কর্মজীবী মা: অপরাধবোধ না আত্মসম্মান?

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬

কর্মজীবী মা: অপরাধবোধ না আত্মসম্মান?
ভোরের আলো ফোটার আগেই দিনের শুরু। এক হাতে সকালের নাশতা, অন্য হাতে সন্তানের স্কুলের ব্যাগ। অফিসের জরুরি মেইল, পরিবারের প্রয়োজন, বয়স্ক বাবা-মায়ের খোঁজ, বাজারের তালিকা, সন্তানের পড়াশোনা—সবকিছু যেন একই সঙ্গে সামলাতে হয় একজন কর্মজীবী মাকে। অথচ দিনের শেষে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি তাকে তাড়া করে বেড়ায়, তা হলো—“আমি কি একজন ভালো মা?”

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই অসংখ্য কর্মজীবী মা অপরাধবোধে ভোগেন। সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না, তার ছোট্ট অর্জনের মুহূর্তে পাশে থাকতে পারেননি, অফিসের প্রয়োজনে স্কুলের অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি—এসব কারণেই অনেক মা মনে করেন, তারা যেন মাতৃত্বে কোথাও ব্যর্থ।

কিন্তু সত্যিই কি একজন কর্মজীবী মায়ের অনুভব করার কথা অপরাধবোধ? নাকি তার অনুভব করা উচিত আত্মসম্মান?- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখার সময় এসেছে।  মাতৃত্বের সঙ্গে কেন জড়িয়ে যায় অপরাধবোধ?

আমাদের সমাজে এখনও একটি ধারণা খুব গভীরভাবে প্রোথিত—মায়ের প্রধান পরিচয় হলো সন্তানকে সারাক্ষণ সময় দেওয়া। একজন মা যদি কর্মজীবী হন, তাহলে অনেকেই ধরে নেন তিনি পরিবারকে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই সামাজিক মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় অপরাধবোধ। কেউ সরাসরি না বললেও নানা মন্তব্য ভেসে আসে—

  • “বাচ্চাটা সারাদিন কাজের মানুষের কাছে থাকে।”

  • “টাকার জন্য এত কষ্ট করার কী দরকার?”

  • “মা হলে তো সন্তানের জন্য ক্যারিয়ার ছাড়তেই হয়।”

এসব কথার পুনরাবৃত্তি একজন নারীর মনকে ধীরে ধীরে বিশ্বাস করিয়ে দেয় যে, তিনি যেন কোথাও ভুল করছেন। অথচ একই পরিস্থিতিতে একজন কর্মজীবী বাবাকে খুব কমই এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। সময় নয়, প্রয়োজন মানসম্মত উপস্থিতি অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানের মানসিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের গুণগত মান, কেবল সময়ের পরিমাণ নয়।

সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন এক ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে গল্প করা, তার কথা শোনা, তাকে গুরুত্ব দেওয়া—এটি অনেক সময় সারাদিন একসঙ্গে থেকেও অবহেলা করার চেয়ে বেশি মূল্যবান।

শিশুরা সবচেয়ে বেশি মনে রাখে—

  • আপনি তাকে কতটা মন দিয়ে শুনেছেন।
  • তার সাফল্যে কতটা আনন্দ পেয়েছেন।
  • ব্যর্থতার সময় তাকে কতটা সাহস দিয়েছেন।
  • সে যখন ভয় পেয়েছে, তখন আপনি তার পাশে ছিলেন কি না।
  • অর্থাৎ উপস্থিতির গভীরতাই সম্পর্ক গড়ে তোলে।

কর্মজীবী মা শুধু নিজের জন্য কাজ করেন না।  একজন কর্মজীবী মা অফিসে যান শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য নয়। তিনি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। সন্তানের উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত করেন। ভবিষ্যতের সঞ্চয় গড়ে তোলেন। অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থ বাবা-মা কিংবা পুরো পরিবারের দায়িত্বও বহন করেন।

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি নিজের পরিচয় ও সক্ষমতাকে জীবিত রাখেন। যে সন্তান তার মাকে দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভর মানুষ হিসেবে দেখে বড় হয়, সে জীবনের মূল্যও ভিন্নভাবে শেখে। 

সন্তান কী শেখে একজন কর্মজীবী মায়ের কাছ থেকে?

