মনোবিজ্ঞানী গাই উইঞ্চ এক আলোচনায় তাঁর এক পেশেন্টের গল্প শেয়ার করেছিলেন। ক্যাথি, যিনি ছোটবেলা থেকেই বিয়ে করে সুন্দর এক সংসার করার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু ২৭ বছর বয়সে এসে জীবনে সেই ‘স্পেশাল’ মানুষটির দেখা না পেলেও, ক্যান্সারের মতো কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। কেমোথেরাপি আর যন্ত্রণাদায়ক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে একবার নয়, দুবার ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছিল ক্যাথিকে।
তারপর একসময় তাঁর জীবনে এল রিচ।
রিচের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল ক্যাথির কাছে
বিশেষ কিছু। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, ভালোবাসা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি করা নানা স্বপ্ন—সবকিছু মিলিয়ে তিনি
বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, এবার বুঝি জীবনের সেই কাঙ্ক্ষিত অধ্যায়টি শুরু হতে যাচ্ছে।
এমনকি একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, রিচ হয়তো তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন।কিন্তু সেই দিনটি অন্যরকম হয়ে এলো।
বিয়ের প্রস্তাব নয়, রিচ সেদিন ক্যাথির সঙ্গে
সম্পর্ক শেষ করে দিলেন। এক মুহূর্তে ক্যাথির সামনে থেকে যেন ভবিষ্যতের
পুরো ছবিটাই মুছে গেল।
বিচ্ছেদের পাঁচ মাস পরও তিনি সেই মানুষটিকে
মন থেকে সরাতে পারছিলেন না। বারবার তাঁর কথা মনে পড়ছিল, ফিরে আসছিল পুরোনো স্মৃতি।
আর নিজের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই প্রশ্ন—“কেন?”
আর এখানেই গাই উইঞ্চের মূল প্রশ্নটি সামনে
আসে—একজন মানুষ, যিনি
এত বড় শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় সামলে উঠতে পেরেছেন, সেই একই মানসিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে
কেন তিনি একটি হার্টব্রেক থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না? কেন আমাদের মধ্যে অনেকেই হৃদয়ভঙ্গের
যন্ত্রণা থেকে সেরে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে হোঁচট খাই?
কেন একজন মানুষকে হারানোর পরও আমরা বারবার
তাঁর কাছেই ফিরে যাই—স্মৃতিতে, ছবিতে, পুরোনো কথোপকথনে, এমনকি নিজের কল্পনার ভেতরেও?
আসলে হার্টব্রেক শুধু মন খারাপের নাম নয়।
হৃদয়ের যন্ত্রণা শারীরিক ব্যথার মতই কঠিন ও বাস্তব। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো,
এই ব্যথা সারতে গিয়ে আমরা অনেক সময় এমন কিছু করি, যা ব্যথাটাকেই আরও বাড়িয়ে দেয়।
তাই মানুষটা চলে গেলেও মন কেন থেকে যায় তার
কাছেই—এই প্রশ্নের উত্তর
খুঁজতে হলে আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে।
কেন বারবার তার কাছেই ফিরে যাই?
জীবনের সব ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলায় যে
কৌশলগুলো আমাদের সাহায্য করে, হৃদয় ভাঙলে সেই একই কৌশল কেন এত বাজেভাবে ব্যর্থ হয়,
কখনো ভেবে দেখেছেন কি?
ব্রেকআপের পর সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রবণতাগুলোর
একটি হলো উত্তর খোঁজা। কেন সম্পর্কটা শেষ হলো? কোথায় ভুল হয়েছিল? সে কি সত্যিই আমাকে
ভালোবাসত? অন্য কেউ কি এসেছে? আবার কি ফিরে আসবে?
