ভেংচি কেটে আয়না বলে, ‘তোমায় ভালো লাগে না।’ কখন যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথাটা নিজের অজান্তেই বলে ফেলি আমরা। চোখের কোণে সূক্ষ্ম রেখা, নির্ঘুম রাতের সাক্ষী ডার্ক সার্কেল, দু-একটি সাদা চুল, মুখের আগের সেই টানটান ভাবটা নেই, শরীরে জমা কিছু বাড়তি মেদ। আয়নার মানুষটাকে দেখে মনে হয়, আগের আমি কোথায় গেলাম?
কিন্তু সত্যিই কি সৌন্দর্য হারিয়ে যায়
নাকি জীবনের দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে আমরা নিজের সৌন্দর্যটাকে দেখতে ভুলে যাই? বা পাত্তাই দিই না? কখন জন্ম নেয় এই ভালো না লাগার বোধ?
‘আমি আর আগের মতো সুন্দর নই’—এই অনুভূতিটা অনেক সময় একদিনে তৈরি হয় না। ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
একসময় যে নারী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতেন, চোখে কাজল পরতেন, পছন্দের পোশাক পরতেন, একদিন তিনি আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময়ই পান না।
সকালে সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, স্বামীর নাশতা, অফিস, রান্না, বাজার, ঘর গোছানো, শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা, সন্তানের পড়াশোনা—দিন শেষে নিজের জন্য বাকি থাকে শুধু একটা ক্লান্ত শরীরের ভার।
তারপর একদিন হঠাৎ কোনো পুরোনো ছবি চোখে পড়ে। ছবির সেই মেয়েটাকে দেখে মনে হয়, ‘আমি তো একসময় এমন কিউট ছিলাম!’ সেখান থেকেই শুরু হয় নিজের সঙ্গে তুলনা। কিন্তু আমরা ভুলে বসি, সেই ছবির নারীটির হয়তো আজকের মতো এত দায়িত্ব ছিল না। তাঁর শরীর তখন সন্তান জন্ম দেওয়ার ধকল নেয়নি, ঘুমহীন রাত কাটেনি, সংসারের শত চিন্তা মাথায় ছিল না।
তাই আজকের নিজের সঙ্গে দশ বছর আগের নিজের তুলনা করাটা একদমই উচিত নয়।
নারীর সৌন্দর্যের প্রথম বিসর্জন যখন সে মা হয়
মাতৃত্ব নারীর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি তার নিজের শরীর ও সময়ের ওপর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনও নিয়ে আসে।
সন্তান জন্মের পর একজন মা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সমস্যায় ভুগতে পারেন। অতিরিক্ত ওজন কমানো তখন রীতিমতো দায়। নিজের শরীরের চেয়ে সন্তানের প্রয়োজনকে আগে মনে রাখতে গিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা হয়ে ওঠে না কিছুই।
সন্তানের ঘুম, খাবার, কান্না, অসুখ, স্কুল—সবকিছুর মাঝে নিজের চুল আঁচড়ানোর সময়টুকুও কখনো বিলাসিতা মনে হয়।
নতুন মা হয়তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবেন, ‘আগে নিজের জন্য কত কিছু করতাম। এখন নিজের জন্য সময়ই পাই না।’
কিন্তু এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা দরকার—
মা হওয়া মানে নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলা নয়।
সন্তানের মা হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন নারীও। তাঁরও বিশ্রাম দরকার, ভালো লাগার পোশাক দরকার, নিজের শরীরের যত্ন দরকার, নিজের জন্য কিছু সময় দরকার।
সংসার সামলাতে গিয়ে নিজের যত্নের সময় কোথায় হারিয়ে যায়
আমাদের সমাজে একজন নারীর কাছ থেকে প্রায়ই আশা করা হয়, তিনি যেন সবার আগে অন্যদের কথা ভাবেন। সবাই খুশি তো আমিও খুশি।
খুব কম সময়েই কেউ জিজ্ঞেস করে—‘তুমি কেমন আছ?’
আর নারী নিজেও অনেক সময় সেই প্রশ্নটা নিজেকে করেন না। ফলে নিজের যত্নটা প্রথমে পিছিয়ে যায়।
আজ ফেসিয়াল নয়, আগে বাজারটা করি। আজ একটু বিশ্রাম নয়, আগে রান্নাটা শেষ করি। আজ নিজের জন্য একটা পোশাক নয়, সন্তানের জন্য কিনি। এভাবেই ‘আজ নয়, কাল’ করতে করতে কয়েক বছর কেটে যায়। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, ‘আমাকে আর সুন্দর লাগে না।’ আসলে হয়তো সৌন্দর্য হারায়নি। যত্নটাই হারিয়েছে।
৪০-এর পরে সৌন্দর্য নিয়ে ভাবা কী খুব জরুরি?
অনেক নারী মনে করেন, ৪০ পার হয়ে গেলে সৌন্দর্য নিয়ে ভাবাটা বুঝি অপ্রয়োজনীয়।
‘এখন আর সাজগোজ করে কী হবে?’
‘এই বয়সে আবার নিজের জন্য এত কিছু?’
