নারী কাজ করে না—এই ধারণাটাই কী আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল?

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬

সাবিনা ইয়াসমীনের কলাম
সাবিনা ইয়াসমীনের কলাম

ঘরের অদৃশ্য শ্রমেরও অর্থনীতি আছে—এবার দরকার তার সামাজিক ও নীতিগত স্বীকৃতি|  সকাল শুরু হওয়ার আগেই একজন নারীর কর্মদিবস শুরু হয়ে যায়।

সন্তানের ঘুম ভাঙানো, সকালের খাবার তৈরি, পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন মেটানো, স্কুলের প্রস্তুতি, বাজারের হিসাব, ঘর গোছানো, অসুস্থ বাবা-মায়ের ওষুধের খোঁজ—সবকিছু শেষ করে তিনি হয়তো অফিসে যান। সেখানে আট ঘণ্টা কাজ করেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আবার শুরু হয় আরেক দফা কাজ।

কিন্তু দিনের শেষে যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনি আজ কত ঘণ্টা কাজ করেছেন?”

হয়তো উত্তর হবে—“অফিসে আট ঘণ্টা।”


তাহলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাকি সময়টা কী?


এই প্রশ্ন শুধু পারিবারিক জীবনের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, নারীর কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণ।


যে কাজের বেতন নেই, সেটি কি কাজ নয়?

বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সময় ব্যবহার জরিপে এই অদৃশ্য বাস্তবতাই পরিসংখ্যানের ভাষা পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার উদ্যোগে ২০২১ সালে পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায়, নারীরা পুরুষের তুলনায় গৃহস্থালি ও যত্নের অবৈতনিক কাজে অনেক বেশি সময় ব্যয় করেন। জরিপটি দেশের শহর ও গ্রাম—দুই এলাকার মানুষের সময় ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরে। (UN Women Data Hub)


জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নারীরা গড়ে দিনে ১১.৭ ঘণ্টা গৃহস্থালি ও যত্নের কাজে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষের সময় মাত্র ১.৬ ঘণ্টা। অর্থাৎ, এই ধরনের কাজে নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি সময় দেন। অন্যদিকে, উৎপাদনশীল বা অর্থনৈতিক কাজে পুরুষেরা গড়ে ৬.১ ঘণ্টা এবং নারীরা ১.২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। (The Daily Star)


অর্থাৎ, একজন নারী যখন রান্না করেন, কাপড় ধুয়ে দেন, শিশুর যত্ন নেন, পরিবারের বয়স্ক সদস্যকে দেখেন কিংবা পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা করেন—সেই শ্রম বাস্তব। শুধু তার বিনিময়ে সরাসরি কোনো মজুরি পাওয়া যায় না। অদৃশ্য মানেই মূল্যহীন নয়।


অর্থনীতির বাইরে নারী নেই

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা আমরা বহু বছর ধরে বলছি। কিন্তু নারীর কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যদি শুধু “নারীকে চাকরি দিতে হবে” বলা হয়, তাহলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে।

কারণ চাকরি করার জন্য একজন নারীর শুধু চাকরি প্রয়োজন হয় না।


তাঁর প্রয়োজন নিরাপদ যাতায়াত, শিশুর যত্নের ব্যবস্থা, পরিবারে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, প্রয়োজনে নমনীয় কর্মব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ এবং কাজের পর ঘরে ফিরে আরেকটি পূর্ণকালীন অবৈতনিক কর্মদিবস না থাকার নিশ্চয়তা।


বিশ্বব্যাংকের জেন্ডার ডেটা পোর্টালে আইএলওর ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮.৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার ৮০.৪ শতাংশ। ব্যবধানটি এখনও বিশাল। (World Bank Gender Data Portal)


এই ব্যবধান কমাতে শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেই হবে না।


নারীর হাতে সময়ও তৈরি করতে হবে।


কারণ সময়ও একটি অর্থনৈতিক সম্পদ।


শিশুর যত্ন কি শুধু মায়ের দায়িত্ব?


