রাতে ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে ওঠা অনেক পুরুষের কাছেই পরিচিত অভিজ্ঞতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে রাতে প্রস্রাবের প্রয়োজন বাড়তে পারে। তাই অনেকেই বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিক ধরে নেন—“বয়স হয়েছে, এমন তো হবেই।”
কিন্তু সব সময় বিষয়টি এত সরল নয়।
রাতে ঘুম থেকে উঠে প্রস্রাব করাকে
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় নকচুরিয়া বলা হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে এটি বেশি দেখা যেতে পারে,
তবে এর পেছনে শুধু বয়স নয়—প্রোস্টেটের সমস্যা, মূত্রথলি বা
মূত্রনালির সমস্যা, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত তরল গ্রহণ, কিছু ওষুধ, পা-গোড়ালিতে জমে থাকা
তরল কিংবা ঘুমের সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
তাই আসল প্রশ্ন হলো—কখন বিষয়টি সাধারণ পরিবর্তন, আর কখন
শরীরের সতর্কবার্তা?
একবার রাতে উঠলেই কি সমস্যা?
অবশ্যই নয়।
কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রাতে একবার
প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙতে পারে, এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে এই প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু যদি
নিয়মিতভাবে রাতে একাধিকবার উঠতে হয়, ঘুম বারবার ভেঙে যায় বা দিনের কাজকর্মে ক্লান্তি
তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
অর্থাৎ শুধু কতবার উঠছেন তা নয়, এটি
আপনার ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনে কী প্রভাব ফেলছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পুরুষের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট কি কারণ
হতে পারে?
হতে পারে। তবে এটিই একমাত্র কারণ
নয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেক পুরুষের প্রোস্টেট
বড় হতে পারে। এই অবস্থাকে বেনাইন প্রোস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া বা বিইচপি বলা হয়। এটি
ক্যানসার নয়। প্রোস্টেট বড় হলে মূত্রনালির ওপর চাপ পড়ে প্রস্রাবের প্রবাহে সমস্যা হতে
পারে।
তখন দেখা দিতে পারে—
১. বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন হওয়া।
২. রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব করতে ওঠা।
৩. প্রস্রাব শুরু করতে সময় লাগা।
৪. প্রস্রাবের ধারা দুর্বল বা থেমে থেমে
হওয়া।
৫. প্রস্রাবের পরও মূত্রথলি পুরোপুরি
খালি হয়নি বলে মনে হওয়া।
৬. প্রস্রাব শেষে ফোঁটা ফোঁটা পড়া।
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই যে প্রোস্টেট
বড় হয়েছে, তা বলা যায় না। বিভিন্ন সমস্যার উপসর্গ একে অন্যের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
তাই প্রয়োজনে চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।
শুধু প্রোস্টেট নয়, আরও কারণ থাকতে
পারে
বেশি পানি, চা বা কফি-
ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে বেশি তরল পান
করলে রাতে প্রস্রাবের প্রয়োজন বাড়তে পারে। চা-কফির মতো ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ও কিছু মানুষের
ক্ষেত্রে প্রস্রাবের তাগিদ বাড়াতে পারে। তাই নিজের অভ্যাসটি খেয়াল করুন।
তবে রাতে প্রস্রাবের ভয়েই সারাদিন
প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম পানি পান করা ঠিক নয়।
ডায়াবেটিস-
রক্তে শর্করা বেশি থাকলে শরীর অতিরিক্ত
প্রস্রাব তৈরি করতে পারে। ফলে দিনে যেমন বেশি প্রস্রাব হতে পারে, রাতে ঘুমও বারবার
ভাঙতে পারে। অতিরিক্ত তৃষ্ণার মতো অন্যান্য উপসর্গও থাকতে পারে।
তাই নতুন করে প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে
গেলে বিষয়টি শুধু বয়সের কারণে হচ্ছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
মূত্রনালির সংক্রমণ বা মূত্রথলির
সমস্যা-
মূত্রনালির সংক্রমণ বা মূত্রথলির
সমস্যাতেও ঘন ঘন প্রস্রাবের তাগিদ হতে পারে। এর সঙ্গে প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা,
তীব্র প্রস্রাবের বেগ, তলপেটে অস্বস্তি কিংবা প্রস্রাবের রং বা গন্ধের পরিবর্তন থাকতে
পারে।
পা বা গোড়ালি ফুলে থাকা-
দিনের বেলায় পা বা গোড়ালিতে অতিরিক্ত
তরল জমে থাকলে রাতে শুয়ে পড়ার পর সেই তরল রক্তসঞ্চালনে ফিরে গিয়ে কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবের
পরিমাণ বাড়াতে পারে।
ঘুমের সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে-
সব ক্ষেত্রে মূত্রথলিই যে ঘুম ভাঙার
কারণ, তা নয়। কেউ ঘুমের অন্য সমস্যায় জেগে উঠে তখন প্রস্রাব করতে পারেন। অর্থাৎ সমস্যাটি
বুঝতে শুধু প্রস্রাবের বিষয়টি নয়, ঘুমের ধরনও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না?
