রোদসী ডেস্ক:
সময়ের সঙ্গে নারীদের জীবনযাত্রা ও অগ্রাধিকারে বড় পরিবর্তন এসেছে। এই সময়ের নারীরা উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবন, আর্থিক স্থিতি কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে অনেকেই এখন তুলনামূলক দেরিতে মাতৃত্বের পরিকল্পনা করে থাকেন। এদিকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে। ফলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ডিম্বাণু সংরক্ষণ (Egg Freezing বা Oocyte Cryopreservation)।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে নারীর সুস্থ ডিম্বাণু সংগ্রহ করে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে সেই ডিম্বাণু ব্যবহার করে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF)-এর মাধ্যমে গর্ভধারণের চেষ্টা করা যায়।
আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়
এই প্রক্রিয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি নিতে হয়। প্রথমে প্রজনন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, বিভিন্ন রক্তপরীক্ষা এবং আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়। এরপর সাধারণত ১০–১৪ দিন ধরে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়, যাতে একসঙ্গে একাধিক ডিম্বাণু পরিপক্ব হয়। এই সময় নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। ডিম্বাণু পরিপক্ব হলে অল্প সময়ের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলো সংগ্রহ করে বিশেষ পদ্ধতিতে হিমায়িত করে সংরক্ষণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণভাবে ৩০–৩৫ বছরের মধ্যে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যতে সফল গর্ভধারণের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকে।
২৯ বছরেই কেন ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত?
বলিউড অভিনেত্রী কৃতি শ্যানন সম্প্রতি জীবনের এক অত্যন্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কথা প্রথমবার প্রকাশ্যে আনলেন। জাতীয় পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্র মিমি-এর জন্য ওজন বাড়ানোর সময়ই তিনি ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল ভবিষ্যতের কথা ভেবে নেওয়া একটি সচেতন পদক্ষেপ, যা আজও তিনি নিজের জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন।
'হিউম্যানস অব বোম্বে' পডকাস্টে কৃতি জানান, বিষয়টি তিনি আগে কখনও প্রকাশ্যে বলেননি। তাঁর কথায়, ‘‘আমি খুব পরিকল্পনা করেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেছিলাম। তখন 'মিমি'-র জন্য ওজন বাড়াতে হচ্ছিল। এই চিকিৎসার কারণেও শরীর কিছুটা ফুলে যায়। তাই মনে হয়েছিল, দুটো বিষয় একসঙ্গেই সামলে নেওয়ার এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।’’
নিজের জন্য ভালো বিনিয়োগ
কৃতির মতে, তাঁর পরিচিত একজন প্রথম তাঁকে ডিম্বাণু সংরক্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে বলেন। ভবিষ্যতের জন্য এটি নিজের প্রতি একটি বড় বিনিয়োগ হতে পারে—এই পরামর্শ দীর্ঘদিন তাঁর মনে ছিল। পরে উপযুক্ত সময় আসতেই তিনি সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করেন।
পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। ডিম্বাণু সংগ্রহের আগে যে হরমোন ইনজেকশন নিতে হয়, তার প্রভাবে শরীর ও মনের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে।
কৃতি বলেন, ‘‘মনে হচ্ছিল যেন গর্ভাবস্থার মতো অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। মেজাজের ওঠানামা হচ্ছিল, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন মনে হয়, সিদ্ধান্তটি নেওয়া ঠিকই ছিল। অন্তত ভবিষ্যতে এই বিষয়টি নিয়ে আলাদা করে উদ্বিগ্ন হতে হবে না।’’
অভিনেত্রী জানান, ডিম্বাণু সংরক্ষণের সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ২৯ বছর।
ভারতে ডিম্বাণু সংরক্ষণের খরচ
ভারতে ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রাথমিক খরচ সাধারণত দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে। এই ব্যয়ের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, হরমোন ইনজেকশন, ওষুধ এবং ডিম্বাণু সংগ্রহের খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া সংরক্ষিত ডিম্বাণু রাখার জন্য প্রতি বছর ফার্টিলিটি সেন্টারভেদে প্রায় ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতের মাতৃত্বের নিশ্চয়তা নয়; বরং এটি সম্ভাবনা বাড়িয়ে রাখার একটি বৈজ্ঞানিক উপায়।
উল্লেখ্য, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রজনন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ছবি: সংগৃহীত