সবসময় নিজেকে দোষ দেওয়া, বিপদের আশঙ্কায় থাকা কিংবা প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়—এসব কি শুধুই স্বভাব? নাকি দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাতের প্রভাব?
একজন নারী হয়তো দিনের পর দিন সংসার, সন্তান, চাকরি কিংবা সম্পর্কের দায়িত্ব সামলে যাচ্ছেন। বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিক, আত্মবিশ্বাসী এবং শক্ত মনে হতে পারে। অথচ ভেতরে ভেতরে তিনি হয়তো লড়ছেন ভয়, অপরাধবোধ, অস্থিরতা কিংবা নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলার সঙ্গে।
দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন, অবহেলা, পারিবারিক সহিংসতা, শৈশবের আঘাত, সম্পর্কের ট্রমা কিংবা বারবার ঘটে যাওয়া কোনো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ট্রমার সঙ্গে Complex Post-Traumatic Stress Disorder বা CPTSD-এর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—নিচের কোনো একটি বা একাধিক লক্ষণ থাকলেই যে কারও CPTSD হয়েছে, এমন নয়। সঠিক মূল্যায়নের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ প্রয়োজন।
১. নিজের ওপর বিশ্বাস কমে যাওয়া
আগে যে কাজটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করতেন, সেটিও করতে গিয়ে মনে হতে পারে—‘আমি পারব তো?’ নিজের সিদ্ধান্ত, যোগ্যতা কিংবা সামর্থ্য নিয়ে ক্রমাগত সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাত একজন মানুষকে নিজের মূল্য নিয়েই প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে।
২. আবেগ সামলাতে কষ্ট হওয়া
রাগ, কান্না, ভয় কিংবা হতাশা—কোনো আবেগই যেন স্বাভাবিক মাত্রায় আটকে রাখতে পারছেন না। ছোট কোনো ঘটনাতেও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া হতে পারে, আবার কখনো অনুভূতিহীন বা অসাড়ও মনে হতে পারে।
৩. সবসময় ক্লান্ত বা শরীর খারাপ লাগা
মানসিক চাপের প্রভাব শুধু মস্তিষ্কে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের কারণে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি, শরীর ভার লাগা বা বিভিন্ন শারীরিক অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।
‘বিশ্রাম নিয়েও কেন ভালো লাগছে না?’—এই প্রশ্নটি তখন খুব পরিচিত হয়ে ওঠে।
৪. সবসময় বিপদের আশঙ্কায় থাকা
চারপাশে বাস্তবে কোনো বিপদ না থাকলেও মনে হতে পারে, ‘কিছু একটা খারাপ ঘটতে যাচ্ছে।’
ফোন না ধরলে প্রিয় মানুষের কিছু হয়েছে কি না, বাইরে গেলে দুর্ঘটনা হবে কি না, সামান্য কোনো পরিবর্তন থেকেও বড় বিপদের আশঙ্কা—এ ধরনের অতিরিক্ত সতর্কতা মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর হতে পারে।
৫. সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা
অনেকের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা সহ্য করা কঠিন হয়ে যায়। তাই পরিস্থিতি, মানুষ কিংবা ভবিষ্যৎকে যতটা সম্ভব নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা দেখা দিতে পারে।
কারণ ভেতরে কোথাও হয়তো কাজ করে—‘আমি যদি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখি, তাহলে আর খারাপ কিছু ঘটবে না।’
৬. নিজেকে সবসময় দোষ দেওয়া
কোনো ঘটনা নিজের কারণে না ঘটলেও মনে হতে পারে, ‘আমারই ভুল ছিল।’
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, কারও রাগ, পরিবারের সমস্যা—সবকিছুর দায় নিজের ওপর নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ধীরে ধীরে অপরাধবোধ আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
৭. প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়
সম্পর্ক ভালো থাকার পরও মনে হতে পারে, এই মানুষটি একদিন ছেড়ে চলে যাবেন।
ফলে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, বিচ্ছেদের ভয়, বারবার আশ্বাস চাওয়া কিংবা সম্পর্কের ছোট পরিবর্তন নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ার মতো আচরণ দেখা দিতে পারে।
৮. নিজেকে বা চারপাশকে অচেনা মনে হওয়া
কখনো নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা মনে হতে পারে। আবার পরিচিত জায়গা, মানুষ কিংবা পরিস্থিতিও অস্বাভাবিক বা অপরিচিত বলে মনে হতে পারে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা মানসিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে এবং তা ভয়ংকর মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
৯. অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজেকে ভুলে যাওয়া
সবাইকে খুশি রাখতে হবে—এই চাপ অনেকের জীবনে এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নিজের প্রয়োজন, ইচ্ছা কিংবা সীমারেখার কথা ভুলে যান।
‘না’ বলতে না পারা, অন্যের মন খারাপ হওয়ার ভয় কিংবা নিজের কষ্ট লুকিয়ে অন্যকে ভালো রাখার চেষ্টা—এসবও দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
১০. বিশ্রাম নিলেও অস্বস্তি থাকা
ছুটির দিন, অবসর কিংবা বিছানায় শুয়ে থাকার সময়ও যদি মনে হয় কিছু একটা করা উচিত, বিপদ আসতে পারে বা নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না—তাহলে শরীর বিশ্রাম পেলেও মন হয়তো বিশ্রাম পাচ্ছে না।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের পর মস্তিষ্ক যেন সবসময় ‘সতর্ক অবস্থায়’ থাকার অভ্যাস করে ফেলতে পারে।
শক্ত থাকার আড়ালেও থাকতে পারে কষ্ট
আমাদের সমাজে নারীর ওপর দায়িত্ব অনেক। পরিবার সামলানো, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সন্তান, সম্পর্ক—সবকিছু সামলে একজন নারী যখন বলেন, ‘আমি ভালো আছি’, তখন সেই কথাটিকে সবসময় তার প্রকৃত মানসিক অবস্থার সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি ধরে নেওয়া যায় না।
কখনো কখনো অতিরিক্ত দায়িত্বশীলতা, সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা কিংবা সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতার পেছনেও থাকতে পারে দীর্ঘদিনের ভয় ও অনিরাপত্তা।
তাই কোনো নারী যদি বারবার নিজেকে দোষ দেন, সবসময় বিপদের আশঙ্কায় থাকেন, নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনেও অস্বস্তি অনুভব করেন—তাকে ‘বেশি ভাবেন’, ‘দুর্বল’ বা ‘নাটক করছেন’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে তার কথা শোনা জরুরি।
মানসিক কষ্টও কষ্ট। আর দীর্ঘদিনের কষ্টেরও যত্ন ও চিকিৎসা প্রয়োজন।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি?
যদি এসব অনুভূতি দীর্ঘদিন ধরে থাকে এবং তা ঘুম, কাজ, পড়াশোনা, সম্পর্ক কিংবা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে, তাহলে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
নিজের মধ্যে লক্ষণ খুঁজে পাওয়া মানেই নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা নয়। বরং সেটি হতে পারে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে একটু মনোযোগ দেওয়ার সংকেত।
সূত্র: রিস্টার্ট সাইকোলজি