রোদসী ডেস্ক:
যেকোন সমাজকে বদলে দিতে সব সময় তলোয়ার লাগে না; কখনও কখনও এর জন্য প্রয়োজন হয় শুধুমাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়।ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক শাসকের নাম লেখা আছে, যাঁদের সাম্রাজ্য আজ বিলীন। কিন্তু একজন মুসলিম নারীর প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় আজও জ্ঞানচর্চার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। সেই নারী ফাতিমা আল-ফিহরি—যাঁর নীরব উদ্যোগ আজও বিশ্বজুড়ে শিক্ষা, গবেষণা ও মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনুপ্রেরণার প্রতীক।
নবম শতাব্দীর মরক্কোর ফেজ নগরীতে ফাতিমা যে বীজ বপন করেছিলেন, তা আজও ফল দিচ্ছে। সময় বদলেছে, সভ্যতা এগিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা রূপান্তরিত হয়েছে; কিন্তু শিক্ষা যে মানুষের মুক্তির পথ, সেই বিশ্বাসে তাঁর অবদান আজও অম্লান। একজন নারী যে কেবল পরিবারের নয়, একটি সভ্যতার ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে পারেন—ফাতিমা আল-ফিহরির জীবন তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
ফাতিমা আল-ফিহরির জন্ম বর্তমান তিউনিসিয়ার কাইরোয়ান অঞ্চলে। পরে তাঁর পরিবার মরক্কোর ফেজ শহরে বসতি স্থাপন করে। পিতার মৃত্যুর পর তিনি উল্লেখযোগ্য সম্পদের উত্তরাধিকারী হন। সেই সম্পদ ব্যক্তিগত বিলাসে ব্যয় না করে তিনি মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন।
৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আল-কারাউইয়িন মসজিদ ও এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাকেন্দ্র। এটি পরবর্তীকালে আল-কারাউইয়িন বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। ফাতিমার এরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামি আইন, ভাষা, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং অন্যান্য বিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। ইউনেস্কো ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আল-কারাউইয়িন শুধু মুসলিম বিশ্বের জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্ঞানচর্চার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগে এখানকার জ্ঞানচর্চা ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করেছিল বলে বহু গবেষক উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী ও পণ্ডিতেরা এখানে আসতেন, মতের আদান-প্রদান হতো, নতুন জ্ঞানের জন্ম হতো।
ফাতিমা আল-ফিহরির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—দান শুধু ক্ষুধার্তকে আহার দেওয়া নয়; জ্ঞানের দরজা খুলে দেওয়াও এক অনন্য অসাধারণ দান। ফাতিমা একটি ভবন নির্মাণ করেননি, নির্মাণ করেছিলেন ভবিষ্যৎ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাকেন্দ্রে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য মানুষ শিক্ষা লাভ করেছে, যারা আবার নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেছে, সমাজকে এগিয়ে নিয়েছে।
আজ যখন নারীশিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও শিক্ষায় বিনিয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হয়, তখন ফাতিমা আল-ফিহরির নাম নতুন করে উচ্চারিত হওয়া উচিত। কারণ তিনি কোনো স্লোগান দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে দেখিয়েছিলেন—একজন শিক্ষিত, দূরদর্শী ও মানবকল্যাণে নিবেদিত নারী ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
হয়তো এ কারণেই এক হাজার বছরেরও বেশি সময় পরও ফাতিমার নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে।