারাগাছ। যত যত্ন সময় দেবেন ততই ফুল ফল পাবেন।
অর্থনৈতিক চাপ কিভাবে দাম্পত্যের প্রভাব ফেলে :
*অর্থ সম্পদ এবং প্রয়োজন সম্পর্কে উপর চাপের অন্যতম কারণ।
আয়-ব্যয়ের ব্যালেন্স যখন ঠিক থাকে না সম্পর্কে ব্যালেন্সও তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
*টেনশন, মানসিক চাপ,বিরক্তি, রাগ এসে বাসা বাধে নিজেদের মধ্যে।হতাশা যেন কবজা করে নেয় পুরো জীবন টা কে।
"স্বামী ভাবে এত কষ্ট করে ইনকাম করে এনে দেই তাও আমাকে বুঝে না "
"স্ত্রী ভাবে আমার কি কোন চাহিদা ই নেই?"
*এভাবেই ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি বড় দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সমাধান: প্রথমত, স্বামীর সব সময় একে অন্যের অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত। আমি কতটা ইনকাম করছি তুমি কতটা ব্যয় করছ এসব চাপা না রেখে হিসেব করে কিছু ব্যয় বাড়িয়ে কমিয়ে এডজাস্ট করে চললে এই ভুল বুঝাবুঝির অবসান হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, একে অন্যকে দোষারোপ না করে হিসেব করে চিন্তা করুন কোনটা কার সমস্যা। তোমার সমস্যা এই নেগেটিভ বাক্যটি ব্যবহার করা বন্ধ করুন। বরং বলতে শিখুন "আমাদের পরিস্থিতি "।
তৃতীয়ত, বাস্তবতার সাথে জীবনকে অ্যাডজাস্ট করতে শিখে নিন। সোশ্যাল মিডিয়ার চাকচিক্য দেখে নিজেদের মধ্যে অশান্তি তৈরি করবেন না। অর্থনৈতিক সংকট আসতেই পারে।কারো কম কারো বেশি সম্পদ থাকবে এটাই বাস্তবতা।একে মানতে শিখুন।অমুকের আছে আমার নেই এমন মনোভাব নিজের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। একদিন আমাদেরও হবে এমন পজিটিভ চিন্তা করুন।দুজনের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো থাকলে সম্পর্ক কখনো নষ্ট হয় না। বরং আরো শক্তিশালী হয়।
"একসাথে থেকেও দূরত্ব" কারণ ও সমাধান-
আজকের দিনের একটি বড় বাস্তবতা হলো স্বামী স্ত্রী একই বিছানায় শুয়েও হাজার হাজার মাইল মনের দূরত্বে বাস করছে।
প্রধান কারণগুলো কী?
*যোগাযোগের ভাঙ্গন : প্রথমে কথা কমে যাওয়া পরে কথা বন্ধ করে দেওয়া এটাই হলো সম্পর্কের দেয়ালের দূরত্বের প্রথম ভিত।না বলা কথার চাপ ভেতর থেকে ক্ষয় করে ফেলে আপনার সম্পর্কের ঝগড়া নয় নীরবতা সবচেয়ে বেশি বিপদজনক। তাই সহজ কৌশল অবলম্বন করুন নীরবতা ভেঙে কথা বলুন সহজ আলোচনায় সমস্যা সমাধান করুন।
*প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা : বিয়ের আগে রোমান্টিক কাল্পনিক জগত থেকে বেরিয়ে এ
যখন বিয়ের পরের বাস্তবতার জীবনে প্রবেশ করবেন তখনই হতাশাটা তৈরি হয়। অতিরিক্ত প্রত্যাশা আপনার এই হতাশার প্রধান কারণ। এখন সমাধান হলো গ্রহণযোগ্যতা শেখার প্রয়োজনীয়তা। আপনি আপনার সাধ্য মতন মানিয়ে নিতে চেষ্টা করুন আপনার যতটুকু প্রাপ্য কতটুকুই দাবি করুন।কাল্পনিক ও বাস্তবিক জীবনের ফারাকটা বুঝে নিতে শিখে নিন।
