সম্প্রতি প্রকাশিত মাস্টারকার্ড ইনডেক্স অব উইমেন’স এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ (MIWE) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চমকপ্রদ এক তথ্য—উগান্ডায় মোট ব্যবসার ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশের মালিক নারী। নারী উদ্যোক্তার এই উচ্চ অংশগ্রহণের কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে উঠে এসেছে আফ্রিকার এই দেশটি।
মাস্টারকার্ড ইনডেক্স অব উইমেন’স এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এমন একটি সূচক, যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রগতি, ব্যবসায় অংশগ্রহণ এবং নারী-পুরুষের মধ্যে উদ্যোক্তা ব্যবধান কমাতে সহায়ক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কোনো দেশের অর্থনীতি কতটা অনুকূল, তা বুঝতে সূচকটি তিনটি প্রধান বিষয় বিবেচনা করে—নারীর অগ্রগতির ফলাফল, জ্ঞান ও আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকার এবং উদ্যোক্তা সহায়ক পরিবেশ।
২০১৬ সালের এই সূচকে বিশ্বের ৫৪টি অর্থনীতি পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ছিল বতসোয়ানা, ইথিওপিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও উগান্ডা।
ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ প্রায় সমান
উগান্ডায় নারী ব্যবসা মালিকের হার ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশটির Women Entrepreneurial Activity Rate-এ নারী-পুরুষের অনুপাত ছিল ১০০ শতাংশ—এই সূচকে উগান্ডার অবস্থান প্রথম। অর্থাৎ, দেশটিতে নারীরা পুরুষদের মতোই ব্যবসা শুরু করার সম্ভাবনা রাখেন।
শুধু ব্যবসা শুরু করাই নয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ সংগ্রহ কিংবা সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও উগান্ডার নারীদের সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্য। দেশটির ৯০ দশমিক ৫ শতাংশ নারী ব্যবসা শুরু করার জন্য ঋণ নেওয়া অথবা অর্থ সঞ্চয়ের উদ্যোগ নিয়েছেন। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের অন্যান্য দেশের গড় হার যেখানে ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে উগান্ডার হার অনেক বেশি।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও দেশটির নারীদের অবস্থান শক্তিশালী। উগান্ডায় নারীদের উচ্চশিক্ষায় মোট ভর্তির হার ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
প্রয়োজন থেকেই ব্যবসার পথে
উগান্ডার প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গত দুই বছরে নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করেছেন। আফ্রিকার অন্যান্য দেশ মিলিয়ে এই হার ২৫ শতাংশেরও কম। ২০১২ সালের তুলনায় উগান্ডায় নতুন ব্যবসা শুরুর প্রবণতা বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ।
তবে এই উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতার পেছনে সব সময় উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা নতুনত্বের আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এর মূল কারণ জীবিকা নির্বাহ ও টিকে থাকার প্রয়োজন।
আফ্রিকার অন্য দেশগুলোর চিত্র
নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে উগান্ডার পাশাপাশি বতসোয়ানাও উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। নারী অগ্রগতির সূচকে বতসোয়ানার স্কোর ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতেও দেশটি সর্বোচ্চ ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ স্কোর করেছে।
অন্যদিকে, নারীদের আর্থিক সেবা ও জ্ঞানসম্পদে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে আফ্রিকায় শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশটির নারী উদ্যোক্তাদের ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশের জ্ঞানসম্পদ ও মূলধনে প্রবেশাধিকার রয়েছে।
প্রতিকূলতাকে জয় করেই এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা
সূচকের ফলাফল বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নারী উদ্যোক্তাদের অন্যতম বড় শক্তি হলো অধ্যবসায়, দৃঢ়তা এবং পরিবারের জন্য কিছু করার তাগিদ। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোতে নারীরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠছেন।
উন্নয়নশীল দেশের নারীরা স্থানীয় ব্যবসার সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন। এসব ব্যবসার ক্ষেত্রে সব সময় উচ্চমাত্রার প্রযুক্তিগত জ্ঞান কিংবা উদ্ভাবনী দক্ষতার প্রয়োজন হয় না। ফলে আর্থিক, নিয়ন্ত্রক বা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা অনেকটাই এড়িয়ে তারা ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন।
মাস্টারকার্ডের সাব-সাহারান আফ্রিকা বিভাগের প্রেসিডেন্ট ও আন্তর্জাতিক বাজারে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রধান ড্যানিয়েল মোনেহিন বলেন, এই গবেষণার ফলাফল আফ্রিকার একটি বাস্তবতাকে তুলে ধরে—ব্যবসা ও উৎপাদনশীলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে নারীরা এখনো নানা কঠিন বাধা অতিক্রম করে চলেছেন।
কি কি বাধা রয়েছে?
নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের অভাব
অতিরিক্ত বা জটিল নিয়ন্ত্রক বাধা
প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা
আত্মবিশ্বাসের অভাব
উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিক প্রস্তুতির ঘাটতি
ব্যর্থতার ভয়
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধ
প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার সীমিত সুযোগ
তারপরও আফ্রিকা এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের নারী উদ্যোক্তারা নিজেদের জীবন বদলানোর পাশাপাশি সন্তানদের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যৎ তৈরিতে ব্যবসাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
উগান্ডায় ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি ইতিবাচক। যেখানে অন্যান্য দেশের গড় মাত্র ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, শুধু ব্যবসার মালিকানা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেই নয়—নারীর উদ্যোক্তা পরিচয়কে সামাজিকভাবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও উগান্ডা এগিয়ে রয়েছে।
উগান্ডার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, নারীদের জন্য শিক্ষা, অর্থায়ন, ব্যবসা শুরুর সুযোগ এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা গেলে তারা শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হন না; বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।