রাজা দ্বিতীয় হিয়েরো এক কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়েছিলেন। রাজার সন্দেহ, তাঁর সোনার মুকুট তৈরির সময় স্বর্ণের বদলে অন্য ধাতু মেশানো হয়েছে। কিন্তু মুকুট না ভেঙে সেটি পরীক্ষা করবেন কীভাবে? এর সমাধানের গুরুদায়িত্ব পড়ে সেরা গণিতবিদ আর্কিমিডিস এর উপর।
প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, গোসল করতে গিয়ে আর্কিমিডিস লক্ষ করেন, পানিতে শরীর ডোবালে পানির স্তর বেড়ে যায়। এই পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি মুকুটের আয়তন নির্ণয়ের উপায় বুঝতে পারেন। আনন্দে তিনি নাকি , “ইউরেকা! ইউরেকা!” বলে গোসলখানা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে গেলেন।
অন্যদিকে, গাছ থেকে একটি আপেলের পড়ে যাওয়া দেখে মহাকর্ষ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছিলেন আইজ্যাক নিউটন। আর রসায়নবিদ অগাস্ট কেকুলে বেনজিনের গঠন নিয়ে ভাবতে গিয়ে স্বপ্নের মধ্যে পেয়েছিলেন বলয়াকার গঠনের একটি চিত্র।
তিনটি ভিন্ন গল্প, তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতি। কিন্তু এগুলোর মধ্যে একটি সাদৃশ্য আছে, নতুন ধারণার জন্ম সব সময় আমাদের প্রত্যাশিত মুহূর্তে হয় না। কখনো পরিচিত কোনো দৃশ্য, কখনো দীর্ঘদিনের চিন্তার মধ্যে হঠাৎ তৈরি হওয়া সংযোগ আমাদের নতুন পথ দেখায়।
তাহলে কি দারুণ আইডিয়া পেতে হলে সব সময় মাথা খাটিয়ে যেতে হবে? নাকি কখনো কাজ থামিয়ে, ফোন সরিয়ে রেখে, নিজের মতো করে ভাবার অবকাশ দেওয়াও জরুরি?
বিখ্যাত সাংবাদিক ও পডকাস্টার মানোশ জোমোরোদি তাঁর "কীভাবে একঘেয়েমি আপনার সবচেয়ে উজ্জ্বল ধারণার জন্ম দিতে পারে" (How Boredom Can Lead to Your Most Brilliant Ideas) শিরোনামে আলোচিত বক্তব্যে , ঠিক এই বিষয়টিই তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, প্রতিটি মুহূর্তকে ব্যস্ততায় ভরে রাখলে আমরা নিজের মতো করে ভাবার মূল্যবান অবকাশটুকু হারিয়ে ফেলতে পারি। আর কখনো কখনো সেই অবকাশই নতুন ধারণা তৈরির সুযোগ করে দেয়।
কেন এই বিষয়টা এত গুরুত্বপূর্ণ?
মানোশ জোমোরোদি তাঁর জীবনের খুব সুন্দর একটা উদাহরণ দেন। ২০০৭ সালে যখন তাঁর ছেলের জন্ম হয়, ঠিক তার তিন সপ্তাহ পরেই বাজারে আসে প্রথম আইফোন। সন্তানকে সামলাতে গিয়ে দিনের পর দিন তাকে হাঁটতে হতো ব্রুকলিনের রাস্তায়। প্রথম প্রথম খুব বিরক্ত লাগলেও, একটা সময় তিনি বুঝতে পারলেন—এই একঘেয়ে হাঁটার সময়েই তার মাথায় আসে চমকপ্রদ সব আইডিয়া!
একদিকে নতুন মা হিসেবে সন্তানের যত্ন নেওয়া, অন্যদিকে সাংবাদিকতার কাজ; দুই সামলাতে গিয়ে স্মার্টফোন তাঁর কাছে হয়ে ওঠে সুবিধার একটি মাধ্যম। সন্তানকে নিয়ে হাঁটছেন, একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখছেন; কোথাও অপেক্ষা করছেন, সাথে সকল আপডেট নিচ্ছেন; অবসর পেলেই ফোনে চোখ রাখছেন। শুরুতে মনে হয়েছিল, প্রযুক্তি তাঁকে আরও দক্ষ করে তুলছে।
একসময় পডকাস্টের শ্রোতাসংখ্যা বাড়ানোর জন্য নতুন আইডিয়া বের করতে বসে তিনি দেখলেন, মাথায় আর কোনো নতুন ভাবনা আসছেই না। অথচ এর আগে স্ট্রলার ঠেলে হাঁটার সময়ই তাঁর মাথায় এসেছিল বেশ কিছু ভালো ধারণা।
আর তখনই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—আগে যে সময়টুকুতে অনায়াসে চিন্তা আসত, সেটি কি আমরা নিজেরাই মুছে ফেলছি?