মনে হয়, প্রশ্নগুলোর উত্তর পেলেই বুঝি কষ্টটা
কমে যাবে। হৃদয়ভাঙ্গা এতটাই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা তৈরি করে যে, আমাদের মন বলে এর
কারণটিও নিশ্চয়ই সমানভাবে তীব্র। আর এই সহজাত প্রবৃত্তি এতটাই শক্তিশালী যে, এটি অনেক
যুক্তিবাদী ও সংযত মানুষটিকেও বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়।
কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর কখনোই পাওয়া যায়
না। আর কিছু উত্তর পেলেও তা হয়তো আমাদের মনকে শান্ত করবে না।
বরং একই ঘটনা বারবার মনে করার অভ্যাস আমাদের
সেই মানুষটির সঙ্গে মানসিক যোগাযোগটা ধরে রাখতে পারে। পুরোনো মেসেজ পড়া, ছবি দেখা,
তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘাঁটা—সবকিছুই যেন সাময়িকভাবে তাকে কাছে পাওয়ার
অনুভূতি দেয়। কিন্তু সেই সাময়িক স্বস্তির পর কষ্টটা আবার ফিরে আসে।
অর্থাৎ আমরা হিলিং এর চেষ্টা করতে গিয়ে কখনো
কখনো নিজেদের ক্ষতটাই বারবার খুলে দেখি।
তাই সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর প্রথম কাজগুলোর
একটি হতে পারে, নিজেকে সেই পুরোনো অভ্যাসগুলো থেকে একটু দূরে রাখা। কারণ সবকিছু জানতে
হবে না। সব প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া জরুরি নয়। কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়াটাও মেনে
নিতে হয়।
হৃদয়ভঙ্গ আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি
মারাত্মক। আর এর পেছনে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে, যেজন্য আমরা একের পর এক গোলকধাঁধায়
জড়িয়ে পড়ি, আর বারবার সেই মানুষটির কাছেই ফিরে যাই—এমনকি যখন জানি,
এতে আমাদের কষ্ট আরও বাড়বে।
মস্তিষ্কের গবেষণায় দেখা গেছে, রোমান্টিক
ভালোবাসা হারানোর সময় মস্তিষ্কে এমন কিছু প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়, যা কোকেন বা ওপিওয়েডের
মতো মাদকাসক্তদের মাদক থেকে সরে আসার সময়ও দেখা যায়। অর্থাৎ প্রিয় মানুষটিকে হারানোর
যন্ত্রণা অনেকটা নেশা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো।
যে মানুষটি একসময় ছিল আমাদের ভালো লাগার
প্রধান উৎস, তাকে না পেয়ে অবচেতন মন তাই তার স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরে। পুরোনো ছবি, কথোপকথন,
একসঙ্গে কাটানো মুহূর্ত—এসব হয়ে ওঠে যেন সেই হারানো নেশা’র বিকল্প।
মাদকাসক্ত মানুষ জানেন যে তারা আসক্ত। কখন
তিনি নেশা করছেন। কিন্তু হৃদয়ভঙ্গের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না যে, স্মৃতিচারণ,
বারবার মেসেজ লেখা কিংবা প্রাক্তনের সোশ্যাল মিডিয়া অনুসরণ করাও সেই একই আসক্তিকে আরও
শক্তিশালী করছে। এতে মানসিক যন্ত্রণাটাই আরও গভীর হচ্ছে এবং আরোগ্যলাভের প্রক্রিয়াকে
আরও জটিল করে তুলছে।
তাই তাগিদ যতই প্রবল হোক, প্রতিবার তার কাছে
ফিরে তাকানো মানে ক্ষতটাকে আবারও ছুঁয়ে দেখা। এতে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু
দীর্ঘমেয়াদে মানসিক যন্ত্রণা আরও গভীর হয় এবং সুস্থ হয়ে ওঠার পথও দীর্ঘ হয়ে যায়।
ভালো স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায় বাস্তবতা-
হৃদয়ভঙ্গ এক দক্ষ কারসাজি। সেরে ওঠার জন্য
আমাদের যা করা দরকার, আমাদের মনকে তার ঠিক উল্টোটা করতে বাধ্য করার ক্ষমতা সত্যিই অসাধারণ।
ব্রেকআপের পর আমাদের মধ্যে আরেকটি যে প্রবণতা দেখা যায় তা হল আশ্চর্যভাবে সম্পর্কের
ভালো সময়গুলোর কথা বেশি মনে পড়া!
ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার হাসির কথা, সে আমাদের
কতটা ভালো অনুভব করাতো, তার সাথে কাটানো সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে করি।
কিন্তু সম্পর্কের খারাপ সময়গুলো?
সেগুলো যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। এসব
করে কেবল আমাদের হারানোর বেদনা আরও বেড়ে যায়। আমরা তা জানি। তবুও আমরা আমাদের মনকে
একের পর এক সেরা স্মৃতিগুলো মনে করতে দিই।
এ কারণেই সম্পর্কের বাস্তব চিত্রটি মনে রাখতে
হবে। শুধু সুন্দর মুহূর্ত নয়, যে বিষয়গুলো সম্পর্কটিকে কঠিন করে তুলেছিল সেগুলোও মনে
করতে হবে।
কারণ মন ভাঙার সময় আমরা প্রায়ই পুরো মানুষটিকে
মনে করি না; মনে করি তার সবচেয়ে সুন্দর সংস্করণটিকে। আর তখন মনে হয়, “ওর মতো কাউকে
আর কখনো পাব না।”
হয়তো সত্যিই পাব না। কারণ প্রত্যেক মানুষই
আলাদা। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেই মানুষটিই ছিল আমাদের জন্য একমাত্র সম্ভাব্য সুখের
উৎস।
সম্পর্ক শেষ হলে জীবনের ছন্দে তৈরি হয় অনেকগুলো
'এম্পটি স্পেস'-
একটি সম্পর্ক শেষ হওয়া মানে শুধু একজন মানুষের
চলে যাওয়া নয়, সাথে হারিয়ে যায় প্রতিদিন কথা বলার অভ্যাস, একসঙ্গে ঘোরার জায়গা, ভবিষ্যৎ
নিয়ে তৈরি করা পরিকল্পনা, মানসিক সাপোর্ট, ঘরের কিছু জিনিস, ছবি, স্মৃতি; এমনকি প্রতিদিনকার
জীবনের একটি ছন্দ।
সম্পর্ক শেষ হলে শুধু অতীতটা শেষ হয় না, ভেঙে যায় ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা স্বপ্নও। যে বাড়িতে একসঙ্গে থাকার কথা ছিল, যে ভ্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, যে জীবনটা দুজন মিলে কল্পনা করেছিলাম—হঠাৎ সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে যায়।
তাই কখনো কখনো আমরা মানুষটিকে যতটা না মিস
করি, তার চেয়েও বেশি মিস করি সেই ভবিষ্যৎটাকে, যেটা আর কখনো বাস্তব হবে না।
দীর্ঘ সম্পর্কের আরেকটি অদৃশ্য ক্ষতি হলো
নিজের পরিচয়ের কিছু অংশ হারিয়ে ফেলা।
একসময় সবকিছুতেই ছিল “আমরা”। আমাদের জায়গা, আমাদের বন্ধু, আমাদের পরিকল্পনা,
আমাদের ভবিষ্যৎ। সম্পর্কটা শেষ হওয়ার পর হঠাৎ সামনে দাঁড়ায় একটা প্রশ্ন— “তাহলে আমি কে?”
