আপনার ব্যবসায় এক লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। খরচ বাদ দিয়ে লাভও হচ্ছে। কিন্তু মাস শেষে সরবরাহকারীর বিল দিতে গিয়ে দেখলেন, হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই। কারণ, বিক্রির টাকা এখনো ক্রেতার কাছে আটকে আছে।
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি পরিচিত সমস্যা। বিক্রি বাড়ছে, ক্রেতা বাড়ছে, হিসাবের খাতায় লাভও দেখা যাচ্ছে—অথচ ব্যবসা চালানোর মতো নগদ অর্থ হাতে থাকছে না।
মনে রাখতে হবে, বিক্রি হওয়া আর বিক্রির টাকা হাতে আসা এক বিষয় নয়।
পণ্য বিক্রির পর টাকা পেতে দেরি হলে কর্মীদের বেতন, কাঁচামাল কেনা কিংবা সরবরাহকারীর বিল পরিশোধে সমস্যা হতে পারে। তাই বাকিতে বিক্রি শুধু বিক্রির সিদ্ধান্ত নয়; এটি ব্যবসার অর্থ ব্যবস্থাপনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাকিতে বিক্রির ৭টি ঝুঁকি ও সমাধান
১. পরিচিত ক্রেতা বলেই যাচাই ছাড়া বাকি দেওয়া
“মাস শেষে টাকা দেব”, “পরের সপ্তাহে পরিশোধ করব”—এমন প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে অনেক ব্যবসায়ী পণ্য সরবরাহ করেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর টাকা পরিশোধ এক বিষয় নয়।
করণীয়: প্রতিটি লেনদেনে পণ্যের মূল্য, পরিশোধিত টাকা, বকেয়া অর্থ এবং পরিশোধের নির্ধারিত তারিখ লিখে রাখুন। চালান, রসিদ বা লিখিত বার্তার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
২. ক্রেতার জন্য বাকি সীমা নির্ধারণ না করা
একজন ক্রেতার কাছে ইতোমধ্যে ৫০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। এরপরও তাঁকে নতুন করে ৫০ হাজার টাকার পণ্য বাকিতে দিলে আপনার ঝুঁকি দ্বিগুণ হতে পারে।
করণীয়: প্রত্যেক ক্রেতার জন্য সর্বোচ্চ বাকি সীমা নির্ধারণ করুন। বর্তমান পাওনা সেই সীমায় পৌঁছে গেলে নতুন অর্ডারের আগে পরিশোধের অবস্থা পর্যালোচনা করুন।
৩. পরিশোধের নির্দিষ্ট তারিখ না রাখা
“শিগগিরই টাকা দেব”—ব্যবসার হিসাবের জন্য এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নয়।
করণীয়: বাকিতে পণ্য দেওয়ার সময়ই পরিশোধের তারিখ ঠিক করুন। সম্ভব হলে চালান বা লিখিত অর্ডারে তা উল্লেখ করুন। এতে সময়মতো টাকা চাওয়া সহজ হবে।
৪. নতুন ক্রেতাকে বড় অঙ্কের বাকিতে পণ্য দেওয়া
নতুন ক্রেতার সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ থাকলেও তাঁর পরিশোধের অভ্যাস সম্পর্কে না জেনে বড় অঙ্কের বাকি দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
করণীয়: ছোট অঙ্কের লেনদেন দিয়ে শুরু করুন। তিনি সময়মতো টাকা দেন কি না, প্রতিশ্রুতি রাখেন কি না—তা দেখে ধীরে ধীরে বাকি সীমা বাড়ান।
৫. বড় অর্ডারে দীর্ঘ সময়ের বাকিতে রাজি হওয়া
ধরুন, আপনি দুই লাখ টাকার অর্ডার পেলেন। ক্রেতা পণ্য এখন নেবেন, কিন্তু টাকা দেবেন ৬০ দিন পরে। এর মধ্যে আপনাকে কাঁচামাল কেনা, বেতন ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হবে।
করণীয়: অর্ডারের ধরন ও চুক্তি অনুযায়ী অগ্রিম মূল্য, আংশিক অগ্রিম অথবা ধাপে ধাপে পরিশোধের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করুন। বড় অর্ডার নেওয়ার আগে হিসাব করুন, টাকা না আসা পর্যন্ত ব্যবসা চালানোর সামর্থ্য আপনার আছে কি না।
৬. পাওনা নিয়মিত পর্যালোচনা না করা
১৫ দিনের পাওনা ৪৫ দিন, তারপর ৯০ দিনে গড়াতে পারে—যদি নির্ধারিত সময়ে খোঁজ না নেওয়া হয়।
