“ আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি?’’
আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে,
কিছুই কি নেই বাকি?’’
রবি ঠাকুরের হঠাৎ দেখা কবিতার এই পংক্তিগুলো যেনো আমাদের অনেকেরই মনে আসা প্রশ্নটিই তুলে ধরে। পুরোনো সম্পর্কে সব শেষ হয়ে গেলেও কি যোগাযোগটা একেবারে শেষ হওয়া উচিৎ? নাকি কিছু না কিছু থেকে যাওয়াই স্বাভাবিক? মনের মাঝে থাকা দ্বিধা, এই টানাপোড়েন নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।
পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং নিঃশর্ত ভালবাসার এক অনন্য অনুভূতি হলো একটি সুন্দর সম্পর্ক। এটি জীবনকে পূর্ণতা দেয় এবং মানুষকে বাঁচতে শেখায়। যেখানে নীরবতায়ও মনের ভাষা বোঝা যায়। যোজন যোজন দূরত্বে থাকলেও অস্তিত্বে মিশে থাকা যায়। কিন্তু চলতে থাকা এই সম্পর্কও জটিল হতে পারে। যতই স্বাস্থকর হোক না কেন, প্রতিটা সম্পর্কেই নিজস্ব প্রতিবন্ধকতা বা বাধা আসতে পারে। আর এই সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে হয়ে যেতে পারে বিচ্ছেদের। সম্পর্ক শেষ হলেও স্মৃতি কিন্তু সহজেই শেষ হয়না। কিছু কথা, হয়তোবা কোন গান, কোনো জায়গা চলতি পথে হঠাৎ করে মনে করিয়ে দেয় সেই প্রাক্তনের কথা। তখন হয়তো মনে হয়, কি এমন ক্ষতি হবে একটু কথা বললে? ব্রেকআপের পর “উই ক্যান স্টিল বি ফ্রেন্ডস” বলা যতটা সহজ বাস্তবে তখন প্রশ্ন আসে, Ex- এর সাথে যোগাযোগ রাখা কি আসলেই ঠিক হবে? নাকি নিজের জন্য তা নতুন সমস্যা তৈরি করবে?
প্রাক্তনের সাথে কেনো অনেকেই যোগাযোগ রাখতে চায়?
মানুষ হিসেবে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা সামলিয়ে উঠা অনেক কঠিন। তাই এই পুরনো সম্পর্কের টান বা ভালো স্মৃতি মনে করে অনেকেই যোগাযোগ রাখতে চায়
যৌথ দায়িত্ববোধ থেকে। প্রাক্তন সঙ্গীর সাথে যদি সন্তানের যৌথ অভিভাবকত্ব পালন করতে হয়
মানুষ অভ্যাসের দাস। দীর্ঘ সময় একসাথে থাকার পর হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে মস্তিষ্ক সেই অভ্যাস ছাড়তে পারেনা
সম্পর্কের তিক্ততা ভুলে অনেকেই নিছক বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চায়
একাকীত্ব বা পুরনো মানুষটির উপর মানসিক নির্ভরতার থাকার কারন
গড়ে উঠা সম্পর্কে কমন ফ্রেন্ড সার্কেল থাকলে অনেক সময় হঠাৎ করে যোগাযোগ ছিন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে
প্রাক্তন এখন কেমন আছে কিংবা নতুন কাউকে পেয়েছে কিনা তা জানার ইচ্ছা থাকলে
সম্পর্কের অসম্পূর্ণ কোনো বিষয় বা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা
অনেক সময় অপরাধবোধ থেকেও আবার যোগাযোগের জন্য ইচ্ছা পোষণ করা হয়
কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাক্তন সহজেই প্রভাবিত করতে পারে বলে যোগাযোগ থেকে যায়
কখন যোগাযোগ রাখা ঠিক হতে পারে?