এই ধারণাটাই বদলানো দরকার।
৪০ কোনো শেষ সীমা নয়। বরং অনেক নারীর জন্য এটি নিজের দিকে আবার ফিরে তাকানোর বয়স।
এই বয়সে সৌন্দর্য মানে শুধু মসৃণ ত্বক বা কম বয়সী দেখানো নয়।
সৌন্দর্য মানে— সুস্থ শরীর। পরিপাটি থাকা। আত্মবিশ্বাস। নিজেকে সম্মান করা। নিজের পছন্দের পোশাক পরার সাহস। নিজের জন্য সময় বের করা। এবং আয়নায় তাকিয়ে নিজের বয়সকে ভালোবাসতে পারা।
চোখের কোণের রেখাগুলোও তো জীবনের গল্প। একজন মায়ের মুখের ক্লান্তির রেখায় হয়তো সন্তানের জন্য কাটানো অসংখ্য রাত লুকিয়ে আছে।
চুলের সাদায় হয়তো জীবনের বহু অভিজ্ঞতা
তাই ৪০-এর সৌন্দর্য ২৫-এর সৌন্দর্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না।
৪০-এর সৌন্দর্য তার নিজের জায়গায় আলাদা।
নিজের যত্ন মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিউটি পারলারে বসে থাকা নয়
নিজের যত্ন নেওয়ার জন্য প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সময় প্রয়োজন নেই। বরং ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রতিদিন নিজের জন্য অন্তত ২০–৩০ মিনিট রাখুন
এই সময়টা হতে পারে হাঁটার জন্য, বই পড়ার জন্য, ত্বকের যত্নের জন্য, নামাজ বা দোয়ার জন্য কিংবা এক কাপ চা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকার জন্য।
এই সময়টুকু অপরাধবোধ ছাড়াই নিজের জন্য রাখুন।
ঘুমকে বিলাসিতা ভাববেন না
পর্যাপ্ত ঘুম শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভব হলে প্রতিদিন নিয়মিত ঘুমের সময় ঠিক করার চেষ্টা করুন। একজন নারী ভালোভাবে বিশ্রাম না নিয়ে দীর্ঘদিন সবকিছু ঠিকঠাক চালিয়ে যেতে পারেন না।
ত্বকের যত্ন সহজ রাখুন
দামি দশটি প্রসাধনী দরকার নেই। নিয়মিত কয়েকটি মৌলিক অভ্যাসই যথেষ্ট হতে পারে।
মৃদু ক্লিনজার
প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার
দিনে সানস্ক্রিন
ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত স্কিন কেয়ার
ত্বকের কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
শরীরকে শাস্তি নয়, যত্ন দিন
৪০-এর পর শরীরের পরিবর্তন স্বাভাবিক। তাই না খেয়ে থাকা বা দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টার বদলে—
নিয়মিত হাঁটা
হালকা ব্যায়াম
পর্যাপ্ত পানি
শাকসবজি ও ফল
পর্যাপ্ত প্রোটিন
পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার
এসবের দিকে মনোযোগ দেওয়া বেশি জরুরি
নিজের জন্য পোশাক কিনুন
শুধু সন্তান বা পরিবারের জন্য কেনাকাটা নয়। মাঝে মাঝে নিজের পছন্দের একটি পোশাক, ওড়না, ব্যাগ বা ছোট কোনো জিনিস কিনুন। কারণ নিজের জন্য কিছু কেনা স্বার্থপরতা নয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলুন।
‘আমি মোটা হয়ে গেছি।’
‘আমাকে দেখতে খারাপ লাগে।’
‘আমার বয়স হয়ে গেছে।’
এই কথাগুলো বারবার বললে নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আরও শক্ত হতে পারে।
তার বদলে নিজেকে বলুন—
‘আমার শরীর বদলেছে, কারণ আমি জীবন পার করেছি।’
‘আমার বয়স বেড়েছে, কিন্তু আমার মূল্য কমেনি।’
‘আমি এখনো সুন্দর, শুধু আমার সৌন্দর্যের সংজ্ঞাটা বদলেছে।’
নারীর সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় শত্রু বয়স নয়। সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সেই ভয়—‘আমি আর আগের মতো সুন্দর নই।’
আগের মতো তো আপনি থাকবেনই না।
কারণ আপনি আগের সেই মানুষটিও আর নেই।
আপনি এখন আরও অনেক অভিজ্ঞ, অনেক বেশি শক্ত, অনেক বেশি পরিণত।
আপনার শরীর হয়তো বদলেছে। আপনার মুখে বয়সের ছাপ এসেছে। আপনার চুলে রুপালি রং এসেছে। কিন্তু আপনার সৌন্দর্য শেষ হয়ে যায়নি।
বরং এখন প্রয়োজন অন্যের চোখে সুন্দর হওয়ার চেষ্টা না করে নিজের চোখে নিজেকে সুন্দর করে তোলা।
মনে রাখবেন, একজন নারী যখন সবার যত্ন নিতে নিতে একদিন নিজের যত্ন নেওয়া শুরু করেন, তখন তিনি স্বার্থপর হন না; তিনি আবার নিজের কাছে ফিরে আসেন।
ঢাকা/আরএস