এমা ওয়াটসনের ভাষণ: ‘হি ফর শি’

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬

এমা ওয়াটসনের ভাষণ: ‘হি ফর শি’

রোদসী ডেস্ক:


হলিউড অভিনেত্রী ও নারীনেতৃ এমা ওয়াটসন জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ইউএন ওমেন এর ‘হি ফর শি’ এর প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। ওই প্রচারণায় এমা ওয়াটসন একটি বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্যটি রোদসীর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।


’’মহামান্য রাষ্ট্রদূতবৃন্দ, জাতিসংঘের মহাসচিব, সাধারণ পরিষদের সভাপতি, ইউএন উইমেনের নির্বাহী পরিচালক এবং সম্মানিত অতিথিবৃন্দ। আজ আমরা ‘হি ফর শি’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করছি। আমি আপনাদের কাছে এসেছি, কারণ আমাদের আপনাদের সহায়তা প্রয়োজন। আমরা লিঙ্গবৈষম্যের অবসান ঘটাতে চাই, আর তা করতে হলে সবার অংশগ্রহণ দরকার।


এটি জাতিসংঘের ইতিহাসে এ ধরনের প্রথম প্রচারণা। আমরা যত বেশি সম্ভব পুরুষ ও ছেলেকে পরিবর্তনের পক্ষে কণ্ঠস্বর হিসেবে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে চাই। আমরা শুধু এ নিয়ে কথা বলতে চাই না; আমরা চাই এটি বাস্তব ও দৃশ্যমান পরিবর্তনে পরিণত হোক।


ছয় মাস আগে আমাকে ইউএন উইমেনের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর নারীবাদ নিয়ে যত বেশি কথা বলেছি, তত বেশি উপলব্ধি করেছি যে নারীর অধিকার নিয়ে লড়াইকে অনেক সময় পুরুষ-বিদ্বেষের সমার্থক করে দেখা হয়। আমি একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে জানি—এটি বন্ধ হওয়া জরুরি।


স্পষ্ট করে বলি, নারীবাদ বা ফেমিনিজমের মূল অর্থ হলো নারী ও পুরুষের সমান অধিকার ও সমান সুযোগে বিশ্বাস করা। এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার ধারণা।


আমি অনেক আগে থেকেই লিঙ্গভিত্তিক ধারণাগুলো নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করি। যখন আমার বয়স আট, আমি অবাক হতাম—বাবা-মায়ের জন্য মঞ্চস্থ করা নাটক পরিচালনা করতে চাইলে আমাকে ‘বসসি’ বলা হতো, কিন্তু ছেলেদের বলা হতো না।


চৌদ্দ বছর বয়সে, গণমাধ্যমের কিছু অংশ আমাকে যৌন আবেদনময়ী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে। পনেরো বছর বয়সে, আমার বান্ধবীরা তাদের প্রিয় খেলাধুলার দল ছেড়ে দিতে শুরু করে, কারণ তারা পেশিবহুল দেখাতে চাইত না। আর আঠারো বছর বয়সে দেখেছি, আমার পুরুষ বন্ধুরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারত না।


তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই যে আমি একজন নারীবাদী। বিষয়টি আমার কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখেছি, ‘ফেমিনিজম’ শব্দটি এখন অনেকের কাছে অপ্রিয় হয়ে উঠেছে।


অনেক নারী নিজেদের নারীবাদী হিসেবে পরিচয় দিতে চান না। বলা হয়, আমিও নাকি সেই নারীদের মধ্যে একজন, যাদের বক্তব্যকে অতিরিক্ত কঠোর, আক্রমণাত্মক, পুরুষবিরোধী, এমনকি অ-আকর্ষণীয় হিসেবে দেখা হয়। কেন এই শব্দটি এত অস্বস্তিকর হয়ে উঠল?


