মারিয়াম জাভেদ জুহি। বাংলাদেশে বসবাস করলেও তিতি নন বেঙ্গলি পরিবারের সন্তান। মা পাকিস্তানের, বাবা ইন্ডিয়ান। এক ভাই, এক বোন। খুব সংরক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা জুহির।
পথচলাটা যেভাবে:
মারিয়াম জাভেদ জুহি আমাদের পরিবারের মেয়েরা কখনো চাকরি বা ব্যবসা করেনি।
অনুমতিও ছিল না। বাবা, ভাই ভীষণ রাগী ছিলেন। অনেক ভয় পেতাম। কোনো দিন কোনো বন্ধুর বাসায়ও
যেতে পারিনি। আমি ম্যাপললিফের স্টুডেন্ট ছিলাম। এত কড়া শাসনে চলছিল আমার জীবন। অতিরিক্ত
শাসনে থাকতে থাকতে মানুষ কোথাও ভালোবাসা পেলে কিন্তু ভুলটা করে ফেলে, যাচাই করে না
একেবারেই, ওটা আমার জন্য ভালো না খারাপ। আমার ক্ষেত্রেও তাই হলো। আমি জীবনে ভুল সিদ্ধান্তটি
নিয়ে নিলাম। তখন আমার বয়স ১৮। যাকে বিয়ে করলাম, তিনিও সে সময় কেবল পড়াশোনা শেষ করেছেন।
তেমন কিছুই করতেন না। তবে এক মাস পর যেটা দেখলাম, তিনি খুবই অ্যাবিউজিং ক্যারেক্টর।
চড়-থাপ্পড়, গায়ে হাত তোলা কোনো বিষয়ই না তার কাছে। কিন্তু আমার যাওয়ার কিংবা কারও কাছে
কিছু বলার সব দরজাই বন্ধ। এ রকম করতে করতে কয়েক বছর পার হলো। এর মধ্যে আমি কোনোভাবে
গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করি তেজগাঁও কলেজ থেকে।
যদি বলি ক্যারিয়ার কবে থেকে?
মারিয়াম জাভেদ জুহি: আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ভাবলাম আমাকে কিছু একটা
করতেই হবে। কারণ, আমার স্বামী তখনো ভালো কিছুই করতেন না। তারপর আমি কোনোভাবে একটি চাকরি
ম্যানেজ করে নিলাম। বেতন ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। ওই টাকাটা আমার কাছে যে কী মূল্যবান
ছিল, তা বলার বাইরে। যাহোক তারপর আমার প্রথম সন্তান হলো। ছেলে হওয়ার পর আমাকে ব্রেক
নিতে হলো। তারপর আবার কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই আবার আরেকটি সন্তান হলো। দ্বিতীয় সন্তান
মেয়ে। মেয়ে হওয়ার পর জীবনের গতি কিছুটা বদলে গেল।
টার্নিং পয়েন্ট কোনটি
মারিয়াম জাভেদ জুহি: আমার সন্তান হওয়ার পর ক্যারিয়ারে বিশাল গ্যাপ পড়ে।
কিন্তু টার্নিং পয়েন্ট যদি বলতে হয়, মেয়ে হওয়ার পর আমি ব্র্যাক ব্যাংক থেকে একটি অফার
পেলাম। আমার আগের অফিসের কলিগের মাধ্যমে। অফারটি আমি নিয়ে নিলাম। তিন বছর আমি ব্র্যাক
ব্যাংকে কাজ করেছি।
বলছিলেন সন্তানদের ডিপ্রেশনের কথা
মারিয়াম জাভেদ জুহি: হ্যাঁ, সে গল্পটি আসলে খুব ব্যথিত
করে আমাকে। আমার সন্তানদের আমি টপ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। খরচ আমিই
চালাতাম। কিন্তু প্রতিদিন ওরা স্কুলে গিয়ে কান্নাকাটি করত। পড়ালেখায় কোনোভাবেই মনোযোগ
দিতে পারত না। রাতে বাড়ি ফেরার পর ওরা ঘুমানোর অভিনয় করত। কারণ ওরা দেখত মায়ের ওপর
বাবার নির্যাতন শুরু হবে এখন। এসব পারিবারিক কলহ দেখতে দেখতে ওরা পরিবারের কথা অনেক
