জীবন মাঝে মাঝে অনেক চাপের হতে পারে। যখন তা আমাদের আয়ত্ত্বের বাহিরে চলে আসে তখন মনে হয় এই বুঝি আবার ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। কিন্তু পরাজিত হয়ে গেছি তা মনে করে আশা ছেড়ে দিবেন না। রাত যত দীর্ঘ হোক, ভোর হবেই।
কল্পনা করুন তো, আপনি এমন এক জায়গায় আছেন যেটা দীর্ঘ খরার সাথে লড়াই করে চলছে। চারপাশ নির্জীব, ধুলোমাখা আর প্রাণহীন। যেন সেখানে কখনো বৃষ্টির ছোঁয়াও পড়েনি। দেখে মনে হতে পারে ফসল বা গাছ কখনো জন্মাবেনা। কিন্তু আপনি যদি দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকেন তবে দেখতে পাবেন যে, একটা সময় এই দীর্ঘতম খরাও বৃষ্টির শীতল পরশে ভেঙ্গে যেতে পারে। সবুজ সমরোহে প্রাণ ফিরে আসবে সেই শুষ্ক ভূমিতেও। জীবনেও আমরা সেই শুকনো, খরার মতো অনুভব করতে পারি। হয়তো আপনি এমন এক সম্পর্কের মাঝে আছেন যা কঠিন হয়ে উঠছে, কারো উপর হয়তো ভরসা করতে যেয়ে আশাহত হয়েছেন। এক পর্যায়ে আবিষ্কার করলেন এই মিথ্যে আশাই আপনার জীবনকে শুষ্ক ও কঠিন করে তুলছে। আবার অনেক সময় দেখা যায় বারংবার প্রাণান্তকর চেষ্টার পরেও আমরা আমাদের আরাধ্য জিনিস লাভ করতে পারিনি। এই অনুভূতি তখন আমাদের মনে হতাশার উদ্রেক তৈরি করে। তখন হয়তো মনে হতে পারে সামনে আর কোন পথ নেই। সেই আশাহীনতার শুকনো জায়গায় নিজেকে একাকী পথিক মনে হবে। জীবনের এই কঠিন ক্রান্তিলগ্নে হতাশা ঝেড়ে ফেলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে আসুন জেনে নিই কিছু টিপস-
জীবন ক্রমাগত পরিবর্তনশীল
হতাশার অনুভুতি মানে হলো জীবনে আর ভালো কিছু হতে পারে তা কল্পনা করতে না পারা। এই অনুভূতি আপনাকে সবকিছুর অন্ধকার দিকে ধাবিত করে। কিন্তু বাস্তবে কি সব এমনই হয়? জীবন পরিবর্তনশীল, পরিবর্তন অনিবার্য। আমরা যদি বিশ্বাস রাখি এবং ইতিবাচক ও গঠনমূলক কাজের সাথে পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানাই, তাহলে হতাশার এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। কখনো কখনো আমাদের যা করতে হবে তা হল কেবল সময়কে অতিবাহিত করতে দেয়া এবং উদ্ভূত সমস্যাকে বাড়িয়ে না তোলা। জীবনে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে।
অতীতে পার করা কঠিন সময়গুলো স্মরন করা
একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্য দিয়ে চলার সময় ভয়, আত্মসন্দেহ এবং হতাশাবাদী চিন্তা দ্বারা ঘিরে থাকা স্বাভাবিক। যা আমাদের সামনে যেতে বাঁধা সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে একটি সহজ কিন্তু অনেকে কার্যকরী কাজ হলো জীবনের এমন ঘটনাগুলোকে তালিকাবদ্ধ করা যা আমরা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে পার করেছি। পাশাপাশি এগুলো উতরে যখন সফল হওয়ার চিত্রগুলো পাশাপাশি লিখে রাখবেন, তখন দেখবেন নিজের এবং অজানা ভবিষ্যতের প্রতি নতুন বিশ্বাস খুঁজে পাবেন, যা আপনার মাঝে ভয়ের পরিবর্তে এক ভালোলাগা নিয়ে আসতে পারে।
মনের কথা লিখুন
অনেক সময় এমন হয়, এমন কিছু কথা থাকে, কিছু চিন্তা থাকে যা অন্য কারো সাথে শেয়ার করা পসিবল হয় না। এমতাবস্থায় এগুলো লিখে রাখুন। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আপনি কেমন অনুভব করছেন তা সম্পর্কে ডায়েরি লিখুন, যা আপনার আবেগ এবং চিন্তাভাবনাগুলোকে গভীরভাবে খনন করতে সহায়তা করে। চিন্তা, আবেগ মাথায় ঘুরতে না দিয়ে তা শব্দের মধ্যে তুলে ধরুন এবং এটা খুবই থেরাপিউটিক।
সবকিছুই খারাপ ভাবে না দেখা