আমি ব্রিটেন থেকে এসেছি, এবং আমি মনে করি আমার পুরুষ সহকর্মীদের মতো একই কাজের জন্য একই পারিশ্রমিক পাওয়া আমার অধিকার। আমি মনে করি, আমার নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার থাকা উচিত। আমার জীবনে প্রভাব ফেলবে এমন নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণের অধিকার থাকা উচিত। সমাজে পুরুষদের মতো একই সম্মান পাওয়াও নারীদের প্রাপ্য।


কিন্তু দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে, পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে সব নারী নিশ্চিতভাবে এই অধিকারগুলো ভোগ করেন। এখনো কোনো দেশ দাবি করতে পারে না যে তারা লিঙ্গসমতা অর্জন করেছে। আমি এই অধিকারগুলোকে মানবাধিকার বলে মনে করি, কিন্তু আমি সৌভাগ্যবানদের একজন।


আমার জীবন অনেক সুবিধাপ্রাপ্ত ছিল, কারণ আমি মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলে আমার বাবা-মা আমাকে কম ভালোবাসেননি। আমার স্কুল আমাকে সীমাবদ্ধ করেনি, কারণ আমি একজন মেয়ে। আমার পরামর্শদাতারা কখনো ভাবেননি যে আমি কম দূর এগোব, শুধু ভবিষ্যতে আমি মা হতে পারি বলে।


এই মানুষগুলোই ছিলেন লিঙ্গসমতার অঘোষিত দূত, যারা আমাকে আজকের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। হয়তো তারা নিজেরাও জানেন না, কিন্তু তারাই সেই অনিচ্ছাকৃত নারীবাদী, যারা আজ বিশ্বকে বদলে দিচ্ছেন। আমাদের আরও এমন মানুষ প্রয়োজন।


আর যদি আপনারা এখনো ‘ফেমিনিজম’ শব্দটি অপছন্দ করেন, তবে শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো এর পেছনের ধারণা ও লক্ষ্য। কারণ পৃথিবীর সব নারী আমার মতো একই অধিকার পাননি। পরিসংখ্যান বলছে, খুব অল্পসংখ্যক নারীই তা পেয়েছেন।


১৯৯৭ সালে হিলারি ক্লিনটন বেইজিংয়ে নারীর অধিকার নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। দুঃখজনকভাবে, তিনি যেসব বিষয় পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন, তার অনেক কিছু আজও সত্য। কিন্তু আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল এই তথ্য যে সেই শ্রোতাদের মধ্যে ৩০ শতাংশেরও কম ছিলেন পুরুষ।


যখন পৃথিবীর অর্ধেক মানুষকে আলোচনায় আমন্ত্রণই জানানো হয় না, অথবা তারা অংশ নিতে স্বাগত বোধ করেন না, তখন আমরা কীভাবে পরিবর্তন আনব?


পুরুষদের উদ্দেশে আমি এই সুযোগে একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাতে চাই। লিঙ্গসমতা আপনাদের বিষয়ও। কারণ আমি দেখেছি, একজন বাবা হিসেবে আমার বাবার ভূমিকাকে সমাজ কম মূল্য দেয়, যদিও একজন শিশু হিসেবে আমার তাঁর উপস্থিতি ঠিক ততটাই প্রয়োজন ছিল, যতটা মায়ের।


আমি দেখেছি তরুণ পুরুষরা মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে, কিন্তু সাহায্য চাইতে পারছে না, কারণ তারা ভয় পায়—এতে তারা ‘কম পুরুষ’ বলে বিবেচিত হবে। যুক্তরাজ্যে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী পুরুষদের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ আত্মহত্যা—যা সড়ক দুর্ঘটনা, ক্যানসার এবং হৃদরোগের চেয়েও বেশি।


আমি দেখেছি, পুরুষদের সাফল্যের বিকৃত ধারণা তাদের ভঙ্গুর ও অনিরাপদ করে তোলে। সমতার সুবিধা শুধু নারীরা পায় না—পুরুষেরাও পায়।আমরা খুব কমই কথা বলি যে পুরুষরাও লিঙ্গগত ছাঁচের মধ্যে বন্দী। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি তারা বন্দী, এবং তারা যখন মুক্ত হবে, তখন নারীদের অবস্থাও স্বাভাবিকভাবেই বদলে যাবে।


