পুরুষের যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন। তাই সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে অনেকে ইন্টারনেটে খোঁজেন—‘ইরেকশন ঠিকমতো হচ্ছে না কেন’, ‘যৌনক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণ কী’, ‘ইরেকটাইল ডিসফাংশনের চিকিৎসা কী’ কিংবা ‘কীভাবে যৌনক্ষমতা বাড়ানো যায়’।
কিন্তু ইন্টারনেটে পাওয়া সব তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়। কেউ দ্রুত কাজ করার ওষুধের কথা বলেন, কেউ তেল বা হারবাল পণ্যের প্রচার করেন, আবার কেউ সমস্যাটিকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক ফল হিসেবে দেখান।
বাস্তবতা হলো, ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা ইডি শুধু যৌনতার সমস্যা নয়। কখনো এটি শরীরের অন্য কোনো স্বাস্থ্যসমস্যারও সংকেত হতে পারে।
ইরেকটাইল ডিসফাংশন কী?
সহজভাবে বললে, যৌনমিলনের জন্য প্রয়োজনীয় ইরেকশন তৈরি করতে বা তা যথেষ্ট সময় ধরে রাখতে নিয়মিত সমস্যা হওয়াকে ইরেকটাইল ডিসফাংশন বলা হয়।
তবে এক-দুবার ইরেকশন ঠিকমতো না হওয়া মানেই ইডি নয়। ক্লান্তি, মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা সাময়িক অসুস্থতার কারণেও এমন হতে পারে। কিন্তু সমস্যা যদি বারবার হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শুধু বয়সের কারণেই কি ইডি হয়?
বয়স বাড়ার সঙ্গে যৌন প্রতিক্রিয়ায় কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন আসতে পারে। ইরেকশন তৈরি হতে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে বা সরাসরি শারীরিক উদ্দীপনার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ইরেকটাইল ডিসফাংশনকে বয়সের অবধারিত অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া ঠিক নয়। ৫০ বা ৬০ বছর বয়স হলেই যৌন সক্ষমতা কমে যাবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়।
তাহলে কারণ কী?
ইরেকশন তৈরি একটি জটিল শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এতে মস্তিষ্ক, হরমোন, স্নায়ু, পেশি ও রক্তনালির সমন্বিত ভূমিকা রয়েছে। এই ব্যবস্থার যেকোনো অংশে সমস্যা হলে ইরেকশনে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শারীরিক কারণের মধ্যে থাকতে পারে—
ডায়াবেটিস
উচ্চ রক্তচাপ
উচ্চ কোলেস্টেরল
হৃদ্রোগ ও রক্তনালির সমস্যা
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
ধূমপান
অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু হরমোনজনিত সমস্যা
স্নায়ুর সমস্যা
প্রোস্টেটের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের পরবর্তী জটিলতা
এর পাশাপাশি মানসিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, সম্পর্কের সমস্যা কিংবা যৌন সক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ইরেকশন তৈরি বা ধরে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা করতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক—দুই ধরনের কারণই একসঙ্গে কাজ করে।
ইডির সঙ্গে হৃদ্স্বাস্থ্যের সম্পর্ক আছে?
আছে, এবং বিষয়টি জানা গুরুত্বপূর্ণ।
ইরেকশন তৈরির জন্য পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ প্রয়োজন। তাই রক্তনালির সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো বিষয় একই সঙ্গে যৌনস্বাস্থ্য ও হৃদ্স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে ইডি হলেই একজনের হৃদ্রোগ আছে। তবে নতুন করে বা বারবার ইডি দেখা দিলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং হৃদ্রোগের অন্যান্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারেন।
তাই সমস্যাটিকে শুধু ‘যৌন দুর্বলতা’ ভেবে নিজের ইচ্ছায় কোনো ওষুধ খেয়ে নেওয়া ঠিক নয়।
টেস্টোস্টেরন কম হলেই কি ইডি হয়?
