মেনোপজ মানেই কি বাড়তি ওজন?

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬

মেনোপজ মানেই কি বাড়তি ওজন?

বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে হঠাৎ করেই কি মনে হচ্ছে, আগের মতো খাওয়া-দাওয়া না করলেও ওজন বেড়ে যাচ্ছে? বিশেষ করে পেটের চারপাশে মেদ কিছুতেই কমছে না? বয়স বাড়ার সাথে সাথে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি হরমোনের অনেক পরিবর্তন হয়ে থাকে। আর এই কারণে দেখা যায় মাঝবয়সে অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি পায়। আজ আমরা এমন কিছু টিপস নিয়ে আলোচনা করবো যা অনুসরণ করে সুস্থ ও ফিট থাকা যাবে।


নারী দেহে মাসিক বা ঋতুস্রাব যেমন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তেমনি মেনোপজের ব্যাপারটিও একই। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর, ঋতুচক্রের যে সাইকেল রয়েছে তা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একেই মেনোপজ বলে। যাকে বাংলায় বলে রজোনিবৃত্তি। নারীদেহে ডিম্বাশয় একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। এখানে থেকে নিঃসৃত হরমোন মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর হরমোনের পরিমান কমতে থাকে। একসময় এতোটাই কমে যায় যা আর মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। যার ফলাফল মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থা এক নাগাড়ে ১২ মাস টানা চললে তখন তাকে মেনোপজ বলে। এই সময়ে মেজাজ পরিবর্তন, ক্লান্তি, অত্যধিক গরম লাগা, ক্ষুধা কমে যাওয়ার মত সমস্যা দেখা যায়। পাশাপাশি ওজনও বেড়ে যায়। মেনোপজের সময় ওজন বৃদ্ধি স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতিকর হতে পারে। শরীরের কেন্দ্রীয় অংশে অর্থাৎ পেট, কোমর ও উরুতে জমে থাকা চর্বি হতে পারে অনেক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ। 


মেনোপজের আগে, চলাকালীন এবং পরে; শরীরের ইস্ট্রোজেনের মাত্রা অনেক হ্রাস পেতে শুরু করে এবং বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হতে শুরু হয়ে যায়। তাই এই বয়সে এসে হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া দেহের ওজন কমানো কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু নয়। এর জন্য যা করনীয়-


নিয়মিত শরীরচর্চা করা: সুস্থ ও ফিট থাকার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম চর্চার কোন বিকল্প নেই। আর মেনোপজের পর ওজন কমানোর জন্য এই ব্যায়াম আরও বেশি করে দরকার। প্রথম দিকে খুব হার্ড ব্যায়ামের দিকে না যেয়ে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ বা বিনোদনমূলক ব্যায়াম করা যেতে পারে। যেমন খুব সকালে শান্ত পরিবেশে হাঁটতে যাওয়া, সাঁতার কাটা, সুবিধা থাকলে সাইকেল চালানো। জরুরী না যে ভারী ব্যায়াম করে সুস্থ থাকতে হবে। বরং প্রথম দিকে যতটুকু পারা যায় তাই দিয়ে শুরু করা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে অনুশীলনের মাঝে কিছুটা সামঞ্জস্য করতে হবে। তবে এতে উৎসাহ হারিয়ে ফেললে হবেনা। বরং নিজেকে এর জন্য উদ্দীপনা তৈরী করতে হবে। ধীরে ধীরে নিজের লাইফ স্টাইলের সাথে অনুশীলনের রুটিন এমনভাবে সেট করতে হবে যাতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত কিছু সময়ে কঠোর ও মাঝারি ব্যায়াম করা যায়। 


বসে থাকার চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম: এই ফর্মুলাটি অতি সহজ। শরীর যতবেশি গতিতে থাকবে, ততবেশি ক্যালোরি পোড়াবে। সারাদিন যতটা সম্ভব দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস করলে ভাল। এটি কেবল ক্যালোরি পোড়ায়, বাড়াবে না। উপরন্তু এতে অনেক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধেও সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘক্ষন বসে থাকা পেটের চর্বি এবং সেই সাথে লিভারের চারপাশে জমে থাকা চর্বিগুলোর সাথে যুক্ত, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং হার্টের ঝুঁকি বাড়ায়। দাঁড়িয়ে থাকার মানে এই নয় যে, সারাদিন একস্থানে অনড় হয়ে থাকা। ঘরের মধ্যেই কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। কাছে কোথাও যেতে হলে গাড়ি ব্যাবহারের পরিবর্তে পায়ে হেঁটে যাওয়া যেতে পারে। 


কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের প্রতি খেয়াল রাখা: ওজন নিয়ন্ত্রণের বড় হাতিয়ার হচ্ছে খাবারের দিকে মনোযোগী হওয়া। সমস্ত পুষ্টি সমানভাবে তৈরী হয়না। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাস্তা এবং রুটির মতো প্রক্রিয়াজাত বা পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার পেটের অতিরিক্ত চর্বির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কারন। শর্করা মধ্যবয়সী নারীদের জন্য শত্রু। কার্বোহাইড্রেট আমাদের শরীরে চিনিতে পরিনত হয়। তাই অতিরিক্ত না খেয়ে সঠিক সময়ে সঠিক খাবার পরিমিত পরিমানে আহার করা উত্তম। 


শরীরচর্চায় বৈচিত্র্যতা আনয়ন: মাঝবয়সে এসে নিয়মিত শরীরচর্চা করা অসম্ভব না হলেও উদ্যমের অভাবে এই অভ্যাস ধরে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আর প্রতিদিন একই ব্যায়াম করতে একঘেয়েমিও পেয়ে বসে। এর থেকে মুক্তির পথ হল শরীরচর্চায় নতুন নতুন বৈচিত্র্য নিয়ে আসা। যেমন ইয়োগা, মেডিটেশন বা অনেক সময় মিউজিক ছেড়ে জুম্বা ড্যান্সও করা যেতে পারে। 


পর্যাপ্ত ঘুম: ঘুম এবং শরীর ভালো থাকা একই সূত্রে গাঁথা। এই সময় ঘুম না হওয়া একটি কমন সমস্যা। যার দরুণ পুরো সময় শরীর ক্লান্ত হয়ে থাকে। কোন কাজেই উদ্যম পাওয়া যায়না। তাই যদি রাত জাগার অভ্যাস থাকে তবে তা অতিসত্বর পরিহার করতে হবে। ঘুমানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্বাচন করে রাখতে হবে। তার আগেই রাতের খাবার সেরে সব কাজ শেষ করে রাখতে হবে। সকল ইলেকট্রনিক ডিভাইস হাতের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে ভালোভাবে ঘুমের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। 


যৌথভাবে ব্যায়াম করা: নিজেকে একটিভ ও প্রাণচাঞ্চল্য রাখতে শরীরচর্চার কোন বিকল্প নেই তা তো আগেই জেনেছি আমরা। এইক্ষেত্রে মোটিভেশনের অনেক প্রয়োজন হয়। আর এর জন্য ব্যায়ামের পার্টনার থাকলে তো কোন কথাই নেই। এককভাবে ব্যায়াম করার চাইতে অনেকে মিলে এই প্র্যাকটিস করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। 


তবে যে পদ্মতিগুলোই অনুসরণ করা হোক না কেন এটা মনে রাখতে হবে যে সবকিছুই নির্ভর করে নিজ ইচ্ছাশক্তির উপর। নিজে যতবেশি প্রচেষ্টা করা হবে, সফলতা তত বেশি তাড়াতাড়ি নিজের কাছে ধরা দিবে।


লেখা- শায়লা জাহান

sidebar ad