আমাদের সমাজে এমন একটি ধারণা এখনো প্রবল—একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর নারীর শরীর, আকাঙ্ক্ষা কিংবা ঘনিষ্ঠতার প্রয়োজন নিয়ে কথা বলাটাই যেন অস্বস্তিকর। সন্তান বড় হয়েছে, সংসার অনেক দিনের, মাসিক অনিয়মিত হতে শুরু করেছে—এবার নারী যেন শুধু মা, স্ত্রী বা পরিবারের অভিভাবক। তাঁর নিজের শরীর ও অনুভূতির কথা সেখানে প্রায় অদৃশ্য।
চিকিৎসাবিজ্ঞান অন্য কথা বলে
৪০-এর পর যৌন জীবন শেষ হয়ে যায় না। বরং পেরিমেনোপজ ও মেনোপজের সময়ে শরীরের হরমোনগত পরিবর্তন, মানসিক অবস্থা, ঘুম, সম্পর্ক এবং জীবনের বাস্তবতা মিলিয়ে যৌনতার অভিজ্ঞতা বদলে যেতে পারে। কারও ইচ্ছা কমে, কারও তেমন পরিবর্তন হয় না, আবার কারও জীবনে এই বয়সে ঘনিষ্ঠতা নতুন অর্থ পায়।
পেরিমেনোপজ—পরিবর্তনের শুরু
মেনোপজ বলতে টানা ১২ মাস মাসিক না হওয়াকে বোঝায়। তার আগের পরিবর্তনশীল সময়টিই পেরিমেনোপজ। সাধারণত মধ্য চল্লিশে এই পরিবর্তন শুরু হতে পারে, যদিও প্রত্যেক নারীর অভিজ্ঞতা এক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ নারীর মেনোপজ হয় ৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে।
এই সময়ে ডিম্বাশয়ের কার্যক্রম বদলে যায় এবং ইস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন আসে। মাসিকের অনিয়মের পাশাপাশি গরম লাগা, রাতের ঘাম, ঘুমের সমস্যা, মেজাজের পরিবর্তন, যোনিপথের শুষ্কতা কিংবা যৌন আগ্রহের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
তবে সব নারীর ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিবর্তন হবে—এমন নয়।
‘ইচ্ছা হচ্ছে না’—শুধু হরমোনের গল্প নয়
যৌন আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি হরমোনের সুইচ নয়। বয়সের সঙ্গে হরমোনগত পরিবর্তন ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্নতা, ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, শরীর নিয়ে অস্বস্তি, কিছু ওষুধ এবং ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতাও যৌন আগ্রহে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই একজন নারী যদি বলেন, ‘আগের মতো ইচ্ছা হয় না’, তাঁকে ‘বয়স হয়েছে’ বলে থামিয়ে দেওয়া সমাধান নয়।
প্রশ্ন হতে পারে—তিনি কেমন ঘুমাচ্ছেন? যৌনমিলনে ব্যথা হচ্ছে কি? সম্পর্কে আবেগের জায়গাটি কেমন? দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ আছে কি? কোনো নতুন ওষুধ শুরু হয়েছে কি?
শরীরের সঙ্গে মনের সম্পর্কও গভীর
উত্তেজনা আসতে সময় লাগছে—এটিও অস্বাভাবিক নয়
কখনো আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু শরীর আগের মতো দ্রুত সাড়া দিচ্ছে না। উত্তেজিত হতে বেশি সময় লাগতে পারে, স্বাভাবিক পিচ্ছিলতা কমে যেতে পারে, অর্গাজমে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগতে পারে।
এসব পরিবর্তন নিয়ে লজ্জিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ, পর্যাপ্ত সময়, স্নেহপূর্ণ স্পর্শ এবং তাড়াহুড়া না করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ঘনিষ্ঠতা শুধু যৌনমিলন নয়। কথা, স্পর্শ, আলিঙ্গন, চুম্বন, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজের চাহিদা প্রকাশ করাও যৌন ও আবেগিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যোনিপথের শুষ্কতা: সহ্য করে যাওয়ার বিষয় নয়
মেনোপজের সময় যৌন জীবনে সবচেয়ে বাস্তব সমস্যাগুলোর একটি হলো যোনিপথ ও আশপাশের টিস্যুর পরিবর্তন।
ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে যোনিপথের আবরণ পাতলা, শুষ্ক ও কম স্থিতিস্থাপক হয়ে যেতে পারে। এর ফলে জ্বালা, চুলকানি, পিচ্ছিলতা কমে যাওয়া, যৌনমিলনে ব্যথা, যৌনমিলনের পর রক্তপাত এবং কিছু নারীর প্রস্রাবসংক্রান্ত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এই উপসর্গগুলোর সমষ্টিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে জেনিটোইউরিনারি সিনড্রোম অব মেনোপজ বলা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা না নিলে সময়ের সঙ্গে এ সমস্যা আরও বাড়তে পারে। অথচ এর কার্যকর ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
ব্যথা হলে চুপ করে থাকবেন কেন?