এই অভিজ্ঞতা তাঁকে একঘেয়েমি ও মস্তিষ্কের কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করতে আগ্রহী করে তোলে। তিনি কথা বলেন স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে। সেখান থেকেই উঠে আসে তাঁর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—"ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক"।
কিছু না করলেও মস্তিষ্ক কি কাজ করে?
শুনতে একটু অদ্ভুত লাগলেও, বাইরে থেকে কোনো কাজ না করার অর্থ এই নয় যে মস্তিষ্কও নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। জোমোরোদি নিউরোসায়েন্টিস্ট এবং কগনিটিভ সাইকোলজিস্টদের সাথে কথা বলে জানলেন এক অসাধারণ তথ্য। স্নায়ুবিজ্ঞানে ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (DMN) নামে মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলের একটি কার্যকরী নেটওয়ার্কের কথা বলা হয়। সহজ ভাষায়, আমরা যখন বাইরের কোনো নির্দিষ্ট কাজের দিকে পুরো মনোযোগ দিচ্ছি না, তখন আমাদের মস্তিষ্কের এই বিশেষ নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই, যখন আমরা কাপড় ভাঁজ করি বা হেঁটে কাজে যাই, তখন আমাদের শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকে, কিন্তু আসলে ঠিক তখনই আমাদের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
এই সময়ে আমাদের দেহ অটোপাইলটে চলে, কিন্তু মস্তিষ্ক কিন্তু ঘুমায় না! বরং তখন মস্তিষ্ক নতুন নতুন নিউরাল কানেকশন তৈরি করে, আলাদা আলাদা আইডিয়াকে জোড়া লাগায় এবং সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করে। এটাই সেই সময় হয় যখন পুরোনো কোনো স্মৃতি মনে করা, ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনা করা, নিজের জীবন সম্পর্কে ভাবা কিংবা কোনো সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে মনে মনে নাড়াচাড়া করা হয়। এসব মানসিক প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের 'ডিফল্ড মোড নেটওয়ার্ক' -এর ভূমিকা থাকতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হলো—আমরা কিছু না করে কখনো বসে থাকিনা। প্রতি ৪৫ সেকেন্ড অন্তর আমাদের মনোযোগ এক জিনিস থেকে অন্য জিনিসে সরে যায়। ফোনের নোটিফিকেশন, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং—সব মিলিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক কখনোই সেই "ডিফল্ট মোড"-এ যাওয়ার সুযোগ পায় না!
"বোরড এন্ড ব্রিলিয়ান্ট" চ্যালেঞ্জ
এই সমস্যার সমাধানে জোমোরোদি তার শ্রোতাদের নিয়ে শুরু করলেন একটি সাত দিনের চ্যালেঞ্জ, "Bored and Brilliant: The Lost Art of Spacing Out"। লক্ষ্য ছিল খুব সহজ। দিনের খালি সময়গুলোতে ফোন ব্যবহার কমানো এবং এর প্রভাব মূল্যায়ন করা।
২০১৫ সালে প্রায় ২০,০০০ মানুষ এই চ্যালেঞ্জে যোগ দেন। প্রতিদিন একটি করে টাস্ক দেওয়া হতো, যেমন—সবচেয়ে আসক্তিকর অ্যাপটি ডিলিট করা, ছবি তোলা ছাড়া একটি দিন কাটানো, বা লিফটে-এস্কেলেটরে ফোন না বের করা।
ফলাফল? অবাক করার মতো! অংশগ্রহণকারীরা গড়ে প্রতিদিন মাত্র ৬ মিনিট স্ক্রিন টাইম কমাতে পেরেছিল (চ্যালেঞ্জের আগে যা ছিল প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট)। কিন্তু এই সামান্য সময়টাই তাদের মানসিকতায় বিশাল পরিবর্তন আনে।
অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছিলেন, ফোন থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে তারা চারপাশের পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পেরেছেন। তারা আরও বেশি সময় পাচ্ছেন ভাবার জন্য, ভালো ঘুম হচ্ছে, এবং আরও খুশি বোধ করছেন। একজন অংশগ্রহণকারী এক কথায় বলেছিলেন—"আমি যেন মানসিক হাইবারনেশন থেকে জেগে উঠেছি"।
এছাড়াও অলস সময়ে ফোন না ঘাঁটার কারণে বহু মানুষ দীর্ঘদিন পর নতুন ডায়েরি লেখা, ছবি আঁকা বা কোনো আটকে থাকা প্রজেক্টের আইডিয়া খুঁজে পাওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন।
একঘেয়েমি মানেই কি সৃজনশীলতা?
