যে ৭ উপায়ে একজন নারী সুরক্ষিত অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারেন


ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দেরি করার প্রয়োজন নেই। আর্থিক নিরাপত্তা মানেই বিপুল অর্থের মালিক হওয়া নয়। বরং নিজের আয়-ব্যয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা, নিয়মিত সঞ্চয়, জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনাই তৈরি করতে পারে আর্থিক নিরাপত্তার ভিত। নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্যারিয়ার বিরতি, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা আয় কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাহলে কীভাবে নিজের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করবেন? জেনে নিন সাতটি কার্যকর পদ্ধতি।


১. নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিজেই জানুন


আর্থিক নিরাপত্তার প্রথম শর্ত হলো—আপনার টাকা কোথায় যাচ্ছে, তা জানা। মাসের শুরুতে আয় এবং নিয়মিত খরচের একটি তালিকা তৈরি করুন। বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা বিনোদন—সব খরচ হিসাবের মধ্যে রাখুন। শিক্ষার্থী হলে হাতখরচের হিসাব রাখতে পারেন। চাকরিজীবী হলে বেতনের কত অংশ প্রয়োজনীয় খাতে যাচ্ছে, কতটা সঞ্চয় হচ্ছে—তা দেখুন। গৃহিণীর ক্ষেত্রেও সংসারের আয়-ব্যয়ের ধারণা থাকা জরুরি। উদ্যোক্তার জন্য ব্যবসার অর্থ ও ব্যক্তিগত অর্থ আলাদা রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ।


মাস শেষে হিসাবটি পর্যালোচনা করলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের জায়গাগুলো সহজেই চিহ্নিত করা যায়। অর্থাৎ, টাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ শুরু হয় টাকার হিসাব জানার মাধ্যমে।


২. আয় হাতে আসার পর নয়, আগে সঞ্চয় করুন


‘মাস শেষে টাকা থাকলে সঞ্চয় করব’—এই অভ্যাস বদলানো দরকার। বরং আয় হাতে পাওয়ার পরই নির্দিষ্ট একটি অংশ আলাদা করে রাখুন। সম্ভব হলে আয়ের ১০ থেকে ২০ শতাংশ দিয়ে শুরু করতে পারেন। তবে সবার আয় ও দায়িত্ব এক নয়। তাই নির্দিষ্ট শতাংশ ধরে রাখতে না পারলেও সমস্যা নেই; সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত সঞ্চয় করাই মূল কথা। শিক্ষার্থী সামান্য হাতখরচ, চাকরিজীবী বেতন, গৃহিণী সংসারের বাজেট থেকে সাশ্রয় করা অর্থ কিংবা উদ্যোক্তা ব্যবসার লাভের একটি অংশ সঞ্চয় করতে পারেন।

ছোট অঙ্ককে ছোট করে দেখবেন না। নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাসই ভবিষ্যতে বড় আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করে।


৩. গড়ে তুলুন জরুরি তহবিল


হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া, ব্যবসায় লোকসান, অসুস্থতা কিংবা বড় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয়—জীবনে এমন পরিস্থিতি আসতেই পারে। তাই আলাদা একটি জরুরি তহবিল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্য হতে পারে অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় জীবনযাপনের খরচের সমান অর্থ জমা করা। এই অর্থ এমন জায়গায় রাখুন, যেখান থেকে প্রয়োজনের সময় সহজে টাকা পাওয়া যায় এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে হয় না। আর্থিক পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের কাছেও জরুরি তহবিলকে আর্থিক স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। নারীর জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জরুরি সময়ে নিজের হাতে থাকা অর্থ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বাড়ায়।


৪. শুধু সঞ্চয় নয়, আর্থিক শিক্ষা অর্জন করুন


ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, সঞ্চয় করেন—এতেই আর্থিকভাবে সচেতন হওয়া শেষ নয়। টাকা কীভাবে নিরাপদে রাখা যায়, বিনিয়োগ কী, বিমা কেন প্রয়োজন, ঋণের সুদ কীভাবে কাজ করে, মূল্যস্ফীতি সঞ্চয়ের ওপর কী প্রভাব ফেলে—এসব বিষয়ও জানা দরকার। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে ‘টাকার বিষয়টি পরিবারের অন্য কেউ দেখেন’—এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ। সংসারে স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্য অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে যুক্ত থাকলেও নিজের অর্থ ও সম্পদের বিষয়ে নিজেরও পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও আর্থিক জ্ঞান ও অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণকে নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


