মা-ই কি যথেষ্ট নন?

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬

মা-ই কি যথেষ্ট নন?

“কোন কালে একা হয়নি ক জয়ী, পুরুষের তরবারি

প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে, বিজয়ীলক্ষ্মী নারী।’’


প্রাগৈতিহাসিক কাল ধরেই নারী পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সভ্যতার উন্মেষ। নারীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা, তাদের অবদান সব কিছু নিয়েই সাহিত্যে রচিত হয়েছে অসংখ্য রচনার। কিন্তু বাস্তবতা কি বলে? সমাজের মানদন্ডে প্রাপ্য স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নারীরা কি আসলেই মূল্যায়িত না এগুলো সবই ফাঁকা বুলি সেটাই মূখ্য বিষয়। 


ব্যস্তময় সকাল। ছোট্ট আরিশার (ছদ্মনাম) হাত ধরে স্কুলের অফিসে দাঁড়িয়ে আছেন তার মা। চোখে মুখে আনন্দের ছটা নিয়ে মায়ের হাত ধরে নতুন স্কুল জীবনের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে সে। ভর্তি ফরম পূরণ করতে যেয়ে পিতার নাম ঘরটিতে এসে থমকে যায় আরিশার মা। সেই কবে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সব পাঠ চুকে গেছে। অফিস সহকারীর ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে শান্ত গলায় জানায়, “ওর বাবার সাথে আমাদের যোগাযোগ নেই বহু বছর। আমি একাই ওর অভিভাবক। শুধু আমার নাম দিলেই হবে?” লোকটি যেনো কিছুটা বাঁকা দৃষ্টিতে জানিয়ে দেয় যে তা হবে না। পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা আরিশা শক্ত করে তার মায়ের হাত চেপে ধরলো আর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। যেনো তার ছোট্ট চোখে প্রশ্ন ঝরে পড়ছে- “মা তুমি কি আমার অভিভাবক নও?” এই প্রশ্নটা শুধু একটা শিশুর নয়। এমনো হাজারো প্রশ্ন মনে ভিড় জমে এই দেশের অসংখ্য একক মায়েরও। 


নারীর আসলেই পরিচয় কি? বাবা, ভাই, স্বামী বা ছেলে ছাড়া কি আসলেই তার আর কোন পরিচয় নেই? ভুললে চলবেনা এই নারীর মাঝেই বাস করে এক স্নেহময়ী মায়ের জাত, একটি জাতির ভবিষ্যৎ সন্তানকে সুষ্ঠুভাবে লালন- পালনের মাধ্যমে তাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সফলতার লক্ষ্যে পৌঁছাতে মায়ের অবদান কোন অংশে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। শুধু তাই নয় দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক এমন অনেক পিতার অবর্তমানেও নিজের সমস্ত সুখ জলাঞ্জলি দিয়ে সন্তানের একক অভিভাবক হিসেবে যোগ্যতার সাথে মায়ের ভূমিকা পালনের অনেক নিদর্শনও রয়েছে। যে মা সন্তানের জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে রাত জেগে তার দেখভাল করা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া, ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করা- সকল ক্ষেত্রেই নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয়; সেই হয় উপেক্ষিত। অভিভাবক হিসেবে সন্তানের পিতা-মাতার উভয়ের সম- মর্যাদা থাকলেও, এতো কিছুর পরেও শিক্ষা ও চাকরী জীবনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাবার পরিচয়ই যেন মূখ্য হয়ে উঠে। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে একক অভিভাবক হিসেবে সমস্ত কিছুতে কাগজের একটি ঘরে এসে কেন তাঁকেই বারবার প্রমাণ দিতে হয় যে তিনিই সন্তানের অভিভাবক?  