শিশুরা কথা শুনে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে দেখে। যখন তারা দেখে—

  • মা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন।
  • সময়ের মূল্য বোঝেন।
  • নিজের কাজ ভালোবাসেন।
  • পরিবারের দায়িত্বও পালন করেন ।  

তখন তারা বুঝতে শেখে—পরিশ্রম সম্মানের।

নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া অপরাধ নয়। নারী ও পুরুষ উভয়েরই কাজ করার অধিকার আছে। সমতা মানে শুধু মুখের কথা নয়, বাস্তব জীবনেও তা সম্ভব। এই শিক্ষাগুলো কোনো বই থেকে শেখানো যায় না। অপরাধবোধের সবচেয়ে বড় ক্ষতি যখন একজন মা সবসময় মনে করেন তিনি যথেষ্ট নন, তখন তিনি নিজেকেই শাস্তি দিতে শুরু করেন।

নিজের বিশ্রামকে বিলাসিতা মনে করেন। নিজের আনন্দকে স্বার্থপরতা ভাবেন। নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করেন। ফলে ধীরে ধীরে তৈরি হয় মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ক্লান্তি এবং অবসাদ। একজন ক্লান্ত মা কখনোই সুখী পরিবার গড়ে তুলতে পারেন না। সন্তানের সবচেয়ে প্রয়োজন একজন নিখুঁত মা নয়। একজন মানসিকভাবে সুস্থ, ভালোবাসায় ভরা এবং আত্মবিশ্বাসী মা।


আত্মসম্মান কেন প্রয়োজন?

আত্মসম্মান মানে অহংকার নয়। আত্মসম্মান মানে নিজের শ্রম, যোগ্যতা এবং পরিচয়কে সম্মান করা। একজন নারী যখন নিজের কাজকে মূল্য দেন, তখন তিনি সন্তানকেও শেখান— 

  • নিজেকে সম্মান করতে।

  • নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে।

  • অন্যের পরিশ্রমের মূল্য বুঝতে।

যে মা নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলেন, তিনি অনেক সময় অজান্তেই সন্তানের কাছেও আত্মত্যাগকে একমাত্র আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো— একজন সুখী মা-ই একজন সুখী সন্তানের ভিত্তি। নিখুঁত মা হওয়ার প্রয়োজন নেই। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের সামনে এমন এক মাতৃত্বের ছবি তুলে ধরে, যেখানে সবকিছুই নিখুঁত। ঘর পরিপাটি। সন্তান সবসময় হাসিখুশি। মা সবসময় পরিপাটি।  ক্যারিয়ারও সফল। কিন্তু  বাস্তব জীবন এমন নয়।

বাস্তবে সন্তান অসুস্থ হয়। অফিসে চাপ থাকে। মাঝে মাঝে রান্না বাইরে থেকে আনতে হয়। কখনও স্কুলের অনুষ্ঠানে যাওয়া সম্ভব হয় না। এগুলো ব্যর্থতা নয়। এটাই জীবন।

নিজেকে অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে তুলনা করা বন্ধ করে বরং পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে হবে। বুঝতে হবে,  সন্তান শুধু মায়ের দায়িত্ব নয়। বাবারও সমান দায়িত্ব রয়েছে। আর একটি পরিবার তখনই সুন্দর হয়, যখন দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়।

বাবা যদি সন্তানের পড়াশোনা দেখেন, খাবার খাওয়ান, স্কুলে নিয়ে যান কিংবা ঘরের কাজে অংশ নেন—তাহলে সেটি কোনো সাহায্য নয়, সেটি তার দায়িত্ব। একজন কর্মজীবী মায়ের প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান হলো তাকে একা যোদ্ধা বানিয়ে না রাখা।

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে

একজন কর্মজীবী নারীকে প্রশ্ন করার আগে আমাদের ভাবা উচিত— তিনি কি পরিবারকে অবহেলা করছেন, নাকি পরিবারকে আরও শক্তিশালী করছেন? তিনি কি সন্তানের কাছ থেকে দূরে যাচ্ছেন, নাকি তার ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ করছেন? আমরা যদি একজন পুরুষের কর্মজীবনকে দায়িত্ব হিসেবে দেখি, তাহলে একজন নারীর কর্মজীবনকেও একই সম্মান দিতে হবে। সমাজের মানসিক পরিবর্তন ছাড়া কর্মজীবী মায়ের অপরাধবোধ কখনও পুরোপুরি দূর হবে না।

শেষ কথা,  একজন কর্মজীবী মা প্রতিদিন দুটি যুদ্ধ লড়েন। একটি কর্মক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা প্রমাণের। অন্যটি নিজের ভেতরের অপরাধবোধের বিরুদ্ধে।

প্রথম যুদ্ধে তিনি প্রায়ই জয়ী হন। দ্বিতীয় যুদ্ধে অনেক সময় তিনি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু সময় এসেছে এই পরাজয় থামানোর। কারণ একজন কর্মজীবী মা পরিবারের জন্য কাজ করেন, সমাজের জন্য কাজ করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাজ করেন এবং নিজের স্বপ্নের প্রতিও সৎ থাকেন। এতে লজ্জার কিছু নেই। বরং আছে গর্ব।

অপরাধবোধ নয়, একজন কর্মজীবী মায়ের সবচেয়ে বড় অলংকার হওয়া উচিত তার আত্মসম্মান।

কারণ যে মা নিজের মর্যাদা ধরে রাখতে জানেন, তিনিই সন্তানকে শেখাতে পারেন—জীবনে দায়িত্ব পালন করতে হয় মাথা নত করে নয়, মাথা উঁচু করে।

সাবিনা ইয়াসমীন
সম্পাদক ও প্রকাশক, রোদসী
sidebar ad