সপ্তাহজুড়ে অফিস, সংসার, সন্তান, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত নানা দায়িত্ব সামলে ছুটির দিনটাতেও আর বিশ্রাম নেওয়া হয়ে ওঠে না। অনেকেই ভাবেন—‘আজ যেহেতু সময় আছে, কাজগুলো শেষ করে ফেলি।’ যার ফলে বিশ্রামের জন্য নির্ধারিত দিনটিও হয়ে ওঠে আরেকটি কর্মব্যস্ত দিন। আপনি কখনো কি ভেবে দেখেছেন, সত্যিই বিশ্রাম নিতে চাইছেন না, নাকি বিশ্রাম নিলে অপরাধবোধ হচ্ছে?
ছুটির দিনে সোফায় বসে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকা, প্রিয় সিনেমা দেখা কিংবা ঘুমানোকে অনেকেই ‘সময় নষ্ট’ মনে করেন। অন্যদিকে ঘরের অগোছালো জিনিস গোছানো, অফিসের অসমাপ্ত কাজ শেষ করা কিংবা আগামী সপ্তাহের প্রস্তুতি নেওয়াকে মনে হয় বেশি জরুরি। অথচ শরীর ও মস্তিষ্কেরও কাজের পর পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন আছে।
বিশ্রাম আর কাজ এড়িয়ে যাওয়া এক নয়
চিত্রের মতো পরিস্থিতি আমাদের অনেকেরই পরিচিত। একদিকে একজন মানুষ আরাম করে বসে আছেন—মনে হতে পারে তিনি অলসতা করছেন। অন্যদিকে আরেকজন হয়তো বলছেন, ‘এটা নিয়ে ভাবতেই চাই না’, তাই কাজটি পিছিয়ে দিচ্ছেন। দুটির মধ্যে পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
সত্যিকারের বিশ্রাম হলো সচেতনভাবে কিছু সময়ের জন্য কাজের চাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, যাতে শরীর ও মন পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। আর কোনো প্রয়োজনীয় কাজকে ভয়, উদ্বেগ বা অনীহার কারণে বারবার পিছিয়ে দেওয়া হলো এড়িয়ে যাওয়া বা procrastination। নিজেকে তাই প্রশ্ন করুন—‘আমি কি সত্যিই বিশ্রাম নিচ্ছি, নাকি যে কাজটি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলছে, সেটি এড়িয়ে যাচ্ছি?’
কেন বিশ্রাম এত জরুরি?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘ সময় বিরতি ছাড়া কাজ করে যাওয়া মানসিক ক্লান্তি বাড়ায় এবং বার্নআউটের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) বলছে, কাজের চাপ থেকে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ না থাকলে বার্নআউটের ঝুঁকি বাড়ে।
বার্নআউট গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টিনা মাসলাখের ভাষায়, ‘‘বার্নআউট হলো কাজের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও আন্তঃব্যক্তিক চাপের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ প্রতিদিনের চাপ যদি কমানোর সুযোগ না থাকে, তা ধীরে ধীরে মানসিক অবসাদ, বিরক্তি, কাজের প্রতি অনাগ্রহ ও কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।’’
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোবিজ্ঞানী নাটালি ড্যাটিলো-‘‘রায়ান বিশ্রামকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা মানসিক উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করে। তাঁর মতে, বিশ্রাম আমাদের দৈনন্দিন চাপ সামলানোর সক্ষমতা বাড়াতে পারে। ’’
বিশ্রাম মানেই শুধু ঘুম নয়
অনেকে মনে করেন, রাতে সাত-আট ঘণ্টা ঘুমালেই বিশ্রামের প্রয়োজন মিটে যায়। আসলে ঘুম ও বিশ্রাম এক বিষয় নয়। ঘুম বিশ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও মানসিক ও আবেগীয় পুনরুদ্ধারের জন্য আরও নানা ধরনের বিশ্রাম প্রয়োজন। কারও জন্য এক কাপ চা হাতে বারান্দায় বসে থাকা বিশ্রাম। কারও জন্য বই পড়া, গান শোনা, প্রকৃতির কাছে হাঁটা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা কিছুক্ষণ ফোন থেকে দূরে থাকা। এমনকি কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই কিছু সময় নিজের মতো থাকাও বিশ্রামের অংশ হতে পারে।
ছুটির দিনটি কীভাবে কাটাবেন?
ছুটির দিন মানেই পুরো দিন বিছানায় পড়ে থাকা নয়। বরং কাজ ও বিশ্রামের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি।
প্রয়োজনীয় কাজের একটি ছোট তালিকা করুন, সব কাজ নয়।
অফিসের ই-মেইল ও মেসেজ থেকে কিছু সময় দূরে থাকুন।
ঘুমের পাশাপাশি এমন কিছু করুন, যা আপনাকে আনন্দ দেয়।
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান, তবে সেটিও যেন আরেকটি দায়িত্বে পরিণত না হয়।
‘আজ কিছুই করব না’—এমন একটি ছোট সময় নিজের জন্য রাখুন।
কাজ পিছিয়ে রাখার বদলে কাজটিকে ছোট ধাপে ভাগ করে নিন।
মনে রাখতে হবে, বিশ্রাম অলসতা নয়; এটি পরবর্তী কাজের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার অংশ। নিয়মিত বিরতি কর্মক্ষমতা বাড়াতে এবং বার্নআউট কমাতে সহায়তা করতে পারে।
তাই এবারের সাপ্তাহিক ছুটিতে নিজেকে প্রশ্ন করুন—‘আমি কি কাজ এড়িয়ে যাচ্ছি, নাকি সত্যিই আমার একটু বিশ্রাম দরকার?’ উত্তরটি যদি হয় ‘বিশ্রাম দরকার’, তাহলে অপরাধবোধ ছাড়াই একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন। কারণ সব সময় এগিয়ে যাওয়ার জন্যও মাঝে মাঝে থামতে হয়।