বলে ফেলেছি। জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই পার করে এ পর্যন্ত আসা।
জীবন শুরুর প্রথম দিকে কোনো সহযোগিতাই পাইনি। জীবনযুদ্ধ প্রতিটি পর্যায়েই
ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি যদি বলতে হয়, তাহলে আবার একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। আমি
ছয় বছর যখন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে ছিলাম।
তখন বাবা-মা, ভাই-ভাবির কাছ থেকে অনেক বেশি সহযোগিতা পেয়েছি, যা বলার বাইরে।
আমাকে আমার পরিবার থেকে কোনো টেনশন দেওয়া হতো না। সব সময় আমাকে তারা চিন্তামুক্ত
রাখার চেষ্টা করে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন আমার মনে হলো এবার আমার স্টেপ নেওয়ার সময় এসেছে।
এভাবে সহ্য আর না। এখন আমার বাবা-মাকে সবকিছু জানাতে হবে। আমি আমার ভাইকে
জানালাম, বাবা-মাকেও জানালাম। তবে খুব ভয়ে ছিলাম ওরা কীভাবে নেবে বিষয়টি। কিন্তু আমাকে
পরিবার থেকে খুব সাপোর্ট করল। কিন্তু মা বললেন, না, ঘর ছেড়ে আসা যাবে না। যা-ই হোক
মানিয়ে নাও। আমি বারবার কান্নাকাটি করে মায়ের বাড়ি চলে আসতাম। মা আমাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে
আবার পাঠিয়ে দিতেন। বারবার এগুলো দেখতে দেখতে বাবা শেষবার বললেন, ও আর যাবে না। ডিভোর্স
লেটারটা আমিই পাঠালাম পরিবারের সহযোগিতায়। কিন্তু আমার সন্তানের বাবার পায়ের নিচ থেকে
মাটি সরে গিয়েছিল, ভদ্রলোক কখনো ভাবেননি আমি এটা করব। কিন্তু নিরুপায় হয়ে জলে ভাসা
পদ্মের মতো সংসার করতে হয়েছিল। তারপর ছয় বছর সিঙ্গেল মাদার হিসেবে ছিলাম। সন্তানদের
বাবা কোনো খরচপাতি দিতেন না।
নতুন করে আবার যেভাবে
মারিয়াম জাভেদ জুহি: আমি কাজের ক্ষেত্রে খুবই অনুগত ছিলাম।
আমার কাজটা আমি সব সময় দায়িত্বের সঙ্গে করেছি। ব্র্যাক ব্যাংকে আমার প্রমোশন হলো। খুব
ভালো যাচ্ছিল চাকরিটা। তারপর আমার সিটি ব্যাংক থেকে একটি অফার এল। ২০০৯ সালে আমি সিটি
ব্যাংকে সার্ভিস কোয়ালিটি ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করলাম। সবার কাছ থেকে খুবই সাপোর্ট
পেয়েছি, বিশেষ করে সময়ের ফ্লেক্সিবিলিটির জন্য। আমার কাজটি করে আমি বের হয়েছি কখনো
কেউ আমাকে বদার করেননি। সহকর্মীরা ভালো ছিলেন বলেই আমার টিকে থাকাটা সম্ভব হয়েছে। তারপর
সিটি ব্যাংকে আমেরিকান এক্সপ্রেস লঞ্চ হয়েছিল। আমি সেখানকার লাউঞ্জ ম্যানেজার হিসেবে
কাজ করেছি দেড় বছর। তারপর প্রায়োরিটি ব্যাংক সিটিজেন লঞ্চ হলো। এটা খুব বড় একটি প্রজেক্ট
ছিল। আমি সেখানকার প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করলাম। তারপর সিটি ব্যাংক নতুনভাবে
একটি প্রজেক্ট চালু করল ওমেন ব্যাংকিং-সিটি আলো। তখন আমাকে বলা হলো এই প্রজেক্টটি আমাকে
