বাবা-মায়ের ঝগড়ার প্রভাব ছয় মাস বয়সী শিশুর ওপরও পড়তে পারে

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মা–বাবার আচরণ সন্তানের মানসিক ও আবেগীয় বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই যেকোনো কাজ বা সিদ্ধান্তের আগে সন্তানের কথা ভাবা জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারে নিয়মিত উচ্চস্বরে ঝগড়া, অপমান বা সহিংস পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে, যা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।


বাবা–মায়ের সম্পর্ক সন্তানের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে?


আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা–মায়ের দ্বন্দ্ব ও অশান্তির প্রভাব ছয় মাস বয়সী শিশুর আচরণ ও মানসিক বিকাশেও পড়তে পারে। এই প্রভাব শুধু শৈশবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে তা প্রাপ্তবয়স্ক জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।


গবেষকদের মতে, এটি একটি চক্রের মতো। কারণ আজকের শিশুরাই একদিন বাবা–মা হবে। তারা শৈশবে যে সম্পর্কের পরিবেশ দেখে বড় হয়, ভবিষ্যতে অনেক সময় সেই অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন ঘটে তাদের নিজেদের পারিবারিক জীবনে।


শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ মরতুজা এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে শত শত সিসিটিভি যেমন ছোটখাটো সবকিছু রেকর্ড করে রাখে, তেমনি শিশুর মস্তিষ্কও চারপাশের নানা অভিজ্ঞতা ধারণ করে। এমনকি নবজাতককে বিরক্তি নিয়ে দুধ খাওয়ানো, কাঁথা বা ডায়াপার বদলানোর সময় রাগ করা বা বকা দেওয়ার মতো আচরণও তার মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।’


পরিবারই শিশুর প্রথম বিদ্যালয়


পরিবার একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। বাবা–মা তার প্রথম শিক্ষক। তাঁদের আচরণ, কথাবার্তা ও পারস্পরিক সম্পর্কই সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তানের সামনে বারবার উচ্চস্বরে ঝগড়া, অপমান বা সহিংস আচরণ তার মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব


১. ভয় ও অনিরাপত্তাবোধ তৈরি হতে পারে


বাবা–মায়ের তীব্র ঝগড়া দেখে অনেক শিশু মনে করে, পরিবারটি হয়তো ভেঙে যাবে। এতে তারা সব সময় আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে।


২. আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে


অনেক শিশু মনে করে, বাবা–মায়ের ঝগড়ার জন্য হয়তো সে-ই দায়ী। এই অযৌক্তিক অপরাধবোধ তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং মানসিক চাপ বাড়ায়।


৩. আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে


অতিরিক্ত রাগ, জেদ, আক্রমণাত্মক আচরণ, পড়াশোনায় অমনোযোগ অথবা একেবারে চুপচাপ হয়ে যাওয়া—এসবই পারিবারিক অশান্তির প্রতিক্রিয়া হতে পারে।


৪. ভবিষ্যতের সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে


শিশুরা দেখে শেখে। তারা যদি নিয়মিত ঝগড়া, অপমান বা অসম্মান দেখতে দেখতে বড় হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নিজের সম্পর্কেও একই ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করতে পারে।


বাবা–মায়ের করণীয়


১. সন্তানের সামনে উচ্চস্বরে ঝগড়া বা অপমানজনক ভাষা ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।


২. মতবিরোধ হলে শান্তভাবে এবং সন্তানের উপস্থিতির বাইরে আলোচনা করার চেষ্টা করুন।


৩. ঝগড়া হয়ে গেলে পরে সন্তানের সামনে স্বাভাবিক আচরণ করুন এবং বয়স উপযোগী ভাষায় বোঝান যে মতবিরোধেরও শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব।


৪. পারিবারিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী বা পারিবারিক কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন।


একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য নিরাপদ, স্নেহময় ও সম্মানজনক পারিবারিক পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। বাবা–মায়ের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সংযত আচরণই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।


ঢাকা/এসএন/আরএস

sidebar ad