ফেসবুকে সুখী, বাস্তবে ক্লান্ত

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই মনে হয় সবাই যেন খুব ভালো আছে। কেউ সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে হাসছে, কেউ স্বামী-সন্তান নিয়ে রেস্টুরেন্টে, কেউ নতুন পোশাকে ঝলমলে ছবি দিচ্ছে।


কারও স্ট্যাটাসে ভালোবাসা, কারও জীবনে সাফল্য, কারও ছবিতে নিখুঁত সংসার।ছবিগুলো দেখে মনে হয়, পৃথিবীতে কষ্ট বুঝি শুধু আমারই।


কিন্তু আমরা ভুলে যাই ফেসবুক মানুষের পুরো জীবন দেখায় না, দেখায় জীবনের বেছে নেওয়া কয়েকটি মুহূর্ত।


একজন মানুষ হয়তো সারাদিন মানসিক চাপে ছিলেন, কিন্তু সন্ধ্যায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে একটা ছবি তুললেন।


কেউ হয়তো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে গভীর দূরত্ব অনুভব করছেন, অথচ বিবাহবার্ষিকীর ছবিতে লিখলেন—‘Alhamdulillah, together forever.’




কেউ হয়তো অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাচ্ছেন, কিন্তু নতুন পোশাক পরে ছবির ক্যাপশনে লিখছেন—‘Enjoying life.’

 

আমরা ছবিটা দেখি।


ছবির পেছনের গল্পটা দেখি না।


সুখেরও কি এখন প্রমাণ দিতে হয়?


আগে মানুষ সুখী হলে কাছের মানুষকে বলত। এখন অনেক সময় মনে হয়, সুখী হওয়ার পাশাপাশি সুখী এটা প্রমাণ করাও জরুরি।


নতুন ফোন কিনেছি—ছবি।


ঘুরতে গেছি—ছবি।


জন্মদিন—ছবি।


বিবাহবার্ষিকী—ছবি।


সন্তানের ভালো ফল—ছবি।


এমনকি মন খারাপের দিনেও কখনো কখনো পুরোনো কোনো সুন্দর ছবি দিয়ে লিখি—‘Life is beautiful.’


কিন্তু সত্যিকারের সুখের জন্য কি এত দর্শক দরকার?


হয়তো দরকার নেই।


কারণ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর অনেকগুলোই ক্যামেরাবন্দি হয় না।


আরোও পড়ুন: মানুষটা চলে যায়, কিন্তু মন কেন থেকে যায় তার কাছেই?


মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে বসে গল্প করা, সন্তানের ঘুমন্ত মুখ দেখা, প্রিয় মানুষটির সঙ্গে এক কাপ চা ভাগ করে নেওয়া, অনেকদিন পর নিজের জন্য একটু সময় বের করা এসব মুহূর্তের কোনো লাইক দরকার হয় না।


তুলনা আমাদের ক্লান্ত করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে বড় ফাঁদগুলোর একটি হলো তুলনা।


আমরা নিজের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে অন্যের জীবনের ‘হাইলাইট’ তুলনা করি।অন্যের সাজানো ঘর দেখে নিজের ঘরকে অগোছালো মনে হয়।


অন্যের ভ্রমণের ছবি দেখে নিজের জীবনকে একঘেয়ে মনে হয়।


অন্যের সন্তানের সাফল্য দেখে নিজের সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়।


অন্যের সুখী দাম্পত্য দেখে নিজের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন জাগে।


কিন্তু আমরা জানি না, সেই মানুষটির ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার পর কী ঘটে।


যে মানুষটিকে দেখে মনে হয় তার জীবনে কোনো সমস্যা নেই, সেও হয়তো কোনো এক রাতে বালিশে মুখ লুকিয়ে কেঁদেছে।


‘আমি ভালো আছি’—সবসময় সত্যি নয়


কখনো কখনো ‘ভালো আছি’ কথাটাও এক ধরনের ঢাল।


মানুষ সবসময় তার দুর্বলতা দেখাতে পারে না।


সব কষ্ট বলা যায় না।


সব সম্পর্কের সমস্যা প্রকাশ করা যায় না।সব আর্থিক সংকটের কথা বন্ধুদের জানানো যায় না।


তাই মানুষ হাসে।


ছবি তোলে।


সুন্দর ক্যাপশন লেখে।


তারপর ফোনটা রেখে আবার নিজের বাস্তব জীবনের কাছে ফিরে যায়।


এটা ভণ্ডামি নয় সবসময়। অনেক সময় এটা মানুষের নিজেকে সামলে রাখার একটা উপায়।


তাহলে কি সোশ্যাল মিডিয়া খারাপ?


না। সোশ্যাল মিডিয়া নিজে খারাপ নয়। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা অন্যের ভার্চুয়াল জীবনকে নিজের বাস্তব জীবনের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলি।


ফেসবুকে কারও ৫০০টি ছবি থাকতে পারে, কিন্তু তার জীবনে শান্তি নাও থাকতে পারে। আবার যে মানুষটি মাসের পর মাস কিছু পোস্ট করেন না, তার জীবনও যে অসুখী এমন নয়।




জীবনের মূল্য লাইক, কমেন্ট, শেয়ার কিংবা ফলোয়ার দিয়ে মাপা যায় না।কিছু সুখ একান্ত ব্যক্তিগত।


কিছু অর্জন নীরবে উপভোগ করাই সুন্দর।


কিছু কান্না প্রকাশ না করেও মানুষ বেঁচে থাকে।


নিজের জীবনে ফিরে আসা দরকার


দিনের শেষে প্রশ্নটা হওয়া উচিত,


‘অন্যরা আমাকে কতটা সুখী মনে করছে?নয়।


‘আমি নিজে কতটা শান্তিতে আছি?


নিজের জীবনের সঙ্গে অন্যের জীবন তুলনা করা বন্ধ করতে হবে।


কারও সুখ দেখে নিজের জীবনকে ছোট করা যাবে না।কারও সাফল্য দেখে নিজের পথকে ব্যর্থ ভাবা যাবে না।কারণ প্রত্যেক মানুষের গল্প আলাদা।


কারও বসন্ত আগে আসে, কারও একটু পরে।


আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফেসবুকে সুন্দর দেখানোর চেয়ে বাস্তবে ভালো থাকা অনেক বেশি জরুরি।


হয়তো আপনার জীবন নিখুঁত নয়।হয়তো সংসারে সমস্যা আছে।হয়তো অর্থনৈতিক চাপ আছে।


হয়তো সম্পর্কের কোথাও অভিমান জমে আছে।


হয়তো আপনি ভীষণ ক্লান্ত।


তাতে আপনি ব্যর্থ নন।


আপনি মানুষ।


আর মানুষ সবসময় হাসে না।


কখনো কাঁদে, কখনো থামে, কখনো ভেঙে পড়ে আবার নিজের মতো করে উঠে দাঁড়ায়।


তাই আজ ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে যদি মনে হয়,


‘সবাই ভালো আছে, শুধু আমিই নেই একবার থামুন।


মনে রাখুন, আপনি অন্যের জীবনের ছবিগুলো দেখছেন।


তাদের পুরো গল্পটা নয়।


আর আপনার নিজের জীবনের গল্প?


সেটা এখনো লেখা হচ্ছে।


সেটাকে অন্যের টাইমলাইনের সঙ্গে তুলনা না করে, নিজের মতো করে বাঁচুন।


কারণ শেষ পর্যন্ত


ফেসবুকে সুখী দেখানোর চেয়ে, বাস্তবে শান্তিতে থাকা অনেক বেশি সুন্দর।


ঢাকা/টিএ
 

sidebar ad