সব বিচ্ছেদের সাক্ষী আদালত হয় না। কিছু বিচ্ছেদ হয় ঘরের ভেতর। দরজা-জানালা বন্ধ থাকে, সংসারও টিকে থাকে। তবু একদিন বুঝতে পারা যায়,দুজন মানুষ পাশাপাশি থেকেও আর একে অপরের কাছে পৌঁছাতে পারেন না। এটাই সাইলেন্ট ডিভোর্স। একটি ছাদ। একটি ঘর। হয়তো একই বিছানা, পাশাপাশি দুটি বালিশ। অথচ মাঝখানে জমে আছে বছরের পর বছর না-বলা অভিমান, অপূর্ণতা আর নীরবতার এক বিশাল সমুদ্র।সকালে একই টেবিলে বসে চা খাওয়া হয়, কিন্তু কেউ আর জিজ্ঞেস করে না, রাতে ঠিকমতো ঘুমিয়েছিলে?রাতে একই ছাদের নিচে ঘুম আসে, কিন্তু একে অপরের ক্লান্তির খবর কেউ রাখে না। একসময় যে মানুষটির জন্য অপেক্ষা করতে ভালো লাগত, এখন তার বাড়ি ফেরা বা না-ফেরা কোনোটাই আর হৃদয়ে ঢেউ তোলে না।কিছুই যেন যায় আসে না। তবু সংসার থেমে থাকে না। বাজার হয়। রান্না হয়। স্কুলের ফি জমা পড়ে। বিদ্যুৎ বিল দেওয়া হয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, কী সুন্দর সংসার! অথচ সেই সংসারের ভেতরে অনেক আগেই ভালোবাসার শেষ প্রদীপটি নিভে গেছে।
এই নীরবতার সবচেয়ে ছোট, অথচ সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয় সন্তান। সে বুঝতে পারে, মা-বাবা আগের মতো কথা বলেন না। একজনের কথা আরেকজনের কাছে পৌঁছে দিতে হয় তাকে। কখনো সে ইচ্ছে করে বেশি হাসে, বেশি দুষ্টুমি করে, শুধু এই আশায় হয়তো মা-বাবা একসঙ্গে হাসবেন। সে জানে না সাইলেন্ট ডিভোর্স শব্দের অর্থ। কিন্তু সে নীরবতার ভাষা পড়তে শিখে যায়।মা মাঝরাতে চুপচাপ চোখ মুছেন। বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। দুজনেই নিজেদের ভাঙা মন লুকিয়ে রাখেন, কারণ তারা চান না সন্তানের পৃথিবীটাও ভেঙে যাক।তাই তারা থেকে যান।
ভালোবাসার জন্য নয়, দায়িত্বের জন্য। নিজেদের সুখের জন্য নয়, সন্তানের নিশ্চিন্ত ঘুমের জন্য।মা নিজের স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে ভাঁজ করে তুলে রাখেন এলোমেলো আলমারি র কোন এক কোনায়। বাবা নিজের ক্লান্তিকে লুকিয়ে প্রতিদিন নতুন দিনের যুদ্ধ শুরু করেন। বাইরে থেকে তারা স্বাভাবিক। ভেতরে ভেতরে তারা দুজনেই নিঃশব্দে ক্ষয়ে যেতে থাকেন।
অনেকে প্রশ্ন করেন, তাহলে আলাদা হয়ে যান না কেন?
কিন্তু জীবন কখনো এত সহজ নয়।অনেক সিদ্ধান্ত শুধু দুজন মানুষের হয় না। সেখানে জড়িয়ে থাকে সন্তানের ভবিষ্যৎ, বহু বছরের স্মৃতি, দায়িত্ব, সামাজিক বাস্তবতা, আর কখনো কখনো একটি ক্ষীণ আশা,হয়তো কোনো একদিন আবার সব ঠিক হবে।
সময় থেমে থাকে না। সন্তান বড় হয়ে নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে সন্তানকে ঘিরে এত বছর একসঙ্গে থাকা, সেই সন্তান একদিন নিজের আকাশ খুঁজে নেয়। তারপর? তারপর শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ নীরবতা। বার্ধক্যে এসে মানুষ বুঝতে পারে, অর্থ নয় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একজন মানুষের, যার কাছে নিজের ভয়, কষ্ট আর স্মৃতিগুলো নির্ভয়ে বলা যায়।একদিন অসুস্থ শরীর বিছানায় পড়ে থাকে। ওষুধ আছে, ডাক্তার আছে, কিন্তু সেই হাতটি নেই, যে হাত কপালে আলতো করে ছুঁয়ে বলবে, আমি আছি।আলঝেইমার্সে স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া মানুষটিও অনেক সময় একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর খোঁজে। কারণ বার্ধক্যে মানুষের সবচেয়ে বড় ওষুধ ভালোবাসা, আর সবচেয়ে বড় অসুখ একাকীত্ব।
সাইলেন্ট ডিভোর্সের ট্র্যাজেডি এখানেই। এখানে আদালতের রায় নেই, কাগজে স্বাক্ষর নেই, আইনি বিচ্ছেদ নেই। আছে শুধু প্রতিদিন একটু একটু করে দুটি হৃদয়ের দূরে সরে যাওয়া। ভালোবাসা সব সময় একদিনে মরে না। কখনো কখনো তা প্রতিদিন একটু একটু করে নিভে যায়। আর যখন শেষ আলোটুকুও নিভে যায়, তখন সংসারট বেঁচে থাকে,শুধু সম্পর্কটা আর বেঁচে থাকে না। যে সংসারে কথাগুলো মরে যায়, সেখানে একদিন ভালোবাসাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর যে ভালোবাসা ক্লান্ত হয়ে যায়, তার শব্দ হয় না শুধু নীরবতা হয়।
লেখা- ইশরাত জাহান ইনা