যৌন স্বাস্থ্য শুধু শারীরিক সক্ষমতার বিষয় নয়; এটি মানসিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস, সম্পর্কের গুণগত মান এবং পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। অথচ আমাদের সমাজে যৌনতা নিয়ে খোলামেলা ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা এখনো সীমিত। ফলে অনেক পুরুষ ভুল তথ্য, গুজব, পর্নোগ্রাফি কিংবা বন্ধুদের মুখে শোনা গল্পকে সত্য বলে বিশ্বাস করে বড় হন।
এসব ভুল ধারণা শুধু ব্যক্তিগত উদ্বেগই বাড়ায় না, অনেক সময় দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব, অযথা মানসিক চাপ এবং অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার কারণও হয়ে দাঁড়ায়।
আজ আলোচনা করা হলো পুরুষের যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত ১০টি বড় ভুল ধারণা।
১. ‘যৌনক্ষমতাই পুরুষত্বের একমাত্র পরিচয়’
এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর ধারণাগুলোর একটি। একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, দায়িত্ববোধ, সততা, ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষমতা কিংবা সঙ্গীর প্রতি সম্মান—এসবই একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি। যৌনক্ষমতা একজন মানুষের পরিচয়ের মাত্র একটি অংশ, পুরোটা নয়।
২. ‘যত বেশি সময়, তত বেশি সফল যৌনজীবন’
অনেকে মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে যৌনমিলন করাই সাফল্যের প্রমাণ। বাস্তবে যৌনমিলনের কোনো নির্দিষ্ট ‘আদর্শ সময়’ নেই। সন্তুষ্টি নির্ভর করে পারস্পরিক স্বাচ্ছন্দ্য, যোগাযোগ, মানসিক সংযোগ এবং উভয়ের সম্মতির ওপর।
৩. ‘বয়স বাড়লেই যৌনজীবনের সমাপ্তি’
বয়সের সঙ্গে শরীরে কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। তবে সুস্থ জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের মাধ্যমে অনেক মানুষ পরিণত বয়সেও সন্তোষজনক যৌনজীবন উপভোগ করেন।
৪. ‘ইরেকশনে একবার সমস্যা মানেই স্থায়ী অক্ষমতা’
কাজের চাপ, উদ্বেগ, ক্লান্তি, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব কিংবা সাময়িক মানসিক অস্থিরতার কারণে মাঝে মাঝে ইরেকশনে সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সমস্যা যদি বারবার হয় বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৫. ‘সব যৌন সমস্যা ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যায়’
বাজারে নানা ধরনের তথাকথিত শক্তিবর্ধক ওষুধ বা ভেষজ পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। কিন্তু যৌন সমস্যার কারণ হতে পারে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, হরমোনের পরিবর্তন, মানসিক চাপ কিংবা সম্পর্কগত জটিলতা। তাই সঠিক কারণ নির্ণয় ছাড়া ওষুধ গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৬. ‘মাস্টারবেশন সব সময় ক্ষতিকর’
এ নিয়ে বহু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, পরিমিত মাত্রায় এবং ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপনে সমস্যা সৃষ্টি না করলে এটি সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে যদি এটি দৈনন্দিন জীবন, কাজ বা সম্পর্ককে ব্যাহত করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
৭. ‘যৌনরোগ শুধু নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হয়’
যৌনবাহিত সংক্রমণ (এসটিআই) যে কারও হতে পারে, যদি ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ থাকে। নিরাপদ যৌন আচরণ, সচেতনতা এবং প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। লজ্জা বা সামাজিক ভয়ের কারণে অনেক সময় চিকিৎসা নিতে দেরি হয়।
৮. ‘পর্নোগ্রাফিই বাস্তব যৌনজীবনের প্রতিচ্ছবি’
পর্নোগ্রাফি মূলত বিনোদনের জন্য নির্মিত। সেখানে যা দেখানো হয়, তা বাস্তব সম্পর্ক, পারস্পরিক অনুভূতি কিংবা স্বাভাবিক যৌনজীবনের প্রতিফলন নয়। পর্নকে বাস্তবতার মানদণ্ড হিসেবে ধরলে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে।
৯. ‘যৌন সমস্যা নিয়ে কথা বললে সম্মান কমে যায়’
অনেক পুরুষ মনে করেন, যৌন সমস্যা স্বীকার করা দুর্বলতার লক্ষণ। অথচ বাস্তবে প্রয়োজনের সময় চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা কিংবা সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করাই পরিপক্বতার পরিচয়।
১০. ‘যৌন স্বাস্থ্য মানেই শুধু যৌনমিলন’
যৌন স্বাস্থ্য একটি বিস্তৃত বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে মানসিক সুস্থতা, পারস্পরিক সম্মান, সম্মতি, নিরাপত্তা, প্রজননস্বাস্থ্য, সম্পর্কের গুণগত মান এবং নিজের শরীর সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান। একটি সুস্থ যৌনজীবনের ভিত্তি শুধু শারীরিক সক্ষমতা নয়; বরং বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং দায়িত্বশীল আচরণ।
যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা, লজ্জা এবং ভুল ধারণা—এই তিনটি বিষয় এখনো অসংখ্য পুরুষকে অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপে রাখে। অথচ সঠিক তথ্য, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে।
একজন প্রকৃত সহযাত্রী সেই মানুষ, যিনি নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন, সঙ্গীকে সম্মান করেন, প্রয়োজন হলে সাহায্য নিতে দ্বিধা করেন না এবং যৌনতাকে কখনোই ক্ষমতার প্রদর্শন নয়; বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস ও দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখেন।
রোদসী বলতে চায় ‘যৌন স্বাস্থ্য লজ্জার নয়, সচেতনতার বিষয়। আর একজন পরিণত পুরুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জ্ঞান, দায়িত্ববোধ এবং সঙ্গীর প্রতি সম্মান।’
সাবিনা ইয়াসমীন
সম্পাদক ও প্রকাশক, রোদসী