প্রাক্তনের সাথে যোগাযোগ রাখা কি সঠিক না ভুল –এমনটির কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই। এটা পুরোপুরিই নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর। প্রাক্তন হওয়া মানেই যে সবসময় টক্সিক ভাবে শেষ হওয়া রিলেশন হতে হবে তাও কিন্তু নয়।কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই যোগাযোগ রাখাটা স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে-
দুজনেই মানসিকভাবে যথেষ্ট পরিণত হলে
পুরনো আবেগ কাটিয়ে উঠতে পারলে
কোন হিডেন এক্সপেক্টেশন না থাকলে
অনেক সময় চলার পথে কিছু কিছু সময়ে একজন প্রাক্তনই আপনার সবচেয়ে বড় মেন্টর হতে পারেন, কারন সে আপনার সব দিক জানেন
সম্পর্কের বিচ্ছেদ তিক্ততার মাধ্যমে নয় বরং দুজনের সম্মতিতে হলে সৌজন্যমূলক যোগাযোগ রাখাই যায়
কাজ বা দায়িত্বের খাতিরে
কেউ কাউকে ছোট করে নয় বরং পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকলে
নতুন সম্পর্কের পার্টনার থাকলে, তবে সেটাকে প্রাধান্য দিয়ে সীমার মধ্যে যোগাযোগ রাখা
কখন এটা ভূল সিদ্ধান্ত?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাক্তনের সাথে যোগাযোগ রাখা বিষয়টিকে বিশেষজ্ঞরা “নো কন্টাক্ট রুল’’ বা না করার অপশনকে শ্রেয় মনে করেন। কখন মনে হবে যোগাযোগ রাখা হবে মস্ত বড় ভূল-
যোগাযোগের সূত্রপাত যদি হয় পুরনো ভালো লাগা বা কষ্ট থেকে
বিচ্ছেদ যদি খুব তিক্ত বা খারাপ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে হয়
পূর্বের সম্পর্ক যদি টক্সিক ধরনের হয়
ইমোশনালি কনফিউজ করছে বলে মনে হলে
মনের কোনে যদি অবচেতন ভাবে আশা থাকে যে, সব হয়তো ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু বাস্তবে তার সম্ভাবনা না থাকলে
প্রাক্তনের নতুন জীবনের আপডেট যদি নিজের জীবনের সাথে তুলনা করে আত্মবিশ্বাস তলানিতে যাবার উপক্রম হলে
নতুন করে গড়ে উঠা সম্পর্ক থাকলে, সেই সম্পর্কে অস্বস্তি বা সন্দেহ সৃষ্টি হলে
বারবার যদি মনে হতে থাকে যে যোগাযোগ করতে হবে তবে তা এক ধরনের আসক্তিতে রুপ নেয়। তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নিজেকে সংযত রাখা প্রয়োজন
একতরফা টান থাকলে। অর্থাৎ যদি একজন বন্ধু হিসেবে দেখতে চান কিন্তু অন্যজন যদি অন্যকিছু আশা নিয়ে থাকে তবে যোগাযোগ রাখাটা অন্য মানুষটির সাথে অন্যায় করা হবে
নিজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত
যোগাযোগ রাখা সঠিক হবে না ভূল- এর এক কথায় কোন উত্তর নেই। তবে এমন দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে নিজের জন্য কি ভালো হবে সে সিদ্ধান্তে পৌছাতে কিছু উপায় আছে-
প্রথমেই নিজেকে প্রশ্ন করুন। এই যে আবার যোগাযোগ করতে চাচ্ছেন, এর পেছনে উদ্দেশ্যটি কি? এটা কি সত্যিই বন্ধুত্ব করার জন্য নাকি নিছক একাকীত্ব বা কোন সুপ্ত বাসনা থেকে কথা
বলতে চাওয়া?
এই যোগাযোগটা কি আমাকে ভালো রাখছে নাকি পুরনো ক্ষত আবার জেগে উঠছে? যদি উত্তর আসে যে কষ্টই বাড়াচ্ছে তবে থেমে যাওয়াই ভালো।
তার সাথে কথা বলার পর মানসিকভাবে হালকা লাগে নাকি ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করেন?
সর্বোপরি কিছু সময় নেয়া। বিচ্ছেদ পরবর্তী জীবনে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করার একটি উপায় হলো ৩-৩-৩ নিয়ম। এই রুলস অনুযায়ী,মানুষ ৩ মাস মানসিক আঘাত, ৩ মাস মানিয়ে নেওয়ার সময় এবং ৩ মাস পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। যে কোন কিছু মানিয়ে নিতে সময় লাগতে পারে। তাই কোন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কিছুটা সময় নেয়া দরকার।
পুনরায় যোগাযোগ করা কতটুকু সঠিক বা ভূল, তা আসলে কোন মানদন্ডে পরিমাপ করা যায়না। এটা নিজস্ব অনুভূতি, বাস্তবতা, পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে যা স্মৃতিতে থাকলেই সুন্দর, আবার কিছু সম্পর্ক দূরে থাকলেই শান্তি দেয়। মনে রাখতে হবে, সব সম্পর্ক ধরে রাখতে হয়না; কিছু সম্পর্ক ছেড়ে দিতে হয়, নিজেকে ভালো রাখার জন্য।
শায়লা জাহান-