নবজাতকের প্রথম ১০০০ দিনের মধ্য যেভাবে গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬

নবজাতকের প্রথম ১০০০ দিনের মধ্য যেভাবে গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি

শায়লা জাহান


একটি শিশুর আগমন মানেই যেন একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম। তার নির্মল হাসি, প্রথম স্পর্শ, আধো আধো বোল সবকিছুই স্মরণীয় হয়ে থাকে। আর সেই ছোট্ট মানুষটির ভবিষ্যৎ ঘিরে শুরু হয় হাজারো স্বপ্ন, অসংখ্য পরিকল্পনা। 


কিন্তু জানেন কি, শিশুর সেই ভবিষ্যতের গল্প লেখা শুরু হয় জন্মের পর নয়, বরং মায়ের গর্ভেই? নবজাতকের প্রথম ১০০০ দিন, বিশ্বজুড়ে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত। 


তাই বিশেষজ্ঞদের মতে “সম্ভাবনার সোনালি সময়’’ বলে অভিহিত এই সময়টিই একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগের সময়। 


নবজাতকের প্রথম ১০০০ দিন বলতে কি বোঝায়? মায়ের গর্ভাবস্থার প্রায় ২৭০ দিন, জন্মের পর প্রথম বছর ৩৬৫ দিন এবং দ্বিতীয় বছরের প্রথম ৩৬৫ দিন; এই ১০০০ দিন সময়কালকে মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায় বলা হয়। এটি কেবল একটি সময়কাল নয়, বরং একটি শিশুর জীবনের এমন এক অনন্য সুযোগের জানালা, যা তার সারাজীবনের স্বাস্থ্য, বুদ্ধিমত্তা এবং সম্ভাবনার গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। একটি বহুতল ভবনের স্থায়িত্ব যেমন নির্ভর করে তার মজবুত ভিত্তির উপর, তেমনি একটি শিশুর সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে এই প্রথম ১০০০ দিনে। আর এই জন্য এই পুরো সময়জুড়ে মা ও শিশুর সঠিক পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা এবং যত্ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী। 



এই ১০০০ দিন কেন এতোটা গুরুত্বপূর্ন এবং এই সময়ে কি কি বিষয়ে নজর দেওয়া উচিৎ, আসুন তা জেনে নিই-


মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ-


একটি শিশুর জীবনে প্রথম ১০০০ দিন অপার সম্ভাবনা এবং চরম ভঙ্গুরতা উভয়ই ধারণ করে। এই সময়কালে মা ও শিশুদের জন্য পুষ্টি ও যত্ন নেয়ার উপর একটি শিশুর বিকাশ, শেখা এবং বেড়ে ওঠার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয়। এর কারণ হলো মানুষের মস্তিষ্কের প্রায় ৮৫% বিকাশ ঘটে এই প্রথম ১০০০ দিনের মধ্যে। এই সময়ে প্রতি সেকেন্ডে লক্ষাধিক নতুন নিউরোনাল সংযোগ তৈরি হয়। সঠিক উদ্দীপনা, ভালোবাসা এবং পুষ্টি এই সংযোগগুলোকে শক্তিশালী করে, যা শিশুর বুদ্ধিমত্তা, আবেগ নিয়ন্ত্রন, স্মৃতিশক্তি এবং ভাষা শেখার ক্ষমতা নির্ধারণ করে। 



শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশ-


শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের পুষ্টি গ্রহণ তাদের শরীরের ওজন ঠিক রাখার পাশাপাশি স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। শিশুর জীবনে এই পর্যায়ে শারীরিক বৃদ্ধির গতি থাকে সবচেয়ে বেশি। এই সময়ে সঠিক পুষ্টি না পেলে বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। শরীরের আয়তনের তুলনায় অন্য যেকোন পর্যায়ের চেয়ে এই পর্যায়ে শক্তি ও খাদ্যের আপেক্ষিক চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।   


রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা-


জীবনের প্রথম ৬ মাস শিশুর জন্য কেবল মায়ের বুকের দুধই যথেষ্ট। মায়ের বুকের শালদুধ (কলোস্ট্রাম) শিশুকে প্রাকৃতিক টিকার মতো সুরক্ষা দেয়, যা তাকে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার মতো রোগের হাত থেকে বাঁচায়।  



দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ-


গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম ১০০০ দিনে যে শিশুরা সঠিক পুষ্টি ও যত্ন পায়, তাদের স্বাস্থ্যকর ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। স্থূলতা এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মতো বিভিন্ন অসুস্থতা এবং ব্যাধি হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। শুধু তাই নয়, কিন্ডারগার্টেনে কম আচরণগত সমস্যা সহ আরও ভাল শিক্ষার্থী হয়ে ওঠে; এবং উন্নত স্বাস্থ্য ও আর্থিক স্থিতিশীলতা থেকে উপকৃত হয়। 