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এখানে একটি বড় সমস্যা রয়েছে।
অনেক নারী যৌনমিলনের সময় ব্যথাকে নিজের ব্যক্তিগত বিষয় মনে করে সহ্য করেন। কেউ ভাবেন, বয়সের কারণে এটাই স্বাভাবিক। কেউ চিকিৎসকের কাছে বলতে সংকোচ বোধ করেন। আবার অনেক দাম্পত্যে নারীর সম্মতি, স্বস্তি ও আনন্দের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
ব্যথা সহ্য করা যৌনতার শর্ত নয়
শুষ্কতার ক্ষেত্রে পানিভিত্তিক লুব্রিক্যান্ট যৌনমিলনের সময় আরাম দিতে পারে। নিয়মিত ব্যবহারের জন্য যোনিপথের ময়েশ্চারাইজারও কিছু নারীর উপকারে আসে। সুগন্ধিযুক্ত সাবান, ওয়াশ বা ডুশ সংবেদনশীল অংশে জ্বালা বাড়াতে পারে।
উপসর্গ বেশি হলে চিকিৎসক স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের ইস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন চিকিৎসার উপযোগিতা বিবেচনা করতে পারেন। হরমোন-চিকিৎসা সবার জন্য সমানভাবে উপযুক্ত নয়। ব্যক্তির চিকিৎসা-ইতিহাস ও ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
যৌনতা শুধু শরীরের নয়, সম্পর্কেরও
দীর্ঘ দাম্পত্যে যৌন সম্পর্কের পরিবর্তনের সব দায় মেনোপজের ওপর চাপানোও ঠিক নয়।
বছরের পর বছর জমে থাকা অভিমান, অসম দায়িত্ব, সঙ্গীর উদাসীনতা, নিজের জন্য সময় না পাওয়া কিংবা সম্পর্কের আবেগিক দূরত্ব—এসব কারণেও আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে যেতে পারে।
আবার উল্টো অভিজ্ঞতাও আছে। সন্তান বড় হওয়ার পর দায়িত্ব কিছুটা কমে, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের উদ্বেগ কমে এবং নিজের শরীর ও পছন্দ সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বাড়ে—ফলে কিছু নারী মধ্যবয়সে ঘনিষ্ঠতাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন।
তাই ৪০-এর পর যৌন জীবনকে শুধু ‘কতবার যৌনমিলন হচ্ছে’—এই হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমি কি এই সম্পর্কে স্বস্তি পাচ্ছি? আমার ইচ্ছাকে কি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? আমি কি নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে পারছি?
মেনোপজ মানে গর্ভনিরোধের প্রয়োজন সঙ্গে সঙ্গে শেষ নয়
পেরিমেনোপজে মাসিক অনিয়মিত হলেও গর্ভধারণ সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এড়াতে মেনোপজ নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত উপযুক্ত গর্ভনিরোধ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। একইভাবে বয়স বাড়লেও যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না।
অর্থাৎ, ‘এই বয়সে আর এসব নিয়ে ভাবতে হবে না’—এই ধারণাটিও নিরাপদ নয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যোনিপথের শুষ্কতা কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে বা তা দৈনন্দিন জীবন ও ঘনিষ্ঠতায় প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যৌনমিলনের পর রক্তপাত, মেনোপজের পর যেকোনো যোনিপথে রক্তপাত, অস্বাভাবিক স্রাব, বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ বা স্থায়ী ব্যথা থাকলে বিষয়টিকে শুধু মেনোপজের স্বাভাবিক পরিবর্তন ধরে নেওয়া উচিত নয়; চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আবার যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া যদি নিজের জন্য কষ্টের কারণ হয়, সেটিও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনার যথেষ্ট কারণ। কারণ এর পেছনে শারীরিক, মানসিক, সম্পর্কজনিত কিংবা ওষুধসংক্রান্ত নানা কারণ থাকতে পারে।
যে কথাটি আমাদের সমাজে বলা দরকার
নারীর যৌনতা শুধু সন্তান ধারণের জন্য নয়। তাঁর শরীরের আরাম, আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ, সম্মতি এবং ঘনিষ্ঠতার প্রয়োজনও তাঁর সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মধ্যবয়সী একজন নারী যৌনতা নিয়ে কথা বললে তাঁকে বিব্রত করা, তাঁর প্রয়োজনকে হাস্যকর মনে করা কিংবা ‘এই বয়সে এসব কী?’—এ ধরনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই অনেক নারীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন থেকে দূরে রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উল্লেখ করেছে, বহু দেশে মেনোপজকালীন নারীর যৌন সুস্থতা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না এবং শুষ্কতা বা যৌনমিলনে ব্যথার মতো সাধারণ সমস্যাও চিকিৎসাহীন থেকে যায়।
৪০-এর পর শরীর বদলাবে। সম্পর্কও বদলাতে পারে। আকাঙ্ক্ষার ভাষাও হয়তো বদলাবে।
বদলে যাওয়া মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
কখনো এই অধ্যায়ে প্রয়োজন হয় একটু বেশি সময়, একটু বেশি বোঝাপড়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং নিজের শরীরের কথা বলার সাহস।
আর হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে বয়স যাই হোক, একজন নারীর নিজের শরীর, সম্মতি, আনন্দ ও সুস্থতা নিয়ে কথা বলাকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা হবে।
*সাবিনা ইয়সমীন
ঢাকা/এসই/আরএস