রাতে বারবার প্রস্রাবের পাশাপাশি
নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
১. প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া।
২. প্রস্রাব শুরু করতে সমস্যা হওয়া।
৩. প্রস্রাব থেমে থেমে হওয়া।
৪. প্রস্রাবের পরও মূত্রথলি খালি হয়নি
মনে হওয়া।
৫. প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা।
৬. প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত দেখা।
৭. প্রস্রাব আটকে যাওয়া বা একেবারেই
প্রস্রাব করতে না পারা।
৮. জ্বর, কাঁপুনি বা শরীর খারাপ লাগা
৯. তলপেট, কোমর বা যৌনাঙ্গের আশপাশে
ব্যথা।
১০. দিনের বেলাতেও অস্বাভাবিক ঘন ঘন প্রস্রাব
হওয়া।
এসব লক্ষণ থাকলে শুধু বয়সকে দায়ী
না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আবার একেবারেই প্রস্রাব না হলে অপেক্ষা
করবেন না।
কোনো পুরুষের যদি হঠাৎ একেবারেই প্রস্রাব
না হয়, বিশেষ করে তলপেটে তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া
প্রয়োজন। তীব্র প্রস্রাব আটকে যাওয়া জরুরি চিকিৎসার বিষয় হতে পারে।
নিজে থেকে প্রোস্টেটের ওষুধ খাবেন
না-
রাতে বারবার প্রস্রাব হচ্ছে দেখে
পরিচিত কারও পরামর্শে প্রোস্টেটের ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়।
কারণ একই ধরনের উপসর্গের পেছনে বিভিন্ন
কারণ থাকতে পারে। চিকিৎসক সাধারণত আপনার উপসর্গ কখন থেকে হচ্ছে, কতবার হচ্ছে, পানি
ও ক্যাফেইন গ্রহণের অভ্যাস, অন্যান্য রোগ ও ওষুধের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রয়োজন
অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা, প্রস্রাব বা রক্ত পরীক্ষা এবং অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
অর্থাৎ উপসর্গ দেখে নিজে রোগের নাম
ঠিক না করে আগে কারণটি জানা জরুরি।
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে কী তথ্য
রাখবেন?
আপনার সমস্যা বোঝাতে কয়েক দিনের একটি
ছোট মূত্রত্যাগের হিসাব রাখা কাজে লাগতে পারে।
লিখে রাখুন—
দিনে কখন কখন প্রস্রাব করছেন।
রাতে কয়বার ঘুম ভাঙছে।
কখন এবং কতটা পানি বা অন্য তরল পান
করছেন।
চা-কফি কতটা পান করছেন।
প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিক মনে
হচ্ছে কি না।
প্রস্রাবের ধারা দুর্বল কি না।
জ্বালা বা ব্যথা আছে কি না।
প্রস্রাবের পরও মূত্রথলি পূর্ণ মনে
হচ্ছে কি না।
চিকিৎসকেরাও অনেক সময় এ ধরনের ব্লাডার
ডায়েরি ব্যবহার করে উপসর্গের ধরন বোঝার চেষ্টা করেন।
যা মনে রাখা উচিত-
রাতে প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙা মানেই
রোগ—এমন নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে এই প্রবণতা
বাড়তে পারে। কিন্তু নিয়মিতভাবে ঘুম ব্যাহত হওয়া, রাতে বারবার উঠতে হওয়া কিংবা এর সঙ্গে
অন্য প্রস্রাবের উপসর্গ থাকা—এসবকে শুধু “বয়স হয়েছে” বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
পুরুষের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট একটি
সম্ভাব্য কারণ, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। ডায়াবেটিস, মূত্রনালি বা মূত্রথলির সমস্যা,
কিছু ওষুধ, তরল গ্রহণের অভ্যাস এবং ঘুমের সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই ভয় পাওয়ার দরকার নেই, আবার অবহেলাও
নয়।
লক্ষণটি লক্ষ্য করুন। নিজের থেকে
ওষুধ শুরু করবেন না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কারণ বয়স বাড়া স্বাভাবিক।
কিন্তু বয়সকে অজুহাত বানিয়ে শরীরের
সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
স্বাস্থ্যতথ্য: এই লেখা সাধারণ সচেতনতার
জন্য। এটি রোগ নির্ণয় বা ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পরামর্শের বিকল্প নয়। উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের
পরামর্শ নিন।
ঢাকা/টিএ