করণীয়: সপ্তাহে অন্তত এক দিন পাওনার হিসাব পর্যালোচনা করুন। কোন টাকা আজ পাওয়ার কথা, কোনটি মেয়াদোত্তীর্ণ এবং কোন ক্রেতার পাওনা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে—এই তিনটি তালিকা রাখুন।
পাওনার তারিখ পার হলে ভদ্রভাবে, কিন্তু স্পষ্ট করে যোগাযোগ করুন।
যেমন:
“আসসালামু আলাইকুম। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, আপনার কাছে ৫০,০০০ টাকা পাওনা রয়েছে। অনুগ্রহ করে জানাবেন, কবে নাগাদ পরিশোধ করতে পারবেন? আমাদের নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য বিষয়টি নিষ্পত্তি করা জরুরি। ধন্যবাদ।”
৭. পুরোনো পাওনা থাকা সত্ত্বেও নতুন বাকি দেওয়া
একজন ক্রেতা আগের টাকা পরিশোধ করেননি, এর মধ্যেই নতুন অর্ডার দিলেন। বিক্রি বাড়ানোর আশায় আবার বাকিতে পণ্য দিলে আপনার পাওনা আরও বাড়বে।
করণীয়: পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন অর্ডারের আগে পুরোনো পাওনার একটি অংশ পরিশোধের অনুরোধ করুন। ক্রেতার পরিশোধের ইতিহাস ও চুক্তির শর্ত বিবেচনা করে নতুন বাকির সিদ্ধান্ত নিন।
সব বিক্রি ভালো বিক্রি নয়। যে বিক্রির টাকা অনিশ্চিতভাবে আটকে থাকে, তার ঝুঁকিও হিসাব করতে হয়।
আপনার পাওনার হিসাব কোথায়?
খাতা, হিসাবের সফটওয়্যার কিংবা সাধারণ স্প্রেডশিটে এই তালিকাটি রাখতে পারেন।
ক্রেতা মোট বিক্রি পাওনা পরিশোধের তারিখ
ক্রেতা–১ ৳৮০,০০০ ৳২০,০০০ ১৫ অক্টোবর
ক্রেতা–২ ৳৫০,০০০ ৳৫০,০০০ ১০ অক্টোবর
ক্রেতা–৩ ৳১,২০,০০০ ৳০ পরিশোধিত
এটি একটি নমুনা হিসাব। বাস্তবে আপনার ব্যবসার তথ্য দিয়ে তালিকাটি তৈরি করুন।
নিয়মিত হিসাব রাখলে সহজেই বুঝতে পারবেন, মোট কত টাকা পাওনা, কত টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ এবং আগামী সাত দিনে কত টাকা হাতে আসার কথা।
লাভ হচ্ছে, তবু হাতে টাকা নেই কেন?
ধরা যাক, আপনার বিক্রি এক লাখ টাকা এবং সব প্রাসঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে লাভ ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু ক্রেতা টাকা দেবেন ৬০ দিন পরে।
হিসাব অনুযায়ী লাভ থাকলেও আজ সেই বিক্রির টাকা আপনার হাতে নেই। ফলে ব্যবসার নিয়মিত খরচ মেটাতে সংকট তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের এন্টারপ্রাইজ জরিপে ব্যবসার অর্থায়নের উৎস এবং বাকিতে বিক্রিসহ পাওনা-সংক্রান্ত বিষয় পরিমাপ করা হয়। এসব বিষয় ব্যবসার অর্থ ব্যবস্থাপনা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়, নগদ অর্থের আসা-যাওয়ার হিসাবও নিয়মিত রাখতে হবে।
আজই করুন পাঁচ মিনিটের কাজ
আপনার ব্যবসার সব ক্রেতার তালিকা বের করে লিখুন—
১. মোট পাওনা কত?
২. কত দিনের পুরোনো পাওনা রয়েছে?
৩. পরিশোধের প্রতিশ্রুত তারিখ কী?
৪. নতুন করে বাকিতে দেওয়া নিরাপদ কি না?
৫. আগামী সাত দিনে কত টাকা পাওয়ার কথা?
এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তরই আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে, ব্যবসার কত টাকা বাজারে আটকে আছে।
বিক্রি বাড়ানো ব্যবসার সাফল্যের একটি অংশ। বিক্রির টাকা সময়মতো ফেরত আনাও আরেকটি অংশ। তাই প্রতিদিন শুধু কত বিক্রি করেছেন, তা নয়—কত টাকা হাতে এসেছে এবং কত টাকা এখনো পাওনা, সেটিও হিসাব করুন।
তথ্যসূত্র: বিশ্বব্যাংকের এন্টারপ্রাইজ জরিপ
পরবর্তী পর্ব: বিক্রি বাড়ছে, তবু ব্যবসায় টাকার সংকট কেন? নগদ প্রবাহের ঘাটতি সামলানোর বাস্তব কৌশল।