বাবা অফিস থেকে ফিরেছেন। দরজার কাছে জুতো খুলতেই ছোট্ট সন্তানটি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল তাঁকে। সারাদিনের ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই উবে গেল। বাবা হয়তো সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“কী করেছ আজ?”
কথাটা খুব সাধারণ। অথচ শিশুটির কাছে এই কয়েকটি
শব্দই হয়ে উঠতে পারে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সন্তানের বৃদ্ধি কেবল শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও।
আর শিশুর এই প্রারম্ভিক বিকাশে বাবার ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন সন্তানকে বড় করে
শুধু খাবার, পোশাক, স্কুল আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে নয়। তার পাশাপাশি গড়ে উঠছে আরেকটি
অদৃশ্য জগৎ—তার আত্মবিশ্বাস,
নিরাপত্তাবোধ, আবেগ বোঝার ক্ষমতা এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস। আর এই মানসিক জগত গঠনের
ভিত তৈরি করতে বাবা নীরব কিন্তু স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেন। শুরুর দিনগুলোতে বাবার সঙ্গে
নিবিড় সংযোগ শিশুর জন্য জীবনব্যাপী সুফল এনে দেয়।
বাবা মানে শুধু দায়িত্ব নয়-
আমাদের সমাজে বাবার ভূমিকা অনেকটাই অলিখিতভাবে নির্ধারন করা আছে। সাংসারিক
খরচ চালানো, সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বহন, ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয় করা; অর্থাৎ সকল
অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্বের সঙ্গে জড়িত।
কিন্তু সময় বদলেছে। সন্তানকে বড় করার গল্পে
শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই শেষ কথা নয়, এখন বাবা-মা দুজনের কাছ থেকেই সন্তান চায় সময়,
মনোযোগ, স্নেহ এবং মানসিক আশ্রয়। মা তো সবসময় সন্তানের
পাশে থাকেনই। কিন্তু আপনি জানেন কি, একজন বাবা সন্তানের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, তার
কথা কতটা মন দিয়ে শোনেন, ভুল করলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, তার আবেগকে গুরুত্ব দেন
কি না—এসবও বাবা-সন্তানের
সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরোও পড়ুন: হাইব্রিড প্যারেন্টিং: একটু কোমলতা,একটু কঠোরতা
সন্তানের মানসিক বিকাশে বাবার ভূমিকা শুধু
একটি প্রচলিত ধারণা নয়; সাম্প্রতিক গবেষণাতেও বাবা-সন্তানের ইতিবাচক সম্পৃক্ততার সঙ্গে
শিশুর সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
২০২৬ সালে 'প্রারম্ভিক শৈশব গবেষণা ত্রৈমাসিক' (Early Childhood Research Quarterly)-এ প্রকাশিত
একটি মেটা অ্যানালাইসিস -এ ২০০০ সালের পর প্রকাশিত ৬৫টি গবেষণা, মোট ১,৫৪,৮০১ জন শিশু
এবং ১,২৭,০৮১ জন বাবা-র তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি দেখেছে, বাবার সন্তানের
জীবনে ইতিবাচকভাবে যুক্ত থাকা এবং বাবার উষ্ণতা ও সাড়া দেওয়ার প্রবণতা (warmth
& responsiveness) শিশুর সামাজিক-আবেগীয় সক্ষমতার সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত।
“আমি পারব”- বিশ্বাসটি তৈরি হতে পারে বাবার
হাত ধরে
আমি চেষ্টা করতে পারি”, “ভুল করলেও আবার
শুরু করতে পারি”, “আমি গুরুত্বপূর্ণ”—এসবের ওপরও নির্ভর
করে সন্তানের আত্মবিশ্বাস তৈরি হতে পারে। আর এখানে বাবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সন্তান যখন কোনো কাজে ব্যর্থ হয়, বাবা যদি বলেন, “তুমি কিছুই পারো না”—তাহলে শিশুটি ব্যর্থতাকে
নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে।
অন্যদিকে, বাবা যদি বলেন, “হয়নি। আবার চেষ্টা
করো। কোথায় ভুল হয়েছে দেখি”—তাহলে শিশুটি শিখতে পারে ব্যর্থতা মানে শেষ নয়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (এনআইএইচ) ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায়ও এই একই জিনিস দেখিয়েছে। সন্তানের প্রারম্ভিক ও মধ্য শৈশবকালীন সময়ে বাবার ইতিবাচক অংশগ্রহণে শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সরাসরি বৃদ্ধি করে। যা পরবর্তীতে শিশুদের মানসিক সহনশীলতা বা Resilience বাড়াতে সাহায্য করে।
খেলার ভেতর দিয়ে মনের ব্যায়াম-
বাবা তো সারাদিন কাজ করেন, সময় কোথায়? অনেক
পরিবারের বাস্তবতা এমনই। কিন্তু সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানো মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাশে
বসে থাকা নয়।বাবার খেলা অনেক সময় মায়ের খেলার চেয়ে আলাদা হয়—একটু দৌড়, ধাক্কাধাক্কি,
হাসি, অনুমান, নিয়ম ভাঙা-গড়া।
আরোও পড়ুন: বাবা-মায়ের ঝগড়ার ফলে শিশুর ওপরযেসব প্রভাব পড়তে পারে
গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার সঙ্গে এই ধরনের
শারীরিক ও চিত্তাকর্ষক খেলা শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের
ক্ষমতা বাড়ায়। একসঙ্গে খেলতে খেলতে বাবা সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন। শিশুর
প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তার চিন্তার জগৎকে জানেন। খেলায় হেরে গেলে সে কীভাবে প্রতিক্রিয়া
দেখায়, কিছু না পেলে কী করে, অন্য শিশুর সঙ্গে কেমন আচরণ করে—এসবও বোঝা যায়।
সম্পর্ক ও লিঙ্গবোধের প্রথম পাঠ:
এখানে অবশ্যই কোনো কঠোর জেন্ডার রুল নেই।
ছেলে-মেয়ে উভয় সন্তানই বাবার কাছ থেকে নানা সামাজিক ও আবেগীয় শিক্ষা নেয়। তবে বাবার আচরণ তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের
ধারণায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
ছেলেসন্তান বাবার মধ্যে দেখে পুরুষত্বের
একটি মডেল। সে শেখে—পুরুষ মানে কেবল শক্তি বা কর্তৃত্ব নয়; পুরুষ মানে দায়িত্ব, কোমলতা,
ক্ষমা চাওয়ার সাহস এবং পরিবারের পাশে থাকা।
একইভাবে, একজন মেয়ে যখন বাবার কাছ থেকে সম্মান,
মনোযোগ ও নিরাপদ সম্পর্কের অভিজ্ঞতা পায়, তখন তার নিজের প্রতি মূল্যবোধ এবং সম্পর্কের
ক্ষেত্রে কী ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য—সে সম্পর্কে ধারণা তৈরি হতে পারে।
তবে মনে রাখা জরুরি—শিশুর ব্যক্তিত্ব
কোনো একজন অভিভাবক একা তৈরি করেন না। পরিবার, বন্ধু, স্কুল, সংস্কৃতি, সামাজিক পরিবেশ
ও শিশুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য—সবকিছু মিলেই তার বিকাশ ঘটে।
আবেগের ভাষা শেখানো:
অনেক বাবা আছেন, সন্তানকে ভালোবাসেন গভীরভাবে;
কিন্তু সেটা প্রকাশ করেন দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। স্কুলের ফি দেওয়া, খাবার কিনে দেওয়া,
অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া—এসব অবশ্যই ভালোবাসা। কিন্তু শিশুর কাছে
নিজের আবেগ বোঝানোও জরুরি।
একটি আলিঙ্গন, ঘুমানোর আগে দুই মিনিট গল্প,
ভুল হলে ক্ষমা চাইতে পারা, পরীক্ষার আগে ভরসার দেয়া, মন খারাপে পাশে বসে অভয় দেয়া;
তাহলেই সন্তান শেখে আবেগ লুকানোর বিষয় নয়, বোঝার ও সামলানোর বিষয়। বাবার উষ্ণতা
সন্তানের মধ্যে সহানুভূতি ও মানসিক স্থিতিশীলতা গড়ে।
বাবার মানসিক অবস্থাও সন্তানের ওপর ছাপ ফেলে-
বাবা নিজে যদি দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, হতাশা
বা গুরুতর মানসিক সমস্যার মধ্যে থাকেন, তার প্রভাব কিন্তু পারিবারিক পরিবেশের মাধ্যমে
সন্তানের ওপর পড়তে পারে। তাই বাবার নিজের মানসিক সুস্থতাও প্যারেন্টিং-এর অংশ।
সব সময় শক্ত থাকার অভিনয় নয়; প্রয়োজনে সাহায্য
নেওয়া, বিশ্রাম নেওয়া, সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা কিংবা পেশাদার সহায়তা নেওয়াও দায়িত্বশীলতার
অংশ।
তাহলে ভালো বাবা হওয়ার জন্য আসলে কী দরকার?
দামী খেলনা নয়;
বড় বাড়ি নয়;
সন্তানের চাদিহা মাফিক সবকিছু কিনে দেওয়াও
নয়; বরং দরকার -
প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট সন্তানের জন্য বরাদ্দ
রাখা। সে সময় মোবাইল বন্ধ রেখে তার কথা শুনুন, কিছু কোয়ালিটিফুল সময় কাটান, বয়স অনুযায়ী
দায়িত্ব দিন, ভালো অর্জনে প্রশংসা করুন,
ব্যর্থতায় বুকে টেনে নিন।
সন্তান যখন প্রথমবার সাইকেল চালাতে শেখে,
তখন হয়তো বাবার হাতটি পেছনে থাকে। কিছুক্ষণ পর বাবা হাতটি ছেড়ে দিলেও, শিশু তখনও জানে
না যে হাতটি সরে গেছে। সে নিজের মতো করে এগিয়ে যায়। জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই বাবার ভূমিকা
অনেকটা এমনই।
তিনি সব সময় সামনে থেকে পথ দেখান না, সব
সময় হাত ধরেও রাখেন না। কিন্তু সেই হাত ছেড়ে
দেওয়ার আগেই তিনি সন্তানের ভেতরে যে সাহস, আত্মবিশ্বাস আর নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে দেন,
সেটিই তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
ঢাকা/টিএ