কিন্তু আশার প্রদীপ জ্বলে উঠেছে। শিক্ষাসহ প্রয়োজনীয় সব ফরম পূরণের ক্ষেত্রে অভিভাবকের নামের জায়গায় বাবার নাম ছাড়াও আইনগতভাবে শুধুমাত্র মায়ের নাম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি, বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মোঃ খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেন যে, একজন মা একাই সন্তানের আইনগত অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারেন। ঐতিহাসিক এই রায়ের পথ কিন্তু এতো সুগম ছিলোনা। এর পেছনের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের যেতে হবে পনের বছর পিছনে। ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০০৭ সালে এপ্রিল মাসে বিভিন্ন সংবাদপত্রে “বাবার পরিচয় নেই, বন্ধ হলো মেয়ের পড়ালেখা’’ শীর্ষক সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে। প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরিক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ফরমে তথ্য পূরণের ক্ষেত্রে বাবার নাম পূরণ করতে না পারার কারনে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড সে তরুনীকে প্রবেশপত্র দিতে অস্বীকৃতি জানায়। উল্লেখ্য যে, মা ও সন্তানকে কোনরুপ স্বীকৃতি না দিয়ে দায়িত্বহীন বাবার চলে যাওয়ার পর ওই তরুনী তার মায়ের একক ছত্রচ্ছায়ায় বড় হয়ে উঠে। পরবর্তীতে এই ঘটনার পর্যাপ্ত অনুসন্ধান করে মায়ের অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠার দাবীতে, শুধু মায়ের নাম ব্যবহার করলে পরীক্ষায় ফরম অপূর্ণ বিবেচিত হবে কেন; তা জানতে চেয়ে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং নারীপক্ষ যৌথভাবে জনস্বার্থে রিট দায়ের করে। ২০২১ সালের ৬ জুন মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্ট আবেদনকারীদের পক্ষে একটি সম্পূরক হলফনামা আবেদন আকারে দাখিল করে। রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট রায় ঘোষণার জন্য ২৪ জানুয়ারি ধার্য করেন। কালজয়ী এই রায়ের ফলে এখন থেকে বাবার নামের পাশাপাশি আরও দুটি অপশন যুক্ত হলো। এতে করে কেউ চাইলে বাবার পরিচয় ব্যবহার না করেও ফরম পূরণের সময় মা কিংবা আইনগতভাবে বৈধ অভিভাবকের নাম লিখতে পারবেন। এ যেনো মায়ের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভে এক বড় ধরনের সাফল্য সংযোজিত হলো। 


এখন প্রশ্ন হলো, যুগান্তকারী এই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র কি? সব জায়গায় কি এটি কার্যকর? উত্তর হলো, কাগজে-কলমে বা আইনিভাবে এটা বড় অগ্রগতি হলেও, মাঠপর্যায়ে বা বাস্তব জীবনে শতভাগ কার্যকারিতা পেতে এখনো কিছু জটিলতা পোহাতে হয়। শিক্ষা বোর্ডগুলোর স্পষ্ট নির্দেশনার কারণে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে শুধু মায়ের নাম ব্যবহার করা যাবে। পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সরকারী ফরমে বাবার নাম না থাকলেও কেবল মায়ের নাম দিয়ে আবেদন করা যাবে। এছাড়াও, এই কারণে কোন শিশুকে শিক্ষা বা সরকারী সেবা থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা। 

তাহলে কি সমস্যা পুরোপুরি শেষ?

না। 


সন্তানের সম্পত্তি বা কিছু আইনি প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে পুরনো আইনের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। অনেক সময় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা বা স্কুল কতৃপক্ষ আদালতের রায় সম্পর্কে সম্পর্ণ অবগত থাকেন না। ফলে তারা পুরনো নিয়মেই সব কাজ করে থাকেন। এতে একক মায়েদের জন্য বিষয়টি অনেক জটিলতার সৃষ্টি করে। 


আদালত মাকে সন্তানের একক অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু দেশের প্রতিটি অফিস, স্কুল, সমাজ কি সত্যিই সেই স্বীকৃতি দিতে শিখেছে? এই অধিকার সুবিধা প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এবং সব প্রতিষ্ঠানে এর অবাধ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক নজরদারি ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সমানভাবে প্রয়োজন।


লেখা- শায়লা জাহান

sidebar ad