মাতৃত্বের আনন্দ অতুলনীয়। তাতে মিশে থাকে উত্তেজনা, আনন্দ, কিছুটা ভয় এবং উদ্বেগও। তবে এর সাথে বয়ে আসে এমন কিছু যা কেউ কখনো আশা করতেও পারেনা। আর তা হলো বিষন্নতা বা হতাশা। অধিকাংশ নতুন মায়েরাই বাচ্চা প্রসবের পর এই রকম হতাশার মধ্য দিয়ে যায়। এই সুন্দর যাত্রার আড়ালেও অনেক মা নীরবে লড়াই করেন গভীর মানসিক ক্লান্তি, শূন্যতার সঙ্গে। আর এই অদৃশ্য মানসিক লড়াইয়ের নাম,পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা “প্রসব পরবর্তী বিষন্নতা।’’
“সবকিছু বদলে যায়। মনে হচ্ছিলো আমি যেন পুরোপুরি অন্য একজন মানুষ হয়ে গেছি। ছোট ছোট বিষয়েও হঠাৎ কান্না চলে আসতো, আবেগগুলো যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতো।’’ সম্প্রতি পোস্টপার্টাম সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে এমন কথাই বলেছেন বলি অভিনেত্রী কিয়ারা আদভানি। মাতৃত্বকে আমরা সাধারণত শুধু আনন্দ, ভালোবাসা আর পূর্ণতার ছবি হিসেবেই দেখি। কিন্তু এর মাঝেও যে কতো অজানা বিষয় লুকিয়ে থাকে যা আমরা কল্পনাও করতে পারিনা। হরমোনের পরিবর্তন, শারীরিক ক্লান্তি,নতুন দায়ীত্বের চাপ সব মিলিয়ে অনেক মা গভীর বিষন্নতায় ভুগতে পারেন। এটিকে শুধু মুড সুইং বলে ব্যাখ্যা করলেও ,বাস্তবে এটি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।
অনেকেই বেবি ব্লুজ এবং পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কে একই মনে করেন। কিন্তু এদের মধ্যে পার্থক্য আছে। বাচ্চা হওয়ার পর সাধারণত ৩-৫ দিনের পর সামান্য কান্না পাওয়া বা মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ১০-১৪ দিনের মধ্যে তা আবার ঠিক হয়ে যায়। এটি হলো বেবি ব্লুজ। কিন্তু এর লক্ষণগুলো যখন সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে তখনই তা রুপ নেয় বিপদজনক অবস্থার। আর এটাই হলো পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন, যার সঠিক চিকিৎসা না নিলে দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে।
লক্ষণগুলো কি হতে পারে?
এই ধরনের বিষন্নতার কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়। যেমন অকারনে কান্না পেয়ে যাওয়া, সবসময় ক্লান্ত ও হতাশ লাগা, ঘন ঘন মুড সুইং হওয়া, সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর সাথে সংযোগ অনুভব না হওয়া, আমি ভালো মা হতে পারছি না- এমন হীনম্মন্যতায় ভোগা, ঘুম ও খাবারের অভ্যাস পরিবর্তন বা ক্ষুধা মন্দা হওয়া। এগুলোকে সাধারণ বা কমন লক্ষণ যা কম-বেশি সবার ক্ষেত্রেই তা পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এই ডিপ্রেশন যখন চরম আকার ধারন করে তখন অনেক সময় নিজেকে ক্ষতি করার চিন্তাও মাথায় আসতে পারে। এই থেকে সুইসাইডের মতো ঘটনাও ঘটে যায়।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের কারণ
সন্তানের জন্মের পর শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের পরিমান দ্রুত কমে যায়। যা মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে। এটি মূলত এই ডিপ্রেশনের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়াও, অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপরিকল্পিত গর্ভধারন হলে, শরীরে দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে, পরিবারের কারো এমন অতীতে বিষন্নতার ইতিহাস থাকলে, পারিবারিকভাবে চাপ থাকলে,পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে, সর্বোপরি পরিবার বা সঙ্গীর সাপোর্ট পাওয়া না গেলে এই ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে।
প্রতিকার
একজন নতুন মায়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বোঝাপড়া ও মানসিক সমর্থন। এইক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে পরিবার। বাচ্চা হওয়ার মানে শুধু একটি নতুন প্রাণের সঞ্চার নয়, সাথে একটি নতুন মায়েরও জন্ম হওয়া। তাই সেই নতুন মায়েরও দরকার পর্যাপ্ত দেখাশোনার। তার কথা মন দিয়ে শুনুন, তার আবেগ বুঝার চেষ্টা করুন। তুমি অতিরিক্ত ভাবছো- এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। তার আশেপাশে সবসময় পজিটিভ ভাইভ রাখার চেষ্টা করুন। এছাড়াও বাচ্চার সাথে সাথে তাকেও পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ করে দিন। দিনে অন্তত ১৫-২০ মিনিট নিজের পছন্দের কিছু করার চেষ্টা করতে হবে। সেটি হতে পারে পছন্দের গান শোনা, বই পড়া কিংবা বাইরে হাঁটতে যাওয়া। ছোট ছোট সহানুভূতিও একজন মায়ের মানসিক শক্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। আন্তরিকতার সাথে তার পাশে এসে দাঁড়ান, প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং বা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে উৎসাহ দিন।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কোন দূর্বলতা নয়। আর এতে ভোগা মানেই আপনি খারাপ মা নন। এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে ভালোবাসা, সচেতনতা এবং সঠিক সহায়তা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আমাদের সকলেরই শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতারও দরকার। আর এই প্রসব পরবর্তী বিষন্নতা বিষয়টি আড়ালে নয়, বেশি বেশি করে এর ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। কারণ একটি সুস্থ মা মানেই একটি সুস্থ সন্তান।
লেখাঃ শায়লা জাহান