এই 'আমরা' থেকে হঠাৎ করে 'আমি'- এর প্রত্যাবর্তন,
মনে হয় জীবনের একটা বিশাল অংশ হঠাৎ খালি হয়ে গেছে।
উত্তরণের উপায়- হৃদয়ভঙ্গ কাটিয়ে ওঠা কোনো যাত্রা নয়।
এটা একটা লড়াই, এবং আপনার যুক্তিই আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। বিচ্ছেদের এমন
কোনো ব্যাখ্যা নেই যা আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারে, এমন কোনো যুক্তি নেই যা আপনার কষ্ট
দূর করতে পারে। তাই কোনো যুক্তির খোঁজ করবেন না, কোনোটির জন্য অপেক্ষাও করবেন না, আপনাকে
যা দেওয়া হয়েছে তা-ই মেনে নিন অথবা নিজেই একটা বানিয়ে নিন এবং তারপর প্রশ্নটির নিষ্পত্তি
করুন, কারণ এই আসক্তিকে প্রতিহত করার জন্য আপনার এই সমাপ্তিটা প্রয়োজন।
- আরও একটি জিনিসের প্রয়োজন। আর তা হল ছেড়ে
দেওয়ার মানসিকতা। এটা মেনে নিতে হবে যে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। অন্যথায়, আপনার মন
আপনার আশাকে পুঁজি করে আপনাকে পিছিয়ে দেবে। যখন হৃদয় ভেঙে যায়, তখন আশা অবিশ্বাস্যভাবে
ধ্বংসাত্মক হতে পারে।
- আমার আমি'কে আবার খুঁজে নেয়া। একসময় যে
মানুষটি আপনাকে সংজ্ঞায়িত করত, তার বাইরে নিজের একটা পরিচয় তৈরি করুন। যে গানটা শুনতে
ভালো লাগত, আবার শুনুন। যে বন্ধুর সঙ্গে অনেকদিন কথা হয়নি, যোগাযোগ করুন। যে কাজটা
সম্পর্কের কারণে ছেড়ে দিয়েছিলেন, সম্ভব হলে ফিরে যান।
কারণ হিলিং মানে শুধু তাকে ভুলে যাওয়া নয়,
হিলিং মানে নিজের কাছে আবার ফিরে আসা।
- আমরা প্রায়ই বলি, “সময় গেলে সব ঠিক হয়ে
যাবে।” সময় অবশ্যই সাহায্য
করে। কিন্তু শুধু সময়ের গতি বাড়িয়ে দিয়ে কিংবা ক্যালেন্ডারের পাতা বদলালেই মন ভালো
হয়ে যায় না। কিছু ক্ষত সারাতে আমাদেরও কাজ করতে হয়। পুরোনো ছবি সরাতে হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায়
অকারণে তার দেখা বন্ধ করতে হয়, নিজেকে বারবার
একই প্রশ্ন করা বন্ধ করতে হয়, সম্পর্কটাকে বাস্তবভাবে দেখতে হয়, নিজের চারপাশের মানুষগুলোর
কাছে ফিরতে হয়, নতুন অভ্যাস তৈরি করতে হয়।
- কষ্ট পাওয়ার জন্য নিজেকে দোষী মনে করার
দরকার নেই। কাউকে হারিয়ে কষ্ট পাওয়া দুর্বলতা নয়। কাউকে ভালোবেসে তাকে হারানোর পর কিছুদিন
ভেঙে পড়াও অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই কষ্টের ভেতরেই যদি আমরা আটকে যাই, তখন নিজের দিকে
হাত বাড়াতে হয়।
হয়তো একদিন হঠাৎ বুঝবেন, অনেকদিন তার প্রোফাইল
দেখেননি, তার প্রিয় গানটা শুনেও আর বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠেনি, পুরোনো ছবিটা দেখেছেন, কিন্তু
চোখে পানি আসেনি। এর কারণ হচ্ছে, মানুষটা আপনার জীবনের একটা অধ্যায় ছিল, পুরো বইটা
নয়। হয়তো সেদিনই বুঝবেন, হৃদয়টা আসলে ভেঙে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি।
কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সেই সম্পর্ক
থেকে পাওয়া শিক্ষা থেকে যায়। আর কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর আমরা ধীরে ধীরে এমন একজন
মানুষ হয়ে উঠি, যাকে আগে চিনতামই না। নিজের আরও শক্ত, আরও স্বাধীন, আরও পরিণত একটি
সংস্করণ। হৃদয়ভঙ্গ কাটিয়ে ওঠা কঠিন, কিন্তু যদি আপনি নিজের মনের দ্বারা বিভ্রান্ত
না হয়ে পদক্ষেপ নেন, তবে আপনি আপনার কষ্টকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারেন।
তাই মন ভাঙার পর লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু তাকে ভুলে
যাওয়া নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত—
নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়া। কারণ মানুষটি চলে যেতে পারে। সম্পর্কটি শেষ
হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনার জীবন? সেটা এখনও বাকি।
ঢাকা/টিএ