একজন মা চাকরি করবেন কি না—অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি আসলে মায়ের একার নয়।


শিশুকে কে দেখবে?


অফিসে যাওয়ার সময় সন্তান অসুস্থ হলে কী হবে?


শিশুকে কোথায় রাখা হবে?


নিরাপদ ও মানসম্মত শিশুযত্নের ব্যবস্থা কতটা সহজলভ্য?


এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে অনেক নারী চাকরি শুরু করেও টিকে থাকতে পারেন না।


বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৪ শতাংশ কর্মজীবী অভিভাবক সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত শিশুযত্নের অভাবকে নারীর কর্মজগতে প্রবেশ ও সেখানে টিকে থাকার বড় বাধা হিসেবে দেখেছেন। ১৮ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, শিশুর যত্নের দায়িত্বের কারণে কোনো না কোনো সময়ে তাঁদের চাকরি ছাড়তে হয়েছে। (International Labour Organization)


এ কারণেই শিশুযত্নকে শুধু পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না।


এটি নারীর কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির অবকাঠামোর অংশ।


বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সালে শিশুযত্ন বিষয়ে একটি জাতীয় রোডম্যাপও চালু করেছে, যেখানে শিশুযত্নের প্রাপ্যতা, সাশ্রয়ী মূল্য, মান, অবকাঠামো এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। (International Labour Organization)


অর্থাৎ, সমস্যাটি এখন আর শুধু নারীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি নীতির বিষয়ও।


একজন নারী ঘরে কতটা অর্থ তৈরি করেন?


এই প্রশ্নটির উত্তর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো গৃহস্থালি উৎপাদনের স্যাটেলাইট হিসাব প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কারিগরি সহযোগিতায় তৈরি এই হিসাবে ২০২১ সালের সময় ব্যবহার জরিপ ও শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। (UN Women Asia-Pacific)


হিসাব অনুযায়ী, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কাপড় ধোয়া, শিশুর যত্ন, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের সেবাসহ অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নশ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য ২০২১ সালে ছিল ৬.৭ ট্রিলিয়ন টাকা, যা ওই বছরের বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ১৮.৯ শতাংশের সমান। এর ৮৫ শতাংশ অবদান নারীদের। (UN Women Asia-Pacific)


এই সংখ্যা আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—


যে শ্রম দেশের অর্থনীতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান মূল্য তৈরি করতে পারে, তাকে আমরা এখনও “কাজ করে না” বলে কেন বিবেচনা করি?


অবশ্যই, অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজকে প্রচলিত মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তার পদ্ধতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট:


এই শ্রম অর্থনীতির বাইরে নয়।


বরং অর্থনীতির ভিতের একটি অংশ।


একজন শিশু যত্ন পায় বলেই তার মা বা বাবা কাজে যেতে পারেন। একজন অসুস্থ মানুষ পরিবারের কারও যত্ন পান বলেই অন্য সদস্যরা চাকরি, ব্যবসা বা অন্য অর্থনৈতিক কাজে সময় দিতে পারেন। ঘর পরিচালিত হয় বলেই পরিবারের সদস্যরা শিক্ষা, চাকরি ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পান। অর্থাৎ, যত্নশ্রম অর্থনীতির বাইরে নয়। বরং অর্থনীতিকে সচল রাখার অন্যতম অদৃশ্য অবকাঠামো।


তাহলে সমাধান কী?

