শায়লা জাহান-
বলা হয়, আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করি যেখানে তরুণ প্রজন্ম, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই এক ধরনের সংকটের সঙ্গে লড়াই করে। সবকিছু ঠিকঠাক চলার পরেও হঠাৎ করে মন খারাপ হয়ে যাওয়া কিংবা ছোট একটা ব্যর্থতাতেই ভেঙ্গে পড়া- এগুলো সবই কি দূর্বলতা? নাকি সময়টাই আসলে বদলে গেছে?
“এজ ইউ লাইক ইট’’ নাটকে শেক্সপিয়র মানুষের জীবনকে সাতটি পর্যায়ে বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি জীবনের শেষ পর্যায়কে বিষন্নময় পর্যায় হিসেবে চিত্রিত করেছেন। কিন্তু এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে তরুণরা এখন তাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের তুলনায় কম সুখী। এ প্রজন্মকে অনেকেই অতিরিক্ত সংবেদনশীল বা সহজেই হতাশ হয়ে পড়া বলে আখ্যা দেন। ব্যাপারটি সত্যিই এলার্মিং। আজকের প্রজন্মের এই দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ার পেছনে যতটুকু না ব্যক্তিগত কারণ রয়েছে তার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে আমাদের চারপাশের পরিবর্তিত ব্যবস্থা। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে করতে হঠাৎই মনে হলো, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে , কেবল আমিই বুঝি পিছিয়ে যাচ্ছি। তীব্র প্রতিযোগিতা, অবিরাম তুলনা আর এক অস্থিরতাময় পৃথিবীতে বড় হচ্ছে এই প্রজন্ম। তাই তাদের হতাশার কারণ বুঝতে হলে আমাদের এর পেছনের কারণগুলো জানতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব
আজকের প্রজন্মের দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়া একটি অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম,টিকটক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠলেও, এগুলোর অতিরিক্ত ও নেতিবাচক ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যারা দিনে ৩ ঘন্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে ডিপ্রেশন ও উদ্বেগের ঝুঁকি দ্বিগুণ থাকে। এটি যেভাবে প্রভাব ফেলে-
সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ কেবল তাদের জীবনের সেরা বা সুন্দর মুহুর্তগুলোই শেয়ার করে। প্রতিনিয়ত অন্যদের এসব চমকপ্রদ জীবন দেখে তারা হীনম্মন্যতায় ভোগে এবং মনে করে তাদের জীবন ব্যর্থ।
সেখানে খুব অল্প বয়সে সফল হওয়া ব্যক্তিদের দেখে তরুণরা দ্রুত ও সহজে সাফল্য পাওয়ার আশা করে। কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেলে তারা হতাশ হয়ে পড়ে।
রাত জেগে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ফলে ঘুমের চক্র বিঘ্নিত হয়, যা সরাসরি উদ্বেগ ও হতাশার সাথে সম্পর্কিত।
একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা
ডিজিটালি আমরা সবাই সবার সাথেই কানেক্টেড। সামাজিক মাধ্যমে হাজার হাজার ফ্রেন্ড বা ফলোয়ার থাকলেও মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বা গভীর বন্ধুত্ব কমে আসছে। প্রত্যেকটা মানুষ নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত যে পাশের জনের খোঁজ নিতেই ভুলে যায়। এর ফলে জীবনে দেখা যায় একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা চেপে বসেছে। আর এটাই তরুণদের মাঝে মানসিক চাপ বাড়ায়।
তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার অভ্যাস
ডিজিটাল এই যুগে সবকিছুই আমরা দ্রুত পেতে শিখেছি। এক ক্লিকেই ফুড ডেলিভারি থেকে শুরু করে বিনোদন- সবকিছুই চাওয়া মাত্রই হাতের কাছে হাজির। এতে অপেক্ষা করার ক্ষমতা কমে গেছে। এই একই জিনিস যখন বাস্তব জীবনে সাফল্য ধরা দিতে সময় লাগে, তখনই সৃষ্টি হয় হতাশার।
অতিরিক্ত প্রত্যাশা
ভালো রেজাল্ট, ভালো ক্যারিয়ার, ভালো একটা লাইফস্টাইল- সবকিছু একসাথে পেতে হবে। সমাজ কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া সফলতার এই মানদন্ডে দৌড়াতে যেয়ে, এই অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মনে অজান্তেই ভয় ধরিয়ে দেয়। কিছু মনের মতো না হলে তখনই ভাবে আমি ব্যর্থ। এই মানসিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে হতাশায় রুপ নেয়।
মানসিক দৃঢ়তার অভাব
আজকাল সন্তান লালনের ক্ষেত্রে দেখা যায় সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে তাকে আগলে রাখা হয়। এতে করে ছোটবেলা থেকে ব্যর্থতা বা প্রত্যাখ্যান সহ্য করার সেই মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠেনা। পরবর্তীতে বাস্তব জীবনে যখন বড় কোন ধাক্কা আসে, তখন তা মোকাবিলা করার মতো মানসিক সক্ষমতা তারা খুঁজে পায়না।
সমাধানের পথ
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমিয়ে আনা
নিজের অগ্রগতির সাথে নিজের তুলনা করা
পরিবারে মানসিক সাপোর্ট বাড়ানো
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা
ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করে ধীরে এগোনো
ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে দেখা
বাঁচতে হলে পড়াশোনা, চাকরি, অর্থ উপার্জন অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাঁচতে গেলে ভালো থাকাটাও কিন্তু জরুরী। তাই আগে নিজেকে ভালো রাখতে হবে।