এতো কথার ভিড়ে তাহলে সারমর্ম হিসেবে কি বলা যায় যে, একঘেয়েমি যদি নতুন ভাবনার সুযোগ তৈরি করে, তাহলে কি বেশি বসে থাকা বা নিষ্ক্রিয় থাকা মানেই বেশি সৃজনশীল হওয়া?
উত্তরটি এত সরল নয়।
একঘেয়েমি কখনো আমাদের পরিচিত কাজের বাইরে কিছু ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে। আবার কখনো তা হতাশা, ক্লান্তি ও অনাগ্রহ তৈরি করে।
তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?
- গঠনমূলক অবসর:
কিছুক্ষণের জন্য ফোন সরিয়ে রাখা, হাঁটা, জানালার বাইরে তাকানো বা কোনো সহজ দৈনন্দিন কাজ করা। এতে নিজের চিন্তা শোনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
- অনুৎসাহজনক একঘেয়েমি:
কোনো কাজের অর্থ খুঁজে না পাওয়া, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা এমন পরিস্থিতিতে আটকে থাকা, যেখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। এই ধরনের পরিস্থিতি সৃজনশীলতার বদলে মানসিক অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
২০২৪ সালে সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় শিক্ষাক্ষেত্রে একঘেয়েমি ও সৃজনশীলতার সম্পর্ক নিয়ে ২৭টি গবেষণার ফল বিশ্লেষণে ইতিবাচক, নেতিবাচক, পরস্পরবিরোধী এবং তাৎপর্যহীন—বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তাই একঘেয়েমিকে সৃজনশীলতার জাদুকরি উপাদান ভাবার সুযোগ নেই। বরং একে এমন একটি পরিস্থিতি হিসেবে দেখা যায়, যা কখনো মনকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ দিতে পারে।
সৃজনশীলতা বাড়াতে কী করতে পারেন?
মানোশ জোমোরোদি-র বক্তব্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কয়েকটি সহজ অভ্যাস নিজেদের মধ্যে তৈরি করা যায়। এগুলো সৃজনশীলতার নিশ্চয়তা নয়; বরং নিজের চিন্তার জন্য কিছুটা জায়গা করে দেওয়ার উপায়মাত্র:
- প্রতিটি অপেক্ষার মুহূর্তে ফোন বের করবেন না
- মাঝেমধ্যে নীরবে হাঁটুন। কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে আটকে গেলে এই বিরতিতে চিন্তা নতুন দিকে যেতে পারে।
- দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও অবসর খুঁজুন
- আইডিয়া এলে লিখে রাখুন। প্রতিটি ভাবনাকে সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় পরিণত করার প্রয়োজন নেই।
প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা, মানোশ জোমোরোদি'র বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রযুক্তির সচেতন ব্যবহার শেখানোই তাঁর মূল লক্ষ্য। প্রতিদিন কিছুটা সময় নোটিফিকেশন ও স্ক্রিন থেকে দূরে থেকে মস্তিষ্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুক্ষণের জন্য "স্পেসিং আউট" বা অলসভাবে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দিতে হয়। কারণ, সব সময় নতুন কিছু গ্রহণ করাই শেখার একমাত্র উপায় নয়। কখনো কখনো যা কিছু জানি, তা নিয়ে নিজের মতো করে ভাবার অবকাশও প্রয়োজন। আর সেই অবকাশেই হয়তো পরিচিত কোনো বিষয়কে নতুন চোখে দেখার সুযোগ তৈরি হবে।