প্যানিক অ্যাটাক: ভয় নয়, জানতে হবে

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬

প্যানিক অ্যাটাক: ভয় নয়, জানতে হবে

শায়লা জাহান

হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে উঠা,স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া,চারপাশটা ঝাপসা হয়ে আসা; এমন সব উপসর্গের অভিজ্ঞতা কম-বেশি আমাদের মধ্যে অনেকেরই হয়েছে। অনেক সময় হার্ট অ্যাটাক ভেবে ভূল করলেও এগুলো মূলত প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষন। শরীরের স্থায়ী কোন ক্ষতি না করলেও, এটা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা যাদের হয়েছে তারা বুঝতে পারবে। বিষয়টি অবহেলা না করে আমাদের জানতে হবে এই প্যানিক অ্যাটাকের আদ্যোপান্ত।  



পরীক্ষার হলে পিনপতন নীরবতা। শুধু ঘড়ির টিক টিক শব্দ  আর কাগজে কলমের খসখস শব্দ হচ্ছে। রুমির সামনে পড়ে আছে প্রশ্নপত্র। তার জানা উত্তর কাগজে লিখতে কলমটা ধরতে যেয়ে সে দেখে, তার আঙুল থরথর করে কেঁপে উঠছে। ফ্যানের শীতল বাতাসেও কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে।  নিঃশ্বাসটাও যেনো বুক ভরে নেয়া যাচ্ছেনা। গলার কাছে কি যেনো  দলা পাকিয়ে আসছে। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। চিৎকার করে কিছু বলতে চেয়েও গলা দিয়ে কোন স্বর বের হচ্ছেনা। আশেপাশে সবকিছুই শান্ত হয়ে আছে। কিন্তু রুমির শরীরের ভেতর দিয়ে যেনো বয়ে যাচ্ছে এক অশান্ত ঝড়। আর নীরবে বয়ে যাওয়া এই ঝড়ই হলো প্যানিক অ্যাটাক। এটি কোন শারীরিক রোগ নয়, বরং স্নায়বিক অস্থিরতার এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। 


প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণ

বুক ধড়ফড় করা বা হার্ট বিট বেড়ে যাওয়া

শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া

মাথা ঘোরা এবং দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া

ঘাম হওয়া 

বমি বমি ভাব

তীব্র ভয় বা আতঙ্কিত হয়ে পড়া

আশেপাশের পরিবেশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করা

এই অ্যাটাকগুলো সাধারণত ১০ মিনিটের মধ্যে চরমে পৌঁছায় এবং ৫ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়। 



প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার কারন


অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস 

শারীরিক কিছু সমস্যা থাকলে যেমন; থাইরয়েড, হৃদরোগ

অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ

মদ্যপান , ধূমপানের অভ্যাস থাকলে

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব হলে 

দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা বা ভয় 

সাধারণত এইসব কারনেই শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোন বেড়ে যায় এবং শারীরিক নানা উপসর্গ প্রকাশ পায়। 



করনীয়

হঠাৎ করে হওয়া প্যানিক অ্যাটাক অসহনীয় ও ভীতিকর মনে হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে-

নিজেকে নিজে শান্ত করা। এটা মনে করিয়ে দেয়া যে এই অনুভূতি সাময়িক এবং অচিরেই তা কেটে যাবে।

ডিপ ব্রিথ নেয়া। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে নাক দিয়ে ৪ সেকেন্ড শ্বাস নিয়ে, ৭ সেকেন্ড আটকে রাখো এবং মুখ দিয়ে ৮ সেকেন্ড ধরে ধীরে ধীরে শ্বাস ছেড়ে দাও। এটা স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করবে। 

ভিড় বা কোলাহলপূর্ণ স্থান ছেড়ে শান্ত কোন জায়গায় যাও। সবচেয়ে ভালো হবে প্রকৃতির কাছে তাজা বাতাসের কাছে যেতে পারলে।

 ৫-৪-৩-২-১ গ্রাউন্ডিং টেকনিক ব্যবহার করা। অর্থাৎ- চোখের সামনে পড়ে এমন ৫টি জিনিসের দিকে তাকানো। কাছাকাছি থাকা ৪টি জিনিস স্পর্শ করা। ৩টি স্বতন্ত্র শব্দ শুনা। ২টি জিনিস শনাক্ত করা যেগুলোর ঘ্রাণ নেয়া যায় এবং  এমন ১টি জিনিস খুঁজে বের করা যেটার স্বাদ নেয়া যেতে পারে। এভাবেই মনটাকে অন্যদিকে ফোকাস করতে হবে। 

মুখে এবং ঘাড়ে ঠান্ডা পানি ব্যবহার করলে ভালো লাগবে।



প্রতিকার


প্যানিক অ্যাটাক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর জন্য কিছু দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নেয়া জরুরী- 

নিয়মিত ৭-৮ ঘন্টা ঘুমানো খুবই জরুরী।

একটিভ থাকা প্রয়োজন। হালকা ব্যায়াম যেমন হাঁটা, স্ট্রেচিং করা যেতে পারে। এগুলো দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করে।

অতিরিক্ত চা, কফি বা ধুমপান বর্জন করতে হবে।

কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) প্যানিক অ্যাটাকের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর। 

প্রয়োজনে সাইকোলজিস্ট বা ডাক্তারের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। 

কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?

বারবার প্যানিক অ্যাটাক হলে

প্রতিদিনকার জীবন ব্যাহত হলে

২০-৩০ মিনিট পরেও উপসর্গগুলো না কমলে 

শ্বাসকষ্ট যা শান্ত করার যে টেকনিক রয়েছে তাতেও না কমলে 

বুকের ব্যথা যা ঘাড়, হাত বা পিঠে ছড়িয়ে পড়লে 

প্যানিক অ্যাটাক মানেই তুমি দূর্বল বা মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে, এমন ভাবার কোন কারন নেই। এটাকে ভয় বা আড়াল না করে, নিজের শরীর ও মনের সংকেতকে গুরুত্ব দাও। সঠিক সচেতনতা ও প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে খুব দ্রুতই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া দূর্বলতা নয়, বরং তা নিজের প্রতি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

sidebar ad