গ্রে ডিভোর্স: কেন ৩০ বছরের সংসারও আজ ভেঙে যাচ্ছে?

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬

ছবি: প্রতীকী
ছবি: প্রতীকী

একসময় মনে করা হতো, যে দম্পতি ২৫–৩০ বছর একসঙ্গে সংসার করেছেন, তাঁদের সম্পর্ক আর ভাঙবে না। তাঁদের নাকি শিকড় গজিয়ে যায়। জীবনের ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে তাঁরা একসঙ্গে বার্ধক্যে পৌঁছাবেন—এটাই ছিল স্বাভাবিক ধারণা। কিন্তু বাস্তবতা বদলেছে।


আজ বিশ্বজুড়ে বাড়ছে গ্রে ডিভোর্স, অর্থাৎ ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সে হওয়া বিবাহবিচ্ছেদ। অবাক করার বিষয় হলো, এসব বিচ্ছেদের বেশির ভাগই এমন দম্পতির মধ্যে, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে একই ছাদের নিচে বসবাস করেছেন।


প্রশ্ন হলো, এত বছরের সংসার কেন হঠাৎ ভেঙে যায়?- আসলে এটি হঠাৎ নয়। অনেক সম্পর্ক বহু বছর ধরেই ভেতর থেকে ভাঙতে থাকে। বিচ্ছেদটি কেবল সেই দীর্ঘ যাত্রার শেষ অধ্যায়।


কেন গ্রে ডিভোর্স হয়?

সন্তানরা বড় হয়ে স্বাধীন হয়ে যাওয়া (এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম)


বহু বছরের অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব, মানসিক দূরত্ব ও যোগাযোগের অভাব


পরকীয়া বা বিশ্বাসভঙ্গ


অবসরজীবনে একসঙ্গে বেশি সময় কাটাতে গিয়ে মতের অমিল স্পষ্ট হয়ে ওঠা


একজনের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা নতুন জীবন শুরু করার ইচ্ছা


আর্থিক বিষয় নিয়ে বিরোধ


এক ছাদের নিচে থেকেও দুই ভিন্ন পৃথিবী


মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি সম্পর্ক একদিনে ভেঙে যায় না। প্রতিদিনের অবহেলা, না-শোনা কথা, না-বলা কষ্ট, অসম্মান ও অপূর্ণ প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে দুইজন মানুষ আবেগগতভাবে দূরে সরে যান। বাইরে থেকে সংসার ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে অনেক সময় ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয় নীরবতা।


সন্তান ছিল সম্পর্কের সেতুবন্ধন


অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে সন্তানই হয়ে ওঠে সম্পর্কের প্রধান কেন্দ্র। সন্তানদের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ ও বিয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের সম্পর্কের যত্ন নিতে ভুলে যান। যখন সন্তানরা নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে যায়, তখন তাঁরা প্রথমবারের মতো একে অপরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন, একসঙ্গে থাকলেও তাঁরা বহু বছর ধরে আলাদা জীবন কাটাচ্ছিলেন।


নারীর আর্থিক স্বাধীনতা বদলে দিয়েছে সিদ্ধান্ত


একসময় অসুখী দাম্পত্যেও অনেক নারী শুধু অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণে থেকে যেতেন। এখন শিক্ষা, চাকরি ও নিজের আয়ের কারণে অনেক নারী অসম্মান, মানসিক নির্যাতন বা বিষাক্ত সম্পর্ককে আর জীবনের অবধারিত নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে চান না। এটি শুধু বিচ্ছেদের কারণ নয়; বরং নিজের মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসও।


মানুষ এখন শুধু বেঁচে থাকতে নয়, ভালোও থাকতে চায়

গড় আয়ু বেড়েছে। ৫০ বছর বয়স মানেই এখন জীবনের শেষ নয়। অনেকের সামনে আরও ২৫–৩০ বছরের জীবন পড়ে থাকে। ফলে অনেকেই ভাবেন, বাকি জীবনটা কি কষ্টেই কাটাব, নাকি শান্তি খুঁজে নেব?

