বিয়ের আগে আদর্শ কনে হওয়ার চাপ, ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ইতিহাস গড়ল ভেনিসের পর্দায়

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একটি গল্পের শুরু হয়েছিল শৈশবের এক ভয় থেকে। ঢাকার একটি পুরোনো বিউটি পার্লারে মায়ের সঙ্গে গিয়ে ছোট্ট রুবাইয়াত হোসেন শুনেছিলেন এক রহস্যময় কনের গল্প—যে কনের মৃত্যু ঘিরে ছড়িয়ে ছিল নানা গুঞ্জন। সময়ের সঙ্গে সেই ভয় মুছে যায়নি। বরং প্রায় দুই দশক ধরে গল্পটি পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের মনে ঘুরেছে। সেই শৈশবের স্মৃতিই শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এ। আর সেই সিনেমাই এবার বাংলাদেশি চলচ্চিত্রকে নিয়ে গেল বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব ভেনিসে।



২০২৬ সালের ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের Orizzonti Competition বিভাগে জায়গা করে নেয় রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত সিনেমাটি। বাংলাদেশের কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য এটি ছিল ঐতিহাসিক অর্জন। ৬ সেপ্টেম্বর ভেনিসে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়।



যে গল্পের শুরু এক শিশুর ভয় থেকে


রুবাইয়াত হোসেনের বয়স তখন ছয়-সাত বছর। মায়ের সঙ্গে নিয়মিত ঢাকার পুরোনো বিউটি পার্লারে চুল কাটাতে যেতেন তিনি। সেখানেই শুনেছিলেন এক কনের রহস্যময় মৃত্যুর গল্প। সেই গল্প তাঁর কল্পনায় গভীর ছাপ ফেলেছিল। প্রায় ২০ বছর পর সেই স্মৃতি থেকেই জন্ম নেয় ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর ভাবনা।


তবে এটি কেবল ভূতের গল্প নয়। শৈশবের সেই ভয়কে পরিচালক পরিণত করেছেন নারীর শরীর, সৌন্দর্য, বিয়ে এবং সামাজিক প্রত্যাশাকে ঘিরে এক মনস্তাত্ত্বিক ও অতিপ্রাকৃত গল্পে।


বিয়ের আগে ‘আদর্শ কনে’ হওয়ার চাপ


সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র জাইনিন। বিয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত এই তরুণীকে ঘিরে শুরু হয় নানা সৌন্দর্যচর্চা, ঘরোয়া টোটকা ও পারিবারিক প্রত্যাশা। কেমন দেখতে হবে, কতটা সুন্দর হতে হবে, কীভাবে নিজেকে ‘আদর্শ কনে’ হিসেবে তৈরি করতে হবে—এসব চাপ ক্রমেই তার ওপর বাড়তে থাকে।



একপর্যায়ে জাইনিনের শরীর ও মন যেন সেই চাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করে। অস্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া, উদ্বেগ, অদ্ভুত অনুভূতি এবং অতিপ্রাকৃত দৃশ্য মিলিয়ে বিয়ের প্রস্তুতি পরিণত হয় এক ভয়ংকর মানসিক যাত্রায়। ভেনিসের অফিসিয়াল বিবরণেও সিনেমাটিকে নারীর ওপর আরোপিত সামাজিক প্রত্যাশার বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।



‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি—সৌন্দর্য আসলে কার জন্য?


বিয়ের আগে একটি মেয়েকে আরও সুন্দর, ফর্সা, আকর্ষণীয় ও ‘নিখুঁত’ করে তোলার যে সামাজিক প্রক্রিয়া, সিনেমাটি তার অন্ধকার দিকটি সামনে আনে। রুবাইয়াত হোসেনের ভাষ্যে, সৌন্দর্যচর্চার পেছনে যে যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকতে পারে এবং সমাজ কীভাবে একটি মেয়েকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ‘নারী’ হিসেবে তৈরি করে—সিনেমাটি সেই প্রশ্ন তোলে।


অর্থাৎ, ভয় এখানে শুধু অতিপ্রাকৃত নয়। ভয় আছে সামাজিক প্রত্যাশাতেও—নিজের শরীরকে নিয়ে অন্যের সিদ্ধান্ত, নিজের ইচ্ছাকে পাশে সরিয়ে ‘ভালো মেয়ে’ বা ‘আদর্শ কনে’ হওয়ার চাপেও।


নারীর চোখে নারীর গল্প


সিনেমাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক এর নারীপ্রধান সৃজনশীল দল। নির্মাণের অধিকাংশ বিভাগের নেতৃত্বেই ছিলেন নারীরা। ফলে নারীর শরীর, সৌন্দর্য, ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো সিনেমাটিতে একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছে।


প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনিন চৌধুরী করিম। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, আজমেরী হক বাঁধন, শাতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলমসহ আরও অনেকে। সিনেমাটি বাংলাদেশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনা।



ভেনিসে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়


‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর ভেনিসযাত্রা শুধু একটি সিনেমার আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী নয়; এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ৬ সেপ্টেম্বরের প্রদর্শনীতে সিনেমাটির শিল্পী ও নির্মাতারা উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনীর পর দর্শকদের উচ্ছ্বাস ও করতালিতেও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে আয়োজনটি।


একসময় ঢাকার একটি বিউটি পার্লারে শোনা ছোট্ট একটি ভয়ের গল্প—যে গল্প হয়তো একটি শিশুর মনে আতঙ্ক তৈরি করেছিল—দুই দশক পর সেই গল্পই পৌঁছে গেল ভেনিসের বিশাল পর্দায়।



এ যেন কেবল একটি কনের গল্প নয়। এটি ভয় থেকে চলচ্চিত্রে, ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং বাংলাদেশের গল্প থেকে বিশ্বদর্শকের সামনে পৌঁছে যাওয়ার এক অসাধারণ যাত্রা।


sidebar ad