নারীর অগ্রগতির কথা বলতে গিয়ে শুধু নারীকেই আরও “শক্তিশালী” হওয়ার পরামর্শ দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রতিটি সমস্যার সমাধান নারীর ব্যক্তিগত সক্ষমতার ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না।


প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তনের


১. শিশুযত্নকে অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে


কর্মজীবী মা-বাবার জন্য কর্মস্থল ও আবাসিক এলাকার কাছাকাছি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত শিশুযত্নের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।


২. যত্নের দায়িত্ব পরিবারে ভাগ করতে হবে


শিশু, বয়স্ক মানুষ বা অসুস্থ পরিবারের সদস্যের যত্ন শুধু নারীর দায়িত্ব—এই ধারণা বদলাতে হবে।

“স্ত্রী সাহায্য করছে”—এই ভাষাটিও বদলাতে হবে।

কারণ সংসার দুজনের হলে দায়িত্বও দুজনের।


৩. কর্মক্ষেত্রকে শুধু নারীবান্ধব নয়, পরিবারবান্ধব করতে হবে


শুধু নারীর জন্য বিশেষ সুবিধা নয়; প্রয়োজন এমন কর্মব্যবস্থা, যেখানে নারী ও পুরুষ—দুজনই পরিবার ও কাজের দায়িত্ব সামলাতে পারেন।


৪. নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের মানও দেখতে হবে


শুধু কতজন নারী কাজ করছেন, তা দিয়ে সাফল্য মাপলে হবে না।


কাজটি কতটা নিরাপদ?


আয় কত?


কাজের স্থায়িত্ব আছে কি?


সামাজিক সুরক্ষা আছে কি?


সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ছে কি?


এসবও দেখতে হবে।


বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীর বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক ও কম মজুরির কাজে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও নারীদের অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও কম মজুরির কাজের বিষয়টি উঠে এসেছে। (World Bank)


৫. অবৈতনিক যত্নশ্রমকে নীতির আলোচনায় আনতে হবে


সময়ের হিসাব, যত্নের অর্থনৈতিক মূল্য, শিশুযত্ন, প্রবীণদের যত্ন, কর্মজীবী পরিবারের প্রয়োজন—এসবকে নারী উন্নয়নের আলাদা বিষয় হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশে অবৈতনিক যত্ন ও গৃহস্থালি কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ সেই পথেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন এই তথ্যকে বাজেট, শ্রমনীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় ব্যবহার করা। (UN Women Asia-Pacific)


রোদসীর প্রশ্ন

আমরা প্রায়ই বলি— “নারীদের এগিয়ে যেতে হবে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, নারীকে এগিয়ে যাওয়ার সময়টি কে দেবে?

একজন নারীকে যদি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিবারের অবৈতনিক যত্নের বড় অংশ বহন করতে হয়, তারপর বলা হয়—“চাকরি করো, ব্যবসা করো, নেতৃত্ব দাও, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করো”—তাহলে আমরা কি তাঁর কাছে অসম্ভব কিছু চাইছি না?

নারীর সক্ষমতা নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই।


প্রশ্নটা বরং অন্য জায়গায়

আমাদের পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজ ও রাষ্ট্র—নারীর সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর মতো পরিবেশ তৈরি করতে কতটা প্রস্তুত?

নারীর উন্নয়ন মানে শুধু আরও কয়েকজন নারীকে সফল হতে দেখা নয়। নারীর উন্নয়ন মানে এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন নারী মা হতে পারেন, কর্মী হতে পারেন, উদ্যোক্তা হতে পারেন, নেতা হতে পারেন—এবং এই পরিচয়গুলোর কোনো একটির জন্য অন্য পরিচয়টি বিসর্জন দিতে বাধ্য হতে হবে না।


কারণ নারীকে শুধু “সময় বের করে” এগিয়ে যেতে বলা যথেষ্ট নয়।


সমাজকেই তাঁর সময়ের মূল্য বুঝতে হবে।


আর সেই স্বীকৃতি শুরু হতে পারে খুব সাধারণ তিনটি সত্য দিয়ে—


ঘরের কাজ কাজ।


যত্নের কাজ কাজ।


নারীর সময়ও একটি সম্পদ।


এই সত্যকে পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত নীতিতে প্রতিফলিত করার সময় এখনই। রোদসী মনে করে, নারীর অগ্রগতি শুধু নারীর দায়িত্ব নয়—এটি পরিবার, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের যৌথ দায়িত্ব।

sidebar ad