সঠিক পুষ্টির বিকল্প নেই-


একটি শিশুর জীবনের প্রথম ১০০০ দিন তার সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের ভিত্তি স্থাপনের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের গর্ভে এবং জন্মের পর শিশুর বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে চারটি স্বতন্ত্র পর্যায়ে ভাগ করা যায়।

- গর্ভকাল (গর্ভধারণ থেকে জন্ম পর্যন্ত)

- বুকের দুধ পান (জন্ম থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত)

- কঠিন বা শক্ত খাবার শুরু করা (ছয় থেকে ১২ মাস বয়স পর্যন্ত)

- পারিবারিক খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়া (১২ মাসের বেশি বয়স) 

প্রতিটি পর্যায়ে শিশুর বিকাশের জন্য পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। পুষ্টি সুস্থতা এবং শেখার ক্ষমতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মায়ের পুষ্টির ঘাটতি বা অভাব সত্ত্বেও সাধারণত বুকের দুধের উৎপাদন এবং এর পুষ্টিগুণে তেমন কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। তবে মায়ের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যের অবনতি হলে শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর বিরুপ প্রভাব পড়ে। গর্ভবতী মায়ের পুষ্টির উপরও শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশেরও প্রভাব পড়ে। তাই শিশু এবং মা উভয়েরই সঠিক সময়ে সঠিক পুষ্টির প্রয়োজন পড়ে। 


কার্যকর পদক্ষেপসমূহ-


একটি শিশুর এই বিশেষ ১০০০ দিনকে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করে যত্ন নিতে পারি। 

- গর্ভকালীন সময় (২৭০ দিন)

- জন্মের পর প্রথম ৬ মাস (১৮০ দিন)

- ৭ মাস থেকে ২ বছর (৫৫০ দিন) 


গর্ভবতী মায়েদের অবশ্যই সুষম ও পুষ্টিকর খাবার, অণু-পুষ্টি উপাদান (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্ট) এবং মানসম্মত প্রসবপূর্ব সেবা নিশ্চিত করতে হবে। মাতৃ-পুষ্টি বিষয়ক সেবা প্রদান এবং অন্তত চারবার প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে নবজাতকের কম ওজন ও শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। 


গর্ভাবস্থায় শিশুর মস্তিষ্কের বৃদ্ধির জন্য বেশ কিছু পুষ্টি উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট লিপিড, প্রোটিন, তামা, ফোলেট, দস্তা, আয়োডিন এবং লোহা।  ভ্রুনের স্নায়ু বিকাশের জন্য অপরিহার্য হওয়া সত্ত্বেও, গর্ভবতী মহিলাদের খাদ্যে ফলিক অ্যাসিড এবং আয়োডিনের ঘাটতি প্রায়শই দেখা যায়। এরজন্য গর্ভবতী মায়ের সুষম ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে।  


নিয়মিত ডাক্তার পরীক্ষা ও মানসিক চাপমুক্ত রাখতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত প্রসবপূর্ব সেবা, ওজন পর্যবেক্ষণ, আয়রন-ফলিক অ্যাসিড সেবন এবং পুষ্টি পরামর্শের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। বর্তমানে এসব সেবা কমিউনিটি ক্লিনিক ও সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দেওয়া হচ্ছে। 


সন্তান জন্মের মাধ্যমেই গল্পের সমাপ্তি ঘটে না। প্রসবের দুই দিনের মধ্যে নারী স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ না পেলে মা ও নবজাতক উভয়ই অজানা ঝুঁকির মুখে পড়েন। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য কর্মসূচীর লক্ষ্য হলো দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে নিরাপদ প্রসব, জন্মের পর পরই নবজাতকের প্রয়োজনীয় সেবা এবং প্রসবোত্তর মা ও শিশুর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা। 


শিশুর জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে শালদুধ খাওয়াতে হবে। শুধুমাত্রই বুকের দুধ, এক ফোঁটা পানিও নয়। প্রথম ৬ মাস মায়ের বুকের দুধই শিশুর আদর্শ খাদ্য।  পরবর্তীতে ৭ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পুষ্টিকর ও আধা শক্ত পরিপূরক খাবার শুরু করতে হবে।   


শিশুকে সময়মত সব টিকা প্রদান করতে হবে। প্রথম ১০০০ দিনের একটি বড় অংশ জুড়ে শিশুর জাতীয় টিকাদান কর্মসূচী সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।, যাতে প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে শিশু সুরক্ষিত থাকে।


সবশেষে, ভালোবাসা ও মানসিক যত্নও সমান জরুরি। শিশুকে কোলে নেয়া, তাঁকে স্পর্শ করা, হাসিমুখে সাড়া দেওয়া, গল্প করা তাঁর আবেগীয় ও সামাজিক বিকাশে অসাধারণ প্রভাব ফেলে। ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ তাকে সুস্থ, মেধাবী, সুখী ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলে। 


তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ), ইউনিসেফ, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর 

sidebar ad