এই প্রশ্ন থেকেই অনেক গ্রে ডিভোর্সের সূচনা।


অবসরজীবনে প্রকাশ পায় লুকিয়ে থাকা দূরত্ব


কর্মজীবনে ব্যস্ত থাকা মানুষ অবসরের পর হঠাৎ অনেক বেশি সময় একসঙ্গে কাটান। তখন বোঝা যায়, তাঁরা কি সত্যিই বন্ধু ছিলেন, নাকি শুধু সংসারের সহযাত্রী। যে সমস্যাগুলো ব্যস্ততার কারণে চোখে পড়েনি, অবসরে সেগুলোই বড় হয়ে ওঠে।


ভালোবাসার চেয়ে কি সম্মান বেশি জরুরি?


অনেক সম্পর্কে ভালোবাসা পুরোপুরি শেষ হয় না। কিন্তু শেষ হয়ে যায় সম্মান, শ্রদ্ধা ও নিরাপত্তাবোধ। একটি সম্পর্ক তখনই টিকে থাকে, যখন দুজন মানুষ একে অপরকে মূল্য দেন। ভালোবাসা ক্ষণিকের আবেগ হতে পারে, কিন্তু সম্মান প্রতিদিনের অনুশীলন।


ধরুন, একটি দম্পতি ৩০ বছর একসঙ্গে সংসার করেছেন। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের মানসিক অশান্তি, সম্মানের অভাব বা সম্পর্কের ভাঙনের কারণে তাঁরা ৫৫–৬০ বছর বয়সে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলেন। এটিই গ্রে ডিভোর্সের একটি উদাহরণ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক দেশে গ্রে ডিভোর্সের হার বেড়েছে। এর পেছনে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হয়।


বাস্তব উদাহরণ

ডা. কুশাল ও ডা. সুষমার ২০ বছরের সংসার ভাঙার গল্প: কী জানা গেছে? বাংলাদেশের পরিচিত চিকিৎসক ও মোটিভেশনাল স্পিকার দম্পতি ডা. সায়েদুল আশরাফ কুশাল (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) এবং ডা. সুষমা রেজা (চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ) ২০২৬ সালের জুন মাসে যৌথভাবে ঘোষণা করেন যে, তাঁরা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে প্রায় ২০ বছরের বৈবাহিক জীবনের ইতি টেনেছেন।


ফেসবুকে প্রকাশিত তাঁদের বিবৃতিতে তাঁরা জানান, দীর্ঘ আত্মসমালোচনা ও অনেক চিন্তাভাবনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা উপলব্ধি করেছেন যে, তাঁদের সম্পর্ক আর সেই অবস্থানে নেই, যেখান থেকে তাঁরা একসঙ্গে পথচলা শুরু করেছিলেন।


তাই তিক্ততা বা দ্বন্দ্ব নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও সম্মান বজায় রেখেই আলাদা হওয়াকে তাঁরা উভয়ের জন্য সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছেন।


দম্পতি তাঁদের বিবৃতিতে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ, পরকীয়া, সহিংসতা, আর্থিক বিরোধ বা তৃতীয় পক্ষের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেননি। বরং তাঁরা সবাইকে অনুরোধ করেছেন, বিষয়টি নিয়ে অযথা জল্পনা-কল্পনা না করতে এবং তাঁদের সন্তান ও পরিবারের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান জানাতে।


বিচ্ছেদের ঘোষণার শেষে ডা. সুষমা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি পরিবারকে সময় দেওয়া, প্রিয় মানুষদের পাশে থাকা এবং প্রতিদিনের সাধারণ মুহূর্তগুলোর মূল্য বোঝার আহ্বান জানান।


ঢাকা/ইজেই/আরএস

sidebar ad