৫. সম্ভব হলে একাধিক আয়ের পথ তৈরি করুন


একটি আয়ের উৎসের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা আর্থিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই নিজের দক্ষতা ও সময় অনুযায়ী বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করার চেষ্টা করা যেতে পারে। শিক্ষার্থী টিউশনি, ফ্রিল্যান্সিং বা কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে আয় করতে পারেন। চাকরিজীবী নিজের পেশাগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে পরামর্শক কাজ, প্রশিক্ষণ কিংবা অনলাইনভিত্তিক কাজ করতে পারেন। গৃহিণীরা রান্না, সেলাই, হস্তশিল্প বা অনলাইন ব্যবসার মতো উদ্যোগ নিতে পারেন। উদ্যোক্তারা নতুন পণ্য বা সেবা যুক্ত করার মাধ্যমে আয়ের পরিধি বাড়াতে পারেন। তবে বাড়তি আয়ের নামে অতিরিক্ত ঋণ বা অযাচাইকৃত অনলাইন ব্যবসায় ঝুঁকে পড়া ঠিক নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত—দক্ষতা বাড়িয়ে টেকসই আয় তৈরি করা।


৬. বুঝে-শুনে বিনিয়োগ করুন


সঞ্চয়ের পরবর্তী ধাপ হলো অর্থকে দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগানো। তবে বিনিয়োগ মানেই বেশি ঝুঁকি নেওয়া নয়। নিজের আর্থিক লক্ষ্য, সময়সীমা ও ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা বুঝে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

ব্যাংকের বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্প, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র, মিউচুয়াল ফান্ড বা অন্যান্য বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে আগে জানুন। কোনো একটি খাতে সব টাকা না রেখে ঝুঁকি ও প্রয়োজন অনুযায়ী বৈচিত্র্য আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—শুধু অন্যের পরামর্শ শুনে বিনিয়োগ করবেন না। কোনো পণ্য বা স্কিমে টাকা দেওয়ার আগে তার নিয়ম, ঝুঁকি, সম্ভাব্য রিটার্ন ও টাকা তোলার শর্ত বুঝে নিন। ‘বিনিয়োগ বুঝি না’—এই ভয়কে দূর করার প্রথম ধাপ হলো শেখা।


৭. দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণ করুন


আজ কত টাকা সঞ্চয় করলেন, শুধু সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। পাঁচ, দশ কিংবা বিশ বছর পর আপনি কোথায় থাকতে চান—সেটিও ভাবতে হবে। নিজের বাড়ি, সন্তানের শিক্ষা, ব্যবসা সম্প্রসারণ, অবসর জীবন কিংবা ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যয়—যে লক্ষ্যই হোক, তার জন্য আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করুন। লক্ষ্যকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করুন। যেমন—এক বছরে কত টাকা সঞ্চয় করবেন, পাঁচ বছরে কত সম্পদ তৈরি করতে চান কিংবা অবসরের জন্য মাসে কত টাকা রাখতে পারবেন। পরিস্থিতি বদলালে পরিকল্পনাও বদলাতে হবে। আয় বাড়লে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়াতে পারেন; আবার আয় কমে গেলে সাময়িকভাবে পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করতে পারেন।


অর্থনীতিবিদের পরামর্শ: নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে নিজেই থাকুন

নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে অর্থনীতি ও বিনিয়োগ শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ উমা শশিকান্ত, ভারতের Centre for Investment Education and Learning-এর চেয়ারপারসন বলেন, ‘‘নারীর আর্থিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে শুধু খরচ করার স্বাধীনতা নয়, সম্পদ তৈরি ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।’


তাঁর মতে, একজন নারীকে শুধু সংসারের অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখলেই হবে না; তাঁকে সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও সম্পদ তৈরির সিদ্ধান্তেও অংশ নিতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিতে হবে।


অর্থাৎ, পরিবারের আয় যতই হোক, নিজের নামে সঞ্চয় বা সম্পদ তৈরির পরিকল্পনা থাকা জরুরি। আর্থিক স্বাধীনতার অর্থ একা সবকিছু করা নয়; বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করা।


আজ থেকেই তাই নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখুন, নিয়মিত সঞ্চয় করুন, জরুরি তহবিল গড়ে তুলুন, আর্থিক জ্ঞান বাড়ান, আয়ের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করুন এবং বুঝে বিনিয়োগ করুন।


sidebar ad