*ইগো ও আত্মসম্মান: স্বামী স্ত্রী র মাঝে কখনোই ইগোকে জায়গা করতে দেবেন না। ক্ষমা চাইতে শিখুন নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখুন। সম্মান বজায় রেখে মতবিরোধ
ম্যানেজ করতে শিখুন।
*সোশ্যাল মিডিয়া ও তৃতীয় পক্ষের প্রভাব: সোশ্যাল মিডিয়ার চাকচিক্য দেখে অন্যের জীবনের সাথে নিজের তুলনা কখনোই করবেন না। সম্পর্কের গোপনীয়তা রক্ষা করা খুবই জরুরী।
*আপনি মানসিকভাবে ক্লান্ত আবেগত ভাবে অবহেলিত, তাও মুখে বলছেন" আমি ঠিক আছি"। এই কথার আড়ালে আসল কথাটা অনেকেই বুঝতে পারে না। ইমোশনাল সাপোর্ট না পেলে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। একে অপরের পাশে থাকার বাস্তব উপায় খুঁজে বের করুন। মনের কথা ইন্ডাইরেক্টলি নয় ডাইরেক্ট বলার অভ্যাস গড়ুন।
*গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট হল সন্তান আসার পর সম্পর্কের পরিবর্তন: দাম্পত্য থেকে প্যারেন্টিং এর শিফটিং এটা স্বামী স্ত্রীর জন্য কঠিন একটা পরিস্থিতি। মনোযোগের ভারসাম্য ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু বাবা-মা নয় আবার দম্পত্তি হয়েও উঠতে গিয়ে স্বামী স্ত্রীর ভেতরের সম্পর্কটা কেমন যেন গুলিয়ে যায়।রুটিন করে সময় বের করে নিতে হবে। এলোমেলো নয় একজন আরেকজনকে সাপোর্ট করে গুছিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে সময় ভাগ করে নিন যখন একজন মা বিশ্রাম নেবেন, বাবা কাজ গুছিয়ে দেবেন।
*বিশ্বাসের সংকট: বিশ্বাস কাচের গ্লাসের মতন একবার ভাঙ্গন ধরলে আজীবন ফাটল দেখা যায়। সন্দেহ নষ্ট করে সম্পর্ক।
ট্রাস্ট রিবন্ড করবেন কিভাবে: আপনার প্রতিটি কাজে এবং কথায় স্বচ্ছতা রাখুন সততাকে গুরুত্ব দিন। দ্বন্দ্ব ম্যানেজমেন্ট করুন ঝগড়া নয়, হেলদি আরগুমেন্ট করে সমাধান করুন। সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাবেন না জিয়িয়ে রাখবেন না বরং জরুরী হলো সেটা মোকাবিলা করা এবং কখন কোন সিচুয়েশন কে এড়িয়ে চলবেন বুঝে নিতে হবে।
*ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার কৌশল : জীবনকে রিস্টার্ট দিন কিছু নতুন কৌশল বের করুন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অভ্যাস করুন। নিজের সঙ্গীর প্রশংসা করুন। ছোট ছোট কাজে কিংবা তার যে কোন অবদানকে স্বীকার করুন এবং তাকে ধন্যবাদ দিন।
কিছু কথা দাম্পত্য ভাঙ্গা খুব সহজ কিন্তু তা ধরে রাখা সবচেয়ে কঠিন কাজ। দুজনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং, কম্প্রমাইজিং, এর পাশাপাশি দুজন দুজনকে সম্মান করা খুব বেশি জরুরী। ভালোবাসার, সময় আর একটুখানি যত্ন এই দুরত্বের দেয়াল ভেঙে ফেলার জন্য প্রথম হাতিয়ারের মতন কাজ করতে পারে।