ফিরে দেখা ৮০-এর দশক। কিছু সময় ক্যালেন্ডার থেকে চলে যায়, কিন্তু মানুষের মন থেকে কখনো চলে যায় না। ৮০-এর দশক তেমনই এক সময়—যে সময়ের রঙ আজও অনেকের স্মৃতিতে মলিন হয়নি।
তখন জীবন এত দ্রুত ছুটত না। হাতে স্মার্টফোন
ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে মানুষ
একে অন্যের অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল।
একটা বিকেলই তখন ছিল অনেক বড় আনন্দ। স্কুল ছুটির পর ব্যাগটা একপাশে রেখে ছুটে
যাওয়া পাড়ার মাঠে।
কারও হাতে ব্যাট, কারও হাতে বল, কেউ আবার শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, দূর থেকে মায়ের
ডাক—“এই, বাড়ি আয়!”
আর একটু খেলতে ইচ্ছে করলেও শেষ পর্যন্ত ফিরতেই
হতো।
একটা ক্যাসেটের কত গল্প!
৮০-এর দশকের বিনোদনের জগতে ক্যাসেট ছিল যেন
এক ছোট্ট জাদুর বাক্স। পছন্দের শিল্পীর নতুন গান এসেছে,এই খবরটাই
ছিল আনন্দের। ক্যাসেট কিনে এনে সাবধানে রেকর্ডার বা ক্যাসেট
প্লেয়ারে ঢোকানো। তারপর গান বাজছে, আর সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে।
কখনো ক্যাসেটের ফিতা বেরিয়ে গেলে পেন্সিল
দিয়ে ঘুরিয়ে আবার ঠিক করার সেই দৃশ্যটাও আজ যেন মধুর স্মৃতি!
আহা।
একটা গান ভালো লাগলে বারবার শোনা যেত। তখন
‘স্কিপ’ করে পরের গান শোনার সুবিধা ছিল না। তাই প্রিয় গানটির জন্য অপেক্ষা করাটাও ছিল
আনন্দের অংশ।
আজ হাজার হাজার গান এক মুহূর্তে হাতের মুঠোয়।
তবু সেই একটা ক্যাসেটের জন্য যে অপেক্ষা,তার মতো আবেগ কি আর তৈরি হয়?
আর ছিল চিঠি...
আজ একটা মেসেজ পাঠিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে
উত্তর না এলে আমরা অস্থির হয়ে যাই। অথচ একটা সময় ছিল, যখন প্রিয় মানুষের একটি
চিঠির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো।
ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই বুকের ভেতর
কেমন একটা কৌতূহল তৈরি হতো।চিঠির খাম খুলে ধীরে ধীরে পড়া, আবার পড়া, তারপর যত্ন করে
তুলে রাখা সেই অনুভূতির কোনো ‘ইমোজি’ ছিল না।
একটা চিঠির প্রতিটি শব্দে থাকত মানুষের হাতের
স্পর্শ, অপেক্ষা আর অনুভূতি।
কেউ হয়তো লিখেছে
“অনেক দিন তোমার কোনো খবর নেই। ভালো আছ তো?”
এই একটি বাক্যই তখন কারও পুরো দিন ভালো করে দিতে পারত।
একটি বিকেল মানেই ছিল পাড়া। ৮০-এর দশকের
বিকেলগুলো ছিল অন্যরকম। বারান্দায় বসে গল্প, বাড়ির ছাদে কাপড় শুকাতে
দিতে দিতে পাশের বাড়ির খোঁজখবর, পাড়ার দোকানের সামনে আড্ডা, মাঠে ছেলেদের খেলাধুলা
সব মিলিয়ে একটা অদৃশ্য সামাজিক বন্ধন ছিল।
কারও বাড়িতে নতুন টেলিভিশন এসেছে, সেটাও ছিল
পাড়ার খবর। কোনো জনপ্রিয় নাটক বা সিনেমা দেখার সময় আশপাশের
কয়েকটি বাড়ির মানুষ এক জায়গায় জড়ো হতো।
আরোও পড়ুন: আশির দশকের ফ্যাশন ছিল ‘মোর ইজ মোর’
টেলিভিশনের সামনে জায়গা পাওয়া যেন ছোটখাটো
যুদ্ধ। তখন বিনোদন কম ছিল, কিন্তু একসঙ্গে আনন্দ
করার মানুষ ছিল অনেক।
তখনকার তারকারাও ছিলেন অন্যরকম-
বাংলাদেশি সিনেমার পর্দায় তখন শাবানা, ববিতা,
রোজিনা, জাফর ইকবাল, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, জসীম এমন অনেক তারকার দাপট।
তাদের সিনেমা মানেই ছিল হলের সামনে ভিড়,
পোস্টার নিয়ে আলোচনা, গান মুখস্থ করা আর বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমার গল্প করা।
তারকারা তখন শুধু পর্দার মানুষ ছিলেন না
তাদের পোশাক, চুলের স্টাইল, সংলাপ, এমনকি হাঁটার ধরনও মানুষের ফ্যাশন ও কথাবার্তায়
প্রভাব ফেলত।
তখন সুখের সংজ্ঞাটাও হয়তো ছোট ছিল।
নতুন জামা পাওয়া।
ঈদের সকালে সেমাইয়ের গন্ধ।
বৃষ্টির দিনে জানালার
পাশে বসে থাকা।
পছন্দের গান রেডিওতে বেজে ওঠা।
বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প
করা।
বিকেলে মাঠে খেলা।
ডাকপিয়নের হাতে নিজের নামে একটি চিঠি পাওয়া।
অথবা অনেকদিন পর প্রিয় একটি ক্যাসেট হাতে
পাওয়া।
এসব ছোট ছোট ঘটনাই তখন বড় আনন্দ হয়ে উঠত। আজ
আমাদের কাছে সবকিছু অনেক সহজ। মুহূর্তের মধ্যে গান, সিনেমা, খবর, ছবি সব পাওয়া যায়।
পৃথিবী যেন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।
তবু কোথাও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, সবকিছু এত সহজ হয়ে যাওয়ার পরও কি আমরা আগের
মতো আনন্দী হয়েছি?
হয়তো ৮০-এর দশকের মানুষদের কাছে সময় ছিল
বেশি, কিন্তু জিনিস কম। আর আমাদের কাছে জিনিস অনেক বেশি, কিন্তু সময়টা যেন সবচেয়ে কম।
তখন একটা চিঠির জন্য অপেক্ষা ছিল।
একটা ক্যাসেটের জন্য অপেক্ষা ছিল।
একটা বিকেলের জন্য অপেক্ষা ছিল।
আর সেই অপেক্ষাগুলোই হয়তো আনন্দকে আরও গভীর
করে তুলত।
৮০-এর দশক তাই শুধু একটি দশকের নাম নয়। কারও
কাছে এটি শৈশব, কারও কাছে কৈশোর, কারও কাছে প্রথম প্রেম, প্রথম সিনেমা, প্রথম গান,
প্রথম চিঠি।
একটা ক্যাসেটের ফিতায় আটকে থাকা গান, পুরোনো
খামের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা কিছু কথা আর সূর্য ডোবার আগের সেই দীর্ঘ বিকেল।
সব মিলিয়ে ৮০-এর দশক আজও আমাদের মনে বলে
যায়, “জীবন তখন হয়তো এত দ্রুত ছিল না, কিন্তু
মুহূর্তগুলো ছিল অনেক বেশি আপন।”
ঢাকা/টিএ