দেখতে হবে। আমি এই প্রজেক্টটি নিয়ে খুবই এক্সাইটেড ছিলাম। যেহেতু নারীদের নিয়ে কাজ
হবে। তবে আমার কাছে মনে হয় সিটি আলো ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। তা ছাড়া সিটি ব্যাংকের বড়
তিনটি প্রজেক্টের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। যেগুলো সফলতার সঙ্গে আমি করতে পেরেছিলাম।
সিটি আলো নিয়ে জানতে চাই
মারিয়াম জাভেদ জুহি: এই প্রজেক্ট আমার জন্য খুব অনুপ্রেরণার
এবং অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের ছিল। ২০১৮ সালে আমরা সিটি আলোর প্রজেক্টটি লঞ্চ করেছি। তারপর
তো করোনা চলে এল। তবু অনেক নারী সিটি আলো থেকে অনেক বেশি সহযোগিতা পেয়েছে। কারণ, সে
সময় ঘরে বসে ব্যবসা করার একটি বিপ্লব হয়। মহামারির সময় সিটি আলো অসংখ্য নারীকে নিয়ে
কাজ করেছে। অনেক নারী আছে খুব ভালো কাজ করেন, কিন্তু ব্যাংকিং বোঝেন না। তাদের প্রয়োজনীয়তার
জায়গাটি বুঝিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সুগম করেছে সিটি আলো।
হ্যাঁ, সে গল্পটি আসলে খুব ব্যথিত করে আমাকে।
আমার সন্তানদের আমি টপ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। খরচ আমিই চালাতাম। কিন্তু প্রতিদিন ওরা স্কুলে গিয়ে কান্নাকাটি করত। পড়ালেখায় কোনোভাবেই মনোযোগ দিতে পারত না। রাতে বাড়ি ফেরার পর ওরা ঘুমানোর অভিনয় করত।
যেমন ছিল পরিবারের সহযোগিতা
মারিয়াম জাভেদ জুহি: পরিবারের কথা অনেক বলে ফেলেছি। জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই
পার করে এ পর্যন্ত আসা। জীবন শুরুর প্রথম দিকে কোনো সহযোগিতাই পাইনি। জীবনযুদ্ধ প্রতিটি
পর্যায়েই ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি যদি বলতে হয়, তাহলে আবার একটু পেছনে ফিরে যেতে
হবে। আমি ছয় বছর যখন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে ছিলাম। তখন বাবা-মা, ভাই-ভাবির কাছ থেকে
অনেক বেশি সহযোগিতা পেয়েছি, যা বলার বাইরে। আমাকে আমার পরিবার থেকে কোনো টেনশন দেওয়া
হতো না। সব সময় আমাকে তারা চিন্তামুক্ত রাখার চেষ্টা করে। দিন কাটছিল ভালোই, একটা সময়
মনে হলো এখন একজনকে দরকার, যাকে দিন শেষে কিছু বলা যায়। তারপর পারিবারিক আয়োজনে একজন
জীবনসঙ্গীর দেখা পাওয়া হলো। অবশ্য সেই সিদ্ধান্তটাও ছিল খুবই সেনসিটিভ। কারণ, আমার
সন্তানেরা আছে তারা এটা মেনে নেবে কি না। কিন্তু যিনি আমার জীবনসঙ্গী হয়েছেন, ওনারও
আগের জীবন ছিল, সন্তান আছে। তাদের নিয়ে বেশ ভালো আছি এখন। আমার হাজব্যান্ড আমাকে বলেছেন
কষ্ট হলে চাকরি ছেড়ে দিতে পারো। কিন্তু আমি তা কখনো ভাবতে পারি না। কারণ, আমার জীবনটাকে
বারবার বাঁচিয়ে দিয়েছে আমার চাকরি। তাই প্রত্যেক নারীর উচিত ক্যারিয়ারটা ধরে রাখা।
[রোদসী আর্কাইভ থেকে নেওয়া]
ঢাকা/টিএ