নারীর আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক ও যৌনতার সাহসী কথক সিগ্রিড উনসেট

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

নারী কীভাবে ভালোবাসে, সংসার করে, ভুল করে, অনুতপ্ত হয়, বিশ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে বেড়ায়— এই সব বিষয় যাঁর লেখায় প্রাধান্য পেয়েছিলো তিনি হলেন সিগ্রিড উনসেট। নোবেলজয়ী এই লেখক ইতিহাসকে দেখেছিলেন মানুষের খুব কাছ থেকে।


প্রায় এক শতাব্দী পরও তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি Kristin Lavransdatter পাঠককে স্পর্শ করে। কারণ সময় বদলালেও মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব খুব একটা বদলায়নি।


সিগ্রিড উনসেট জন্মেছিলেন ১৮৮২ সালের ২০ মে, ডেনমার্কের কালুন্দবর্গে। তাঁর বাবা ইনগভাল্ড মার্টিন উনসেট ছিলেন একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ। ১৮৮৪ সালে বাবা নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানিয়ায়—বর্তমান অসলো—একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ দিলে পরিবারটি নরওয়েতে চলে আসে। সেখানেই উনসেটের শৈশব ও বেড়ে ওঠা।


ইতিহাসের প্রতি সিগ্রিড উনসেটের আগ্রহ তাই হঠাৎ তৈরি হয়নি। ছোটবেলা থেকেই বাবার গবেষণা, পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং অতীতকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার পদ্ধতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। পরবর্তীকালে মধ্যযুগ নিয়ে লেখার সময় এই শৈশবের শিক্ষা তাঁর কাজে গভীর প্রভাব ফেলে।


মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবাকে হারান উনসেট। ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে তাঁকে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়। পরে প্রায় এক দশক একটি অফিসে কাজ করেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে কেবল জীবিকার বাস্তবতা নয়, সাধারণ মানুষের জীবন, শ্রম ও সামাজিক অবস্থানকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই সম্ভবত তাঁর সাহিত্যের একটি বড় শক্তি হয়ে ওঠে—তিনি মানুষকে দূর থেকে দেখেননি; খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন।


সাহিত্যজীবনের শুরু সমকালীন সমাজ ও নারীর জীবন নিয়ে লেখার মধ্য দিয়ে


উনসেটের সাহিত্যজীবনের শুরু সমকালীন সমাজ ও নারীর জীবন নিয়ে লেখার মধ্য দিয়ে। ১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস Fru Marta Oulie। এরপর Jenny (১৯১১) তাঁকে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে। Jenny-তে একজন স্বাধীনচেতা নারীর জীবন, সম্পর্ক, যৌনতা ও সামাজিক প্রত্যাশার সংঘাত উঠে আসে। এই ধরনের বিষয় নিয়ে লেখার কারণে তাঁকে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়।


তবে উনসেটের সাহিত্যিক পরিসর ক্রমেই আরও বিস্তৃত হয়। আধুনিক জীবনের জটিলতা থেকে তিনি ফিরে তাকান মধ্যযুগের দিকে। সেখানে গিয়েই যেন তিনি খুঁজে পান এমন একটি সাহিত্যিক পরিসর, যেখানে ব্যক্তিমানুষের জীবন, ধর্ম, পরিবার, সমাজ ও নৈতিকতার প্রশ্নকে একসঙ্গে দেখা সম্ভব।


Kristin Lavransdatter-—তিন খণ্ডের মহাকাব্যিক উপন্যাস


১৯২০ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয় Kristin Lavransdatter—তিন খণ্ডের মহাকাব্যিক উপন্যাস। এর তিনটি অংশ হলো Kransen (১৯২০), Husfrue (১৯২১) এবং Korset (১৯২২)। কাহিনি শুরু হয় চতুর্দশ শতকের শুরুতে গুডব্রান্সডালেনে বেড়ে ওঠা এক কিশোরী ক্রিস্টিনকে দিয়ে এবং শেষ হয় ১৩৪৯ সালে প্লেগের সময় তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। এটি নিছক একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়।- ক্রিস্টিন প্রেম করতে চায়। সে নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে চায়। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সংঘাত তৈরি হয়। এরপর শুরু হয় সংসার, মাতৃত্ব, দাম্পত্য, ভুল সিদ্ধান্ত, অনুশোচনা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের দীর্ঘ পথচলা।