চলমান ইস্যুতে জুম আউট করুন এবং ফোকাস করুন। সবকিছুই খারাপ ভাবে দেখা একদমই উচিৎ নয়। এটি আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয় এবং এর ভেতরে কোন ইতিবাচক চিত্র যে থাকতে পারে তা দেখতে আমরা ব্যর্থ হই। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, গতিশীল এই জীবনে যা সমস্যাগুলো চলছে এগুলো শুধু উপসেট মাত্র। তাই দুশ্চিন্তা, ভয় ও উদ্বেগকে মনকে ছাপিয়ে বাড়তে দেয়া যাবেনা। এমনকি তা যদি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র যেমন স্বাস্থ্য, সম্পর্ক, কাজ, অর্থ এবং আবেগ বিপর্যস্থ হয়ে যায়, তবুও আমরা বেঁচে আছি এর অর্থ হলো পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ানোর আশা আছে।
উদ্দেশ্যমূলক কিছু খুঁজে নেয়া
আমাদের জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্যের অভাব রয়েছে বলে আমরা সহজেই হতাশা বোধ করি। এমতাবস্থায় যখন উদ্দেশ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলা হয় তখন তা বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। কথায় আছে যতক্ষন শ্বাস, ততক্ষন আশ। তাই জীবনকে উদ্দেশ্যপূর্ণ বোধ করার জন্য আমাদের সকলকে জীবনে কিছু বিশাল মিশন খুঁজে বের করতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিরতি
আমরা বর্তমানে এমন এক সময় পার করছি যেখানে আমাদের সবকিছু প্রযুক্তির কাছে আটকে আছি। আমাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, বিষন্নবোধ সবকিছুর সমাধান আমরা এই সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে খুঁজি। কিন্তু সত্য হলো যে, যখন জীবনে ভালো অনুভব করবেন না তখন এই সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের আরও খারাপ বোধ করতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, এর কোন প্লাস পয়েন্ট নেই। কিন্তু যখন জীবন থমকে যায় তখন মানসিক স্বাস্থ্যকে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এই সোশ্যাল মিডিয়া। এর মাধ্যমে-
* বিষন্নতার মাত্রা বেড়ে যায়
* অন্য মানুষের সাথে নিজের জীবনকে অন্যায়ভাবে তুলনা করতে উৎসাহিত করে
* ঈর্ষা বোধের সৃষ্টি করে
* একাকী বোধ বাড়িয়ে তোলে
সক্রিয় হোন
শারীরিক কার্যকলাপ হতাশার অনুভূতির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আরেকটি দূর্দান্ত হাতিয়ার। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়াম হতাশার জন্য উপকারী হতে পারে এবং ফলস্বরুপ একটি ভালো মেজাজ তৈরি করতে পারে। এটি সকল নেতিবাচক ঝেড়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রদান করতে পারে। এই সক্রিয় হওয়া অনেক ধরনের হতে পারে। তা হতে পারে ব্যায়াম করা কিংবা খেলাধুলা করা। হতে পারে বাগান করাও।
কথা বলুন
নিজের অনুভূতি সম্পর্কে কারো সাথে কথা বলা অবিশ্বাস্যভাবে সহায়ক হতে পারে। এটি কোন বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা থেরাপিস্টের সাথে কথা বলা হোক না কেন, নিজ অনুভূতিগুলো সম্পর্কে কথা বলা বুক থেকে অদৃশ্য এক ভার সরিয়ে নেয়ার একটি দূর্দান্ত উপায় হতে পারে। এই চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতি ভাগ করে নেয়ার মাধ্যমে, তারা আপনাকে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং কিভাবে এগিয়ে যাবেন সে ব্যাপারে পরামর্শ দিতে সক্ষম হতে পারে।
এই তত্ত্বটি বিপরীতমুখী মনে হতে পারে, তবে এটি সত্য যে জীবনের বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলো ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য একটি প্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে। বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা এবং অসন্তোষ আমাদের শিক্ষা দেয় এবং আমাদের বেড়ে উঠার সুযোগ দেয়। জীবনে দুঃখ আছে বলেই আমরা সুখী মুহূর্তের চরম অনুভূতিগুলো ভালোভাবে উপভোগ করতে পারি। আর তখন তাই হয়ে উঠে জীবনের বড় প্রাপ্তি।
লেখা- শায়লা জাহান