যদি পুরুষদের গ্রহণযোগ্য হতে আক্রমণাত্মক হতে না হয়, তবে নারীদেরও বাধ্য হয়ে অনুগত হতে হবে না। যদি পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ করতে না হয়, তবে নারীদেরও নিয়ন্ত্রিত হতে হবে না। নারী ও পুরুষ—উভয়েরই সংবেদনশীল হওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত। উভয়েরই শক্তিশালী হওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত।


এখন সময় এসেছে আমরা লিঙ্গকে দুটি বিপরীত আদর্শ হিসেবে নয়, বরং একটি বিস্তৃত পরিসর হিসেবে দেখি।


যদি আমরা একে অপরকে ‘আমরা কী নই’ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা বন্ধ করি এবং ‘আমরা কে’ দিয়ে নিজেদের সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করি, তবে আমরা সবাই আরও মুক্ত হতে পারব। আর এটাই ‘হি ফর শি’-এর মূল কথা—এটি স্বাধীনতার আন্দোলন।


আমি চাই পুরুষরা এই দায়িত্ব গ্রহণ করুক, যাতে তাদের কন্যা, বোন ও মায়েরা বৈষম্য থেকে মুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তাদের পুত্ররাও যেন দুর্বলতা প্রকাশ করার, মানবিক হওয়ার অনুমতি পায়।


আপনারা হয়তো ভাবছেন, “এই হ্যারি পটার-এর মেয়েটি কে, আর সে জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে এসব বলছে কেন?”


এটি খুবই যুক্তিসংগত প্রশ্ন। আমিও নিজেকে একই প্রশ্ন করেছি। আমি শুধু জানি, আমি এই সমস্যার প্রতি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং আমি এটিকে আরও ভালো করতে চাই। আমি যা দেখেছি এবং যে সুযোগ পেয়েছি, তাতে কথা বলা আমার দায়িত্ব বলে মনে করি।


রাষ্ট্রনায়ক এডমন্ড বার্ক বলেছিলেন, “অশুভ শক্তির জয়ের জন্য শুধু এটুকুই যথেষ্ট যে সৎ নারী-পুরুষরা কিছুই করবে না।”


এই ভাষণ নিয়ে আমার ভয় ও সংশয়ের মুহূর্তগুলোতে আমি নিজেকে দৃঢ়ভাবে বলেছি—“আমি না হলে কে? এখন না হলে কবে?”


আপনাদের সামনেও যদি কোনো সুযোগ আসে এবং আপনাদের মনে একই ধরনের সন্দেহ জাগে, আমি আশা করি এই কথাগুলো আপনাদের সাহায্য করবে।


কারণ বাস্তবতা হলো, আমরা যদি কিছুই না করি, তবে একই কাজের জন্য নারী-পুরুষের সমান বেতন পেতে আরও ৭৫ বছর লাগবে। তখন আমার বয়স প্রায় একশ হবে।


আগামী ১৬ বছরে ১ কোটি ৫৫ লাখ মেয়েশিশুর বাল্যবিবাহ হবে। আর বর্তমান হারে চলতে থাকলে, আফ্রিকার সব গ্রামীণ মেয়েশিশু মাধ্যমিক শিক্ষা পেতে ২০৮৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।


আপনি যদি সমতায় বিশ্বাস করেন, তবে হয়তো আপনিও সেই অনিচ্ছাকৃত নারীবাদীদের একজন, যাদের কথা আমি আগে বলেছিলাম। আর সে জন্য আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাই।


আমরা হয়তো একটি ঐক্যবদ্ধ শব্দ খুঁজছি, কিন্তু সুসংবাদ হলো—আমাদের একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন আছে। এর নাম ‘হি ফর শি’। আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি—এগিয়ে আসুন, দৃশ্যমান হোন, এবং নিজেকে প্রশ্ন করুন: “আমি না হলে কে? এখন না হলে কবে?”

আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’’


গ্রন্থণা: লিপি

sidebar ad