ক্রিস্টিনের জীবন তাই একই সঙ্গে ব্যক্তিগত এবং সার্বজনীন


তার প্রশ্নগুলো মধ্যযুগের হলেও আধুনিক পাঠকও সেগুলোর সঙ্গে পরিচিত—আমি কী চাই? সমাজ আমার কাছে কী চায়? ভালোবাসার জন্য কতটা মূল্য দিতে হয়? ভুল করার পর মানুষ কি নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে পারে? আর বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের ইচ্ছার সংঘাত হলে মানুষ কোন পথ বেছে নেয়?


এই প্রশ্নগুলোই Kristin Lavransdatter-কে সময়ের সীমা অতিক্রম করার শক্তি দিয়েছে।


প্রেমের গল্প আবার ধর্মেরও গল্প


ক্রিস্টিন ও এরলেন্ডের সম্পর্ক উপন্যাসটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু উনসেট প্রেমকে কখনো সরল রোমান্টিক অনুভূতি হিসেবে দেখাননি। প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দায়িত্ব, সামাজিক নিয়ম, অপরাধবোধ, পরিবার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা।


একইভাবে ধর্মও তাঁর কাছে কেবল আনুষ্ঠানিক বিশ্বাস নয়। ক্রিস্টিনের জীবনের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে তাকে নিজের বিশ্বাস ও নৈতিকতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তাই Kristin Lavransdatter একই সঙ্গে প্রেমের উপন্যাস, পারিবারিক উপন্যাস, মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস এবং ধর্মীয় অনুসন্ধানের গল্প।


উনসেট ১৯২৪ সালে রোমান ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পরবর্তী সাহিত্যেও ধর্ম ও নৈতিকতার প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


গবেষণাভিত্তিক সাহিত্যচর্চা


উনসেটের বিশেষত্ব ছিল তাঁর গবেষণাভিত্তিক সাহিত্যচর্চা। মধ্যযুগের মানুষ কীভাবে চিন্তা করত, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস কী ছিল, সামাজিক সম্পর্ক কেমন ছিল—এসব বিষয় তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া ইতিহাস ও গবেষণার শিক্ষাও এখানে কাজে লাগে।


ফলে তাঁর মধ্যযুগ কোনো কল্পিত রূপকথার জগৎ নয়। সেখানে আছে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক সম্পর্ক, শ্রম, সম্পত্তি, রোগ, মৃত্যু এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন।


আর এই বাস্তবতার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান মানুষের চিরন্তন অনুভূতি।


নোবেল স্বীকৃতি


১৯২৮ সালে সিগ্রিড উনসেট সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়, তাঁকে মূলত মধ্যযুগে উত্তর ইউরোপের জীবনকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার জন্য সম্মানিত করা হয়েছে।


এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—নোবেল পুরস্কারটি Kristin Lavransdatter নামের একটি মাত্র বইয়ের জন্য দেওয়া হয়নি। তাঁর মধ্যযুগভিত্তিক সাহিত্যকর্ম, বিশেষ করে Kristin Lavransdatter এবং Olav Audunssøn–এর মতো রচনার মাধ্যমে যে বিশাল সাহিত্যিক জগৎ তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তার স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কার।


যুদ্ধের সময়ও নীরব থাকেননি


উনসেট শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না, সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিও ছিলেন তীব্রভাবে সচেতন। নাৎসি জার্মানির উত্থানের বিরোধিতা করেছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরওয়ে আক্রান্ত হলে তাঁকে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হয়। সেখান থেকেও তিনি নরওয়ের প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখেন। যুদ্ধ শেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন।


অর্থাৎ তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়; বিশ্বাস, নৈতিকতা এবং মানুষের দায়বদ্ধতার সঙ্গেও সাহিত্যকে তিনি যুক্ত করেছিলেন।

sidebar ad