না।
টেস্টোস্টেরন পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ইডির প্রতিটি সমস্যার কারণ টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া নয়।
প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডায়াবেটিস, কম টেস্টোস্টেরন এবং হৃদ্রোগের কিছু ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় মূল্যায়ন করতে পারেন।
তাই নিজের ইচ্ছায় টেস্টোস্টেরন বা অন্য কোনো হরমোনের ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।
মানসিক চাপ কি ইরেকশন নষ্ট করতে পারে?
হ্যাঁ।
একবার ইরেকশন ঠিকমতো না হলে অনেক পুরুষ পরেরবার কী হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সেই উদ্বেগ আবার পরবর্তী যৌনসম্পর্কে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এভাবে একটি সাময়িক সমস্যা ধীরে ধীরে মানসিক চাপের চক্র তৈরি করতে পারে।
তাই যৌনক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত ভয়, উদ্বেগ বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
চিকিৎসা কী?
ইডির চিকিৎসা সবার জন্য এক নয়। প্রথমে সমস্যাটির সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
নিয়মিত শরীরচর্চা, অতিরিক্ত ওজন কমানো, ধূমপান বন্ধ করা, অ্যালকোহল সীমিত করা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—এসব যৌনস্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
প্রয়োজনে চিকিৎসক ইডির জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ দিতে পারেন। মুখে খাওয়ার কিছু ওষুধ যৌন উদ্দীপনার সময় লিঙ্গে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে ইরেকশন তৈরি বা ধরে রাখতে সহায়তা করে। তবে ওষুধ খেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইরেকশন হয় না এবং এসব ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা নিরাপদ নয়।
বিশেষ করে হৃদ্রোগের জন্য নাইট্রেটজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করলে কিছু ইডির ওষুধ বিপজ্জনকভাবে রক্তচাপ কমিয়ে দিতে পারে।
বাজারের ‘যৌনশক্তিবর্ধক’ পণ্য কি নিরাপদ?
এখানে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
অনলাইনে বা দোকানে পাওয়া অনেক পণ্য ‘প্রাকৃতিক’, ‘হারবাল’ বা ‘তাৎক্ষণিক যৌনশক্তিবর্ধক’ হিসেবে বিক্রি হয়। কিন্তু সব পণ্যের উপাদান, কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত নয়। কিছু তথাকথিত প্রাকৃতিক যৌনশক্তিবর্ধক পণ্যে লেবেলে উল্লেখ না থাকা ওষুধজাত উপাদানও পাওয়া গেছে।
তাই বিজ্ঞাপন বা পরিচিত কারও পরামর্শের ভিত্তিতে এসব পণ্য ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা জরুরি কেন?
ইডি শুধু একজন পুরুষের আত্মবিশ্বাসে নয়, সম্পর্কেও চাপ তৈরি করতে পারে। অনেক সময় সঙ্গী ভুলভাবে ভাবতে পারেন যে পুরুষটির আর আগ্রহ নেই। আবার পুরুষ নিজেও লজ্জায় বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেন।
খোলামেলা ও সম্মানজনক যোগাযোগ অনেক ভুল বোঝাবুঝি কমাতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসার প্রক্রিয়ায় সঙ্গীকেও যুক্ত করা যেতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
ইরেকশন তৈরি বা ধরে রাখতে সমস্যা যদি বারবার হয়, তা নিয়ে উদ্বেগ থাকে, অথবা একই সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রয়োজনে সাধারণ চিকিৎসক বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রাথমিক মূল্যায়ন করে ইউরোলজিস্ট বা অন্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে পারেন।
রোদসীর মতামত, ইরেকটাইল ডিসফাংশন মানেই পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলা নয়। এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। এর কারণ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে যৌন সক্ষমতা উন্নত করা সম্ভব।
তাই লজ্জা বা গোপনীয়তার কারণে সমস্যাটি দীর্ঘদিন এড়িয়ে না গিয়ে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
যৌনস্বাস্থ্যও স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা নয়—সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই লেখা সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য। ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা ওষুধ গ্